সম্পূর্ণ অনুবাদটি পুনরুদ্ধার করা রুচিসুখকর হবে না, শুধু আমাদের এই প্রতিবেদনের জন্যে যেটুকু প্রয়োজন তাই উপস্থাপন করছি।
সেই অনুবাদ পদ্যটি এই মুহূর্তে আমার হাতের কাছে নেই। কিন্তু আমার স্মৃতিশক্তির প্রতি এখনও আমার আস্থা হারায়নি, সুতরাং মনে করা যাক,
যেখানে দুই ল্যাম্পপোস্টের মধ্য দিয়ে
লম্বা পেনাল্টি কিকে
কে যেন শূন্যে পাঠিয়ে দেয়
চাঁদের ফুটবল গ্যালারিতে অস্পষ্ট ছায়াচ্ছন্ন মানুষেরা
চেঁচিয়ে ওঠে, গোল, গোল,
গোল।
ভাগ্যিস এই কবিতাটি এই মোক্ষম মুহূর্তে সদ্য সদ্য মনে পড়ল, তা না হলে কবিতা ও ফুটবল একত্রে মেলানো আমার সাধ্যি ছিল না। গল্পের খাতিরে গল্পটা লিখতেই হচ্ছে, কিন্তু সব কিছুর তো একটা যুক্তি চাই।
বহুকাল আগে এক ভিন্নদেশি যুক্তিবাদী দার্শনিক তার আদর্শ সমাজ থেকে কবিদের নির্বাসন দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই স্বপ্নের সমাজ এখনও বহুদূরের ব্যাপার।
ফলে সমাজে এখনও যথেচ্ছভাবে কবিরা বিচরণ করছেন। হয়তো তাদের কারও কারও কাছে ফুটবলের গোলমালটা ভাল নাও লাগতে পারে।
কিন্তু আমার একটা ব্যক্তিগত সুবিধা আছে, আমি কোনও কবিকে এখন পর্যন্ত চিনি না। আমার জানাশোনা আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের মধ্যে এমনও একজন নেই যাকে কবি বলা যেতে পারে বা কবি বলে ভাবা যেতে পারে। কোনওদিন কোনও কবিকে আমি স্বচক্ষে দেখিনি এ কথা বলা যাবে না, কিন্তু তারা কেউ আমাকে জানেন না আর আমিও তাদের সঙ্গে পরিচিত নই।
সুতরাং এই অপরিচয়ের সুযোগে একজন কবিকে নিয়ে একটু চপলতা করলাম। আশা করি তিনি এবং অন্য কবিরা কবিজনোচিতগুণে আমার এই অপরাধ ক্ষমা করবেন।
অবশ্য আমার হয়তো এত সাবধানতার প্রয়োজন নেই। ফুটবল বিষয়ক এরকম একটি স্কুল এবং মোটামুটি ভাবে হাস্যকর রচনা কস্মিনকালে কোনও কবি পড়বেন, এরকম ভুল আশা করাই আমার অন্যায়। আমার অন্তরাত্মা বলছে, এই লেখা কোনও কবি চোখ বুলিয়েও দেখবেন না, সরাসরি সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাকয়টি দ্রুত উলটিয়ে যাবেন। ৩৭০
তবে একচক্ষু হরিণের মতো আমি তো এতক্ষণ অন্যদিকটা মোটেই ভাবিনি। যদি ফুটবলের কোনও লোক–ফ্যান, খেলোয়াড়, রেফারি বা সাংবাদিক কারও নজরে এ লেখা পড়ে, আমি রেহাই পাব তো?
