এ ছাড়া নানারকম উপরি আয়ের ফিকির আছে ফুটবল প্রতিযোগিতায়। ওই উচ্চতা আর বয়েসের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি শুরু করলেন। তার আগে রঞ্জনবাবু একটি রঞ্জন টুর্নামেন্ট কমিটি তৈরি করলেন। তার সম্পাদক তিনি স্বয়ং। দুজন গোবেচারা ফুটবল-প্রেমিক পরিচিত ভদ্রলোককে টুর্নামেন্ট কমিটির মেম্বার করা হল। টাকাপয়সার ভাগ তারা পান না, মাঝে-মধ্যে দুএক কাপ চা রঞ্জনবাবু তাঁদের খাওয়ান।
বয়েসের সীমা ঠিক রাখার জন্যে রঞ্জনবাবু ইস্কুলের সার্টিফিকেট ছাড়া কাউকে খেলতে নামতে দেন না। তবে সার্টিফিকেট-মতে কারও বয়েস যদি দু-এক বছর বেশি হয়, একুশ বছর পর্যন্ত, প্রতি বছরে পাঁচ টাকা জরিমানা দিয়ে সে খেলোয়াড়কে নামানো যাবে। আবার উচ্চতার ব্যাপারে ইঞ্চি প্রতি দশটাকা সাড়ে পাঁচ ফুট পর্যন্ত ছাড়।
একটু লম্বা বা বয়েস বেশি প্লেয়ার হলেই রঞ্জনবাবুর সঙ্গে সঙ্গে আয়বৃদ্ধি। এ ছাড়া প্লেয়ারদের লেবু এবং চুয়িংগাম হাফটাইমে সরবরাহ করেও টুর্নামেন্ট কমিটি ওরফে রঞ্জনবাবুর মোটামুটি কিছু বাঁধা উপার্জন হতে লাগল। সেই সঙ্গে নিয়ম করা হল, দুই প্রতিযোগী টিম দুই হাফে খেলার বল দেবে। অনেক সময় কোনও কোনও দল বল না আনলে অথবা তাদের বল ফেটে গেলে, লিক হয়ে গেলে মাত্র বারো টাকা দিলেই টুর্নামেন্ট কমিটি বল সরবরাহ করে।
ইতিমধ্যে আরও দু-একটি নতুন উপসর্গ দেখা গেল। খেলার মাঠে রেফারির বিচারে সন্তুষ্ট না হয়ে বিভিন্ন টিম প্রতিবাদ জানিয়ে আবেদন করছে। রঞ্জনবাবু প্রটেস্ট ফি করে দিলেন পঁচিশ টাকা। এর পরে দেখা গেল যে অপর পক্ষও প্রটেস্টের বিপক্ষে আবেদন জানাচ্ছে। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয়। পক্ষের কাউন্টার প্রটেস্ট ফি ধার্য করা হল পঞ্চাশ টাকা।
এইরকম যখন চলছে তখন একদিন রঞ্জনবাবু দেখলেন যে একটা পকেটমার রাস্তায় ধরা পড়ে খুব মার খাচ্ছে। রঞ্জনবাবু হাজার হলেও কবি মানুষ, তার কী রকম মায়া হল, তিনি আর দু-চারজন ভাল লোকের সহযোগিতায় লোকটিকে গণধোলাই থেকে কোনওক্রমে উদ্ধার করে, দুটো ধমক দিয়ে ছেড়ে দিলেন। পকেটমারটি যাওয়ার সময় জানাল, হুজুর, আমার নাম লাল্লু, আপনি আমার প্রাণ বাঁচালেন।
কয়েকদিনের মধ্যে লাল্লুর সঙ্গে রঞ্জনবাবুর আবার দেখা হল। ময়দানে একটা বড় ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন, বেরিয়ে আসার মুখে দেখলেন লাল্লু কয়েকজনের সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে খেলার কথা আলোচনা করছে।
সেইদিন রাতে একটা নতুন চিন্তা এল কবি রঞ্জন চক্রবর্তীর মাথায়। না, কোনও নতুন আধুনিক কবিতা নয়। তার চেয়ে অনেক দামি, অনেক জরুরি, রঞ্জন টুর্নামেন্টের আয় বাড়ানোর একটা পাকা বন্দোবস্ত।
