রঞ্জন চক্রবর্তী বুঝতে পারলেন, কোথাও একটা কিছু ভুল হয়েছে। কোনও খেলোয়াড়ের উপহারটা তার ভাগে এসে পড়েছে আর সেই খেলোয়াড় তাঁর কাঁচের ফুলদানিটা লাভ করেছে।
এই ঘটনা এখানে শেষ হলে এ গল্প লেখার দরকার হত না। আমাদের এই সামান্য কথিকা এর পরেই শুরু হচ্ছে। এরপরে, মানে কবি রঞ্জন চক্রবর্তী ফুটবলের শিল্ড পাওয়ার পরে।
রঞ্জনবাবুর বয়েস তিরিশের কাছাকাছি। এখন পাকাপাকিভাবে তার কোনও জীবিকা নেই। যাদবপুরের দিকে একটা বাড়ির দেড়তলায় গ্যারেজের উপরের ঘরে নিজের থাকার জায়গা করে নিয়েছেন। সেই ঘরে একটা ছোট র্যাকে ভরতি যত রাজ্যের কবিতার বই, তারই উপরের তাকে তিনি উত্তর বারাসাত থেকে পাওয়া ফুটবলের শিল্ডটি সাজিয়ে রেখেছেন।
এর মধ্যে একদিন একটা ঘটনা ঘটল। দেড়তলার ঘরে জানলার পাশে একটা চেয়ারে বসে এক সন্ধেবেলা রঞ্জনবাবু বাইরের দৃশ্য অবলোকন করছিলেন, এমন সময় রাস্তা দিয়ে হিপ হিপ হুররে চেঁচাতে চেঁচাতে একটা অল্পবয়েসি ছেলেদের প্রসেশন গেল। সেই মিছিলের সকলের আগে একজন যুবকের হাতে উঁচু করে ধরা রয়েছে একটা কালো কাঠের শিল্ড, রঞ্জনবাবুর ঘরে যেমন আছে। অনেকটা সেই রকম। কোনও পাড়ার টিম খেলায় জিতে শিল্ডটা নিয়ে এই মিছিল বার করেছে।
কিছুদিন আগে একদিন দুপুরবেলা রঞ্জনবাবু তার এক বন্ধুর সঙ্গে রবীন্দ্রসরোবরে বেড়াতে বেড়াতে দেখেছিলেন এখানে ওখানে রীতিমতো উত্তেজনাপ্রদ প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল ম্যাচ চলছে। রঞ্জনবাবুর তাঁর নিজের কৈশোরের কথা মনে পড়েছিল যখন তিনি নিজেও এরকম ম্যাচ দু-চারটে খেলেছেন।
আজ এই বিজয়োৎসবের মিছিল দেখে সেই সঙ্গে সেদিনের রবীন্দ্রসরোবরের ম্যাচগুলো মনে করে নানারকম ভাবলেন। নানারকমের ভাবনা করার কবিদের অবাধ অধিকার রয়েছে, তবে আমাদের রঞ্জনবাবু কবি হলেও নির্বোধ নন। এদিন সারা সন্ধ্যা রঞ্জনবাবুর মাথায় কবিতার বদলে ফুটবল বিষয়ে নানারকম চিন্তা খেলা করল।
পরদিন দুপুরবেলা তিনি কোনও প্রেমিকা ছাড়াই জীবনে প্রথমবার একা একা রবীন্দ্র সরোবরে গেলেন। দূরদূরান্তের পাঠকপাঠিকা যাঁরা রবীন্দ্রসরোবর সম্পর্কে ভাল জানেন না, তাঁদের জানাই এই রবীন্দ্রসরোবর আগে কলকাতার লেক বলে পরিচিত ছিল। পুরনো দক্ষিণ কলকাতার শেষপ্রান্তে কয়েকটি জলাশয়, ক্লাব, মাঠ এবং একটি স্টেডিয়াম নিয়ে এই সরোবর।
রঞ্জনবাবু সরোবরে প্রবেশ করতেই একটি ছেলে তার হাতে একটি লিফলেট ধরিয়ে দিল। একটি আপ্তবাক্য আছে, যে যেমন ভাবনা করে তার তেমন সিদ্ধি হয়। রঞ্জনবাবুর ক্ষেত্রেও তাই হল। প্রথম ধাপেই তিনি যা চাইছিলেন তার অনেকটা পেয়ে গেলেন। ছোট ছাপানো কাগজটিতে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের ঘোষণা।