কবির প্রতিভা
কবিতা ও ফুটবল এই দুই বিপজ্জনক পদার্থ একত্র করা উচিত হল কি না এবং পরিণামে সেটা কতটা বিস্ফোরক হতে পারে, সেই বিষয়ে এই গল্পের দুর্বল কাহিনিকার তারাপদ রায়ের নিজের মনেও দুশ্চিন্তা রয়েছে। ভণিতায় তা কিছুটা বলেছি।
তবে গল্প যখন লিখতে হবেই, উপায় কী? বিস্ফোরক যদি হয় হল, দ্বিধা না করে দ্রুত মূল কাহিনিতে প্রবেশ করছি।
রঞ্জন চক্রবর্তী একজন উদীয়মান তরুণ কবি। সম্প্রতি কিছুদিন হল তার বেশ নাম হয়েছে। চারদিকে পত্র-পত্রিকায় রঞ্জনবাবুর কবিতা অল্পবিস্তর প্রকাশিত হচ্ছে। সম্পাদকের এবং অনেক পাঠক-পাঠিকার সেসব কবিতা পড়ে বেশ ভাল লাগছে।
ফলে রঞ্জনবাবু ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছেন। সভাসমিতি থেকেও তাঁর ডাক আসছে মাঝে মধ্যেই। কবি হতে গেলে শুধু কবিতা লিখলে বা ছাপিয়েই শেষ হয় না, একালে চল হয়েছে কবিকে সভায়। বা কবিসম্মেলনে সেসব কবিতা নিজেকে পাঠ করে শোনাতে হবে শ্রোতাদের। শ্রোতারা কখনও কখনও হাততালি দিয়ে, চেয়ারের হাতল চাপড়িয়ে উৎসাহ দেন, আবার কখনও ওই একই কবিতা পাঠের মধ্যস্থলে হাততালি দিয়ে বা চেয়ার চাপড়িয়ে বসিয়ে দেন।
আজ রঞ্জন চক্রবর্তী উত্তর বারাসত রাইজিং স্টার ক্লাবের সভায় কবিতা পড়তে এসেছেন। রাইজিং স্টার ক্লাবের এবার রৌপ্য জয়ন্তী উৎসব হচ্ছে। রাইজিং স্টার আসলে একটি ফুটবল ক্লাব, তবে ওই জয়ন্তী বৎসর বলে এরা এবার বার্ষিক অনুষ্ঠানটি একটু ধুমধাম করে করছে। স্থানীয় কয়েকজন ফুটবল প্লেয়ারের সঙ্গে তারা একজন অভিনেত্রী, দুজন গায়ক এবং পাঁচজন কবিকেও সংবর্ধনা জানাচ্ছে।
ফুটবল প্লেয়ারদের বক্তৃতা, অভিনেত্রীর আবৃত্তি, গায়কদের গান ইত্যাদির শেষে কবিরাও কবিতা পাঠ করলেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার ছিল এসবের পর। একে একে সকলকে ক্লাবের তরফ থেকে একটি করে উপহার দেওয়া হল।
রঞ্জন চক্রবর্তীও একটি উপহার পেলেন। রঙিন কাগজে জড়ানো কী একটা জিনিস। সংকোচ-বশত সেটা আর খুলে দেখলেন না।
ফেরার পথে ট্রেনে বসে শেয়ালদার পথে অন্য কবিদের সঙ্গে রঞ্জনবাবুও প্যাকেটের রঙিন মোড়ক ছাড়িয়ে দেখলেন ভিতরে কী উপহার আছে। প্রত্যেক কবিই একটা করে প্যাকেট পেয়েছে। প্রত্যেকেরই প্যাকেটে একটা করে সুদৃশ্য ফুলদানি রয়েছে, সুন্দর রঙিন কাঁচের জিনিস। কিন্তু রঞ্জনবাবুর মোড়কের ভেতর থেকে যেটা বেরোল, সেটা একটু অন্যরকম। জিনিসটা ঠিক কাব্যময় নয়।
একটা কালো আবলুস রঙা কাঠের ওপর তামার তৈরি কয়েকজন ফুটবল খেলোয়াড়ের সাবলীল মূর্তি এবং তাদের পদপ্রান্তে একটি ফুটবল। অর্থাৎ, একটি সচল ফুটবল খেলার দৃশ্য। সাধারণ ছোটখাটো ম্যাচে বিজয়ীদের এই ধরনের শিল্ড দেয়া হয়।
অন্য দশজনের মতো বাল্যে ও কৈশোরে রঞ্জনবাবুও ফুটবল খেলেছেন। সে আহামরি কিছু নয়। আজ কবি হিসেবে এসে ফুটবলের শিল্ড পেয়ে তিনি একটু বিব্রত বোধ করলেন। সহযাত্রী কবি চারজনও ঠোঁট টিপে হাসলেন, একজন বক্রোক্তি করলেন, খুব ভাল খেলেছ রঞ্জন, একেবারে শিল্ড পেয়ে গেলে।
