তখন প্রভাত-সূর্যের রঙিন রশ্মিীমালা পাঁচতলার পূর্বমুখী ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে ডক্টর উমাকুমার চক্রবর্তীর পড়ার টেবিলে এসে পড়েছে। তারপর ভোরের সোনালি আলোয় শ্রীমতী উমা চক্রবর্তীর ছবিটা ভাল করে দেখতে লাগলেন। লোকে যাকে কনে-দেখানো-আলো বলে এটা ঠিক সেরকম আলো নয়, কিন্তু অনেকটা তার কাছাকাছি। শুধু কাছাকাছি নয় বরং বলা চলে আরও মনোরম।
শ্রীমতী উমার চেহারা ভাল, লেখাপড়া ভাল। শ্রীমতী উমাকেই উমাকুমারের পছন্দ হল। তবে নিজের মনে পছন্দ শব্দটা নিয়ে উমাকুমার কিঞ্চিৎ বিব্রত ও লজ্জিত বোধ করলেন। লোকে পাত্রী পছন্দ করে, প্রাইভেট সেক্রেটারি সম্পর্কে এ শব্দটা খাটে না, এ বিষয়ে কী একটা শব্দ আছে, উমাকুমারের কিছুতেই মনে এল না।
সে যা হোক, শেষ পর্যন্ত স্বনামধারিণীকেই নিয়োগপত্র পাঠালেন তিনি। যথাসময়ে মেয়েটি এল এবং তাকে দেখে, ফটো দেখে যতটা মুগ্ধ হয়েছিলেন ততটাই চমকিত হলেন তিনি।
ছবির সঙ্গে কিছুই মিলছে না। সেই ডাগর-ডোগর আঁখি, পাতলা ঠোঁট, উড়ুউড়ু চুল কিছুই মিলছে না। প্রথম দর্শনেই এ কথা উমাকে জানালেন উমাকুমার, আরও বললেন, এটা জোচ্চুরি, রীতিমতো জোচ্চুরি।
ফটোর চেহারার মতো দেখতে না হলেও ঊনপঁচিশ, কালো চোখের ঝকঝকে মণি, মোটা ঠোঁট, শ্যামলা রঙের এই মেয়েটিও তুচ্ছ নয়। সে চোখ নাচিয়ে বলল, জোচ্চুরি আবার কী, আমি তো ইয়ার্কি করেছি, আপনি বুঝতে পারেননি?
উমাকুমার বিব্রত বোধ করলেন, বললেন, কীসের ইয়ার্কি? কী বুঝতে পারব?
উমা বলল, ও ছবিটা কার? ভাল করে দেখুন? সন্ত্রস্তভাবে ভাল করে দেখেও উমাকুমার কিছু বুঝতে পারলেন না। তখন মেয়েটিও খুব ঘাবড়িয়ে গেল, বলল, সত্যি আপনি এই ছবি আগে দেখেননি!
যখন উমাকুমার অকপটে স্বীকার করলেন সত্যিই তিনি এই ছবিরানিকে চেনেন না, উমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে, তারপর বলল, স্যার, পায়ের ধুলো দিন।
দীর্ঘদিন মার্কিন দেশে বসবাস করে পায়ের ধুলোর ব্যাপারটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন উমাকুমার, ফলে আজ এই ফাজিল মেয়েটির অনুরোধ রক্ষা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হল না।
আসলে এই মেয়েটি নিজের ফটো না পাঠিয়ে সিনেমার কাগজ থেকে এক নায়িকার পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি কেটে নিজের দরখাস্তের সঙ্গে লাগিয়ে পাঠিয়েছিল। সে নিতান্তই খেলাচ্ছলে দরখাস্তটি পাঠায়, ধরেই নিয়েছিল চাকরি হবে না, তা না হোক, এই অনাবাসীর সঙ্গে একটু ইয়ার্কি করতে দোষ কী? দোষ নেই কিছু, কিন্তু এই অনাবাসী যে সিনেমা তারকার হৃদয়স্পন্দনকারী ফটো দেখেও ঠাট্টাটা ধরতে পারবেন না, তার কারণ তিনি দীর্ঘ দশ বছর কোনও দিশি ছবি দেখেননি, এটা শ্ৰীমতী উমা বুঝে উঠতে পারেনি। তার মুখে বিস্তৃত ব্যাখ্যা শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। উমাকুমার।
এবার মেয়েটি উঠল, উঠে হাসিমুখে বলল, সরি! সত্যিই আমি দুঃখিত। আমি যাচ্ছি। আপনার অসুবিধে করার জন্যে ক্ষমা চাচ্ছি।
মেয়েটির চলে যাওয়া দেখে, কী ভেবে উমাকুমার বললেন, কোথায় যাচ্ছ? তোমাকে তো আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছি?