লাল্লু ফুটবল খেলাটা নিশ্চয় কিছু বোঝে। আর তা ছাড়া সে মার খেতেও ওস্তাদ। সুতরাং তাকে যদি একটা হুইসিল দিয়ে হাফপ্যান্ট পরিয়ে রেফারি করে দেয়া যায় আর সে যদি প্রতি খেলায় দু-চারটে গোলমেলে সিদ্ধান্ত যথা ভুল পেনাল্টি, গোল হয়ে যাওয়ার পরে অফসাইড, অথবা নির্বিচারে লাল কার্ড দেখায়, তবে ভুক্তভোগী দলের সমর্থকদের হাতে তার প্রহৃত হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্য থাকবে। কিন্তু প্রটেস্ট-ফি, কাউন্টার প্রটেস্ট-ফি বাবদ যথেষ্ট আয় হবে।
দু-চারদিনের মধ্যে ময়দানে গিয়ে লাল্লুকে পূর্বস্থানে ধরে ফেললেন রঞ্জনবাবু। সে ফুটবলে পরমোৎসাহী। রঞ্জনবাবু লাল্লুকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পাশে একটা বেঞ্চিতে বসে বিস্তারিত আলোচনা করলেন।
লাল্লু জাতে পকেটমার এবং অতি চতুর। সে কিছুক্ষণের কথাবার্তাতেই রঞ্জনবাবুর অভিসন্ধি ধরে ফেলল। রঞ্জনবাবু তাকে পাকা মাস-মাইনেয় রঞ্জন টুর্নামেন্টের রেফারি হিসেবে নিয়োগ করলেন। লাল্লু মাসে তিনশো টাকা পাবে, সকালে সাড়ে সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত ডিউটি। তাকে রেফারির ড্রেস এবং জুতো, সেইসঙ্গে হুইসিল কিনে দেওয়া হল। লাল কার্ড, হলুদ কার্ড ইত্যাদিও সংগ্রহ করে দেয়া হল।
লাল্লুর প্রধান কাজ হল মার খাওয়া। প্রত্যেক খেলায় তাকে মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত দিতে হবে, এতে মারামারি হয়ে খেলা ভেঙে যায় যাবে। তারপর প্রটেস্ট-ফি আর কাউন্টার প্রটেস্ট-ফি বাবদ নিশ্চয় পঁচাত্তর টাকা আয় হবে।
মার খাওয়া লাল্লুর যথেষ্ট অভ্যেস আছে। আর খেলার মাঠে গোলমাল বাধানোয় সে যাকে বলে এক্সপার্ট।
রঞ্জন টুর্নামেন্টের রমরমা শুরু হয়ে গেল। ফাউল, অফসাইড, এমনকী পেনাল্টি পর্যন্ত ভুল সিদ্ধান্ত দিতে লাগল লাল্লু, হরদম বাঁয়ে ডাইনে প্লেয়ারদের লাল কার্ড, হলুদ কার্ড দেখাতে লাগল সে।
গোলমাল, হইচই, মারপিট, অকহতব্য অবস্থা প্রতিদিন রঞ্জন টুর্নামেন্টের খেলায়, প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে প্রহৃত হতে লাগল লাল্লু। মার খাওয়ায় সে পোক্ত, দু-চার হাজার ঘুষি, লাথিতে তার কিছু হয় না, কিন্তু অভিনয় করে দুটো লাথির মাথাতেই সে কোঁক করে চোখ উলটে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। লড়াকু জনতা তার এই অবস্থা দেখে সরে পড়ে।
তারপর প্রটেস্ট, কাউন্টার-প্রটেস্ট। রঞ্জন টুর্নামেন্টের তহবিল স্ফীত হতে লাগল, রঞ্জনবাবুও একলাফে তিনশো টাকা থেকে পাঁচশো টাকা করে দিলেন লাল্লুর মাসিক বেতন।
এক বাঙালি কবির বাণিজ্যপ্রতিভার এই কাহিনিটি এখানে শেষ করতে পারলেই ভাল হত, তাতে গল্প হয়তো তেমন জমত না কিন্তু সকলেরই মুখরক্ষা হত।