শিবকালী মেমোরিয়াল কাপের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। লিফলেটটিতে। পাঁচ ফুট উচ্চতার এবং ষোলো বছরের কম বয়েসিদের যে-কোনও টিম এই ম্যাচে অংশ নিতে পারবে। প্রবেশ ফি দশটাকা মাত্র। উচ্চতা এবং বয়েসের ব্যাপারে শিথিলতার ব্যবস্থা আছে, তবে তার জন্য খেলোয়াড়-প্রতি প্রত্যেক ইঞ্চিতে আট টাকা এবং প্রত্যেক বছরের জন্য পাঁচ টাকা জরিমানা প্রদেয়।
লিফলেটটি পাঠ করে এবং তারপর রবীন্দ্র সরোবরের মধ্যে বিভিন্ন মাঠে ঘুরে ঘুরে ফুটবল ম্যাচ দেখে দেখে কবি রঞ্জন চক্রবর্তীর অন্তর্দৃষ্টি খুলে গেল। তিনি গোলপার্কের দিক থেকে রবীন্দ্রসরোবরে প্রবেশ করে হাঁটতে হাঁটতে খেলা দেখে দেখে এবং সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে টালিগঞ্জ ব্রিজের দিক দিয়ে বেরিয়ে এলেন।
সামনেই রসা রোডে একটা ছোট ছাপাখানা। সেখানে ঢুকে একটি বিজ্ঞপ্তি খসড়া করে ফেললেন ছাপার জন্যে। রঞ্জন চক্রবর্তী চ্যালেঞ্জ ফুটবল টুর্নামেন্ট। দক্ষিণ কলকাতায় কিশোরদের ফুটবল খেলার প্রতিযোগিতার বিপুল আয়োজন। সোয়া পাঁচ ফুটের কম উচ্চতাবিশিষ্ট এবং পনেরো বছরের কমবয়স্ক কিশোরদের টুর্নামেন্ট। উপযুক্ত ক্ষেত্রে বয়েস এবং উচ্চতার সীমারেখা শিথিল করা হইবে। প্রবেশ মূল্য পঁচিশ টাকা।
পরের দিনই বিজ্ঞপ্তিটি ছেপে পাওয়া গেল। রঞ্জনবাবু নিজের হাতে লেকের চারধারে দেশপ্রিয় পার্কে, বিবেকানন্দ পার্কে টুর্নামেন্টের ঘোষণাপত্র বিলি করে বেড়ালেন।
রঞ্জন চক্রবর্তী চ্যালেঞ্জ ফুটবল কাপের প্রতি ছেলেদের উৎসাহ বৃদ্ধি করার জন্যে তিনি প্রথম দুটি ক্লাবকে বিনামূল্যে এবং তারপরে কয়েকটি ক্লাবকে অর্ধমূল্যে প্রতিযোগিতায় নিয়ে নিলেন। সকালবেলা বিবেকানন্দ পার্কের মাঠে খুব ভিড় হয় না, রঞ্জনবাবুর চ্যালেঞ্জ শিন্ডের খেলার সময় করা হল সকাল সাড়ে সাতটা, স্থান বিবেকানন্দ পার্ক।
ক্রমশ রঞ্জন চক্রবর্তী চ্যালেঞ্জ ফুটবল টুর্নামেন্ট দক্ষিণ কলকাতায় বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। রঞ্জনবাবু অতি বুদ্ধিমান লোক। তিনি অতি অল্পদিনের মধ্যে এই ফুটবল প্রতিযোগিতাই নিজের স্থায়ী জীবিকা করে তুললেন।
টুর্নামেন্ট একবার জনপ্রিয় হয়ে গেলে তখন আর প্রতিযোগী ক্লাবের অভাব হয় না। রঞ্জনবাবু এনট্রি ফি কুড়ি টাকায় নামিয়ে দিলেন, তা ছাড়া কোনও টিম কোনও রাউন্ডে হেরে গেলে আবার কুড়ি টাকা দিয়ে টুর্নামেন্টে অন্য নামে খেলতে পারবে। টুর্নামেন্টের ফার্স্ট রাউন্ড, সেকেন্ড রাউন্ড প্রায় আড়াই মাস তিন মাস চলে। এই সময় প্রতিদিন সকালে একটি করে খেলা, প্রায় দেড়শো টিমের কাছ থেকে রঞ্জনবাবুর তিন হাজার টাকা আয় হয়।–