উমা হাসিমুখে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, অ্যাপয়েন্টমেন্ট! আমার চাকরি এখনও আছে?
উমাকুমার বললেন, অবশ্যই আছে।
কাজে বহাল হয়ে গেল উমা। উমাকুমারের টেলিফোন ধরে, চিঠির উত্তর টাইপ করে, বক্তৃতার বয়ান লেখে। প্রয়োজনে রান্নাঘরে ঢুকে দু পেয়ালা চা বানিয়ে নিয়ে এক পেয়ালা খায়, এক পেয়ালা উমাকুমারকে দেয়। উমাকুমার যখন কোথাও বক্তৃতা করতে যান, সেও তার সঙ্গে যায়। উমাকুমার গাড়ি চালায়, সে পাশের সিটে বসে থাকে। উমাকুমার যখন বক্তৃতা করেন, উমা সামনে বসে নোট রাখে।
এরই মধ্যে একদিন একটা গণ্ডগোল হল। কলকাতার কাছাকাছি একটা অভিজাত সমাজসেবী প্রতিষ্ঠান থেকে একটা বক্তৃতার আমন্ত্রণ এল উমাকুমারের কাছে, বিষয়, আজকাল বাঁশগাছ আর তত লম্বা হচ্ছে না কেন? বিষয়টি মোটেই নতুন নয়, বরং বেশ পুরনো। কিন্তু বিষয়টি উমাকুমারের খুব প্রিয়। আমেরিকায় ওকবৃক্ষের ক্রমহ্রাস্বত্ব-প্রাপ্তি বিষয়ে তাঁর বক্তব্য গত বছরেই সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তা ছাড়া ঠিক এই একই বিষয়ে তিনি এখন একজন প্রায় স্পেশালিস্ট, ইতিমধ্যে অন্তত আরও দশ জায়গায় বাঁশগাছের এই অধধাগতি বিষয়ে তিনি বক্তৃতা করে এসেছেন। এ বিষয়ে এ দেশেও তার খ্যাতি বেশ ছড়িয়ে পড়েছে।
কিন্তু মুশকিল হয়েছে অন্যখানে। এবারের নিমন্ত্রণ একটা অন্য ধরনের গণ্ডগোল। বক্তৃতানুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা একটি মারাত্মক ভুল করেছেন। তাঁরা চিঠিতে ডক্টর উমাকুমার চক্রবর্তীকে শ্রীমতী উমা চক্রবর্তী বলে সম্বোধন করেছেন। কী রকম যেন খটকা লাগল ডক্টরের, তিনি উমাকে বললেন, শ্রীমতী বলে লিখেছেন, মনে হচ্ছে এটা তোমাকেই বক্তৃতা করতে ডেকেছে। আমাকে নয়।
উমা বলল, তা হতে পারে না। আমাকে কেন বক্তৃতা করতে ডাকবে? ওরা আপনাকেই ডেকেছে। ভুল করে আপনাকে মহিলা ভেবেছে।তারপর একটু থেমে থেকে বলল, তবে আপনার এই বাঁশগাছের বক্তৃতাটা এতবার শুনেছি আর নোট নিয়েছি যে আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। আপনি যদি বলেন আমিও গিয়ে বক্তৃতাটি করে আসতে পারি।
সামান্য ভাবলেন উমাকুমার, তারপর ঠিক করলেন, ঠিক আছে, একটু মজা করাই যাক না, আর মেয়েটা কেমন বলে সেটাও দেখা যাবে।
