বলা বাহুল্য, উমাকুমারের বক্তৃতার বিষয়গুলি যথেষ্টই আকর্ষণীয়। শ্যামবাজার ট্রামডিলোর মধ্যে বহুদিন আগে একটা কাঠবাদাম গাছ ছিল, এখন আর নেই। এ বিষয়ে উমাকুমারের মর্মস্পর্শী বক্তৃতা, শ্যামবাজারের শেষ বাদামগাছ যেকোনও শ্রোতার মনে কৌতূহল সৃষ্টি করতে বাধ্য।
কলকাতার চিরঅবহেলিত রাস্তার কুকুরদের সম্পর্কে তার মনোজ্ঞ আবেদন, নেড়ি কুকুরদেরও দরকার আছে অথবা অসামান্য কবিত্বময় তার উদ্ভিদ-চিন্তা পরের জন্ম যদি থাকে, সেই জন্মে যেন বনতুলসীর জঙ্গল হয়ে জন্মগ্রহণ করি–এই রকম সব বিষয়ের প্রতি সাধারণ মানুষের যথেষ্টই প্রাণের টান আছে, উমাকুমারের এটা ধরতে বিশেষ দেরি হয়নি।
কিন্তু প্রথমদিকে সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল উমাকুমারের যে আলোচনাটি, তার নামটি একটু দীর্ঘ, কিন্তু বড় ভাল– নিজের ঘরে নিজের জানলা, নিজের জানলায় নিজের টব, নিজের টবে নিজের গাছ, নিজের গাছে নিজের ফুল গন্ধরাজ, বেল কিংবা শেফালি, বকুল।
ব্যাপারটা কিছুদিনের মধ্যেই বেশ জমে উঠল। লোকজন খবর নিতে লাগল, কে এই ডক্টর। উমাকুমার চক্রবর্তী? কম-বেশি নিমন্ত্রণ আসতে লাগল এদিক ওদিক, এ-শহর ও-শহর থেকে।
অতঃপর বক্তৃতাসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে উদ্যোগী হলেন ডক্টর চক্রবর্তী। ব্যাপারটাকে সম্মানজনক পর্যায়ে রাখতে হবে, এবং তার প্রথম ধাপ হল সুন্দরী, সুশ্রী, শিক্ষিতা ও বুদ্ধিমতী ব্যক্তিগত সহায়িকা বা পার্সোনাল অ্যাসিস্টান্ট নিয়োগ করা।
নিজের চিঠি নিজেই উত্তর দেওয়া, বাইরের কেউ এলে তার সঙ্গে নিজেই দেখা করা বা কথাবার্তা বলা একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীর পক্ষে মোটেই সম্মানজনক নয়। সুতরাং একজন পার্সোনাল অ্যাসিস্টান্ট চাই, সবচেয়ে ভাল হয় যদি তাকে বলা হয় প্রাইভেট সেক্রেটারি, তাতে আভিজাত্য আসে এবং সেই সঙ্গে সেই সেক্রেটারি যদি সুন্দরী বিদুষী হয়, তবে তো কথাই নেই।
ডক্টর চক্রবর্তী অনেক ভেবে-চিন্তে একটি খবরের কাগজে রবিবাসরীয় কলমে বিজ্ঞাপন দিলেন।
অনাবাসী বুদ্ধিজীবীর জন্য সপ্রতিভা, সুশিক্ষিতা সুন্দরী মহিলা আবশ্যক। বেতন যোগ্যতানুযায়ী। ফটোসহ আবেদন করুন।
বিজ্ঞাপনটি খবরের কাগজে পাঠিয়ে দিয়ে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন উমাকুমার। আজকাল রবিবারের পাতায় বিজ্ঞাপন ছাপা হতে বেশ সময় লাগে। সে হতেই পারে। কিন্তু কোনও এক রবিবার খুব সকালে হট্টগোলে, চিৎকার-চেঁচামেচিতে, বামাকণ্ঠের কলহে ও আর্তনাদে ঘুম থেকে ধড়মড় করে জেগে উঠলেন ডক্টর চক্রবর্তী। তাড়াতাড়ি জানলার পর্দা সরিয়ে তার পাঁচতলার ফ্ল্যাটের ওপর থেকে নীচে তাকিয়ে দেখলেন বিশাল ভিড়, সামনের রাস্তায় শুধু মহিলা আর মহিলা।
উমাকুমার বিজ্ঞাপনে নির্দেশ দিয়েছিলেন সপ্রতিভা, সুশিক্ষিতা, সুন্দরী, তিনি বিস্মিত হয়ে প্রচুর পরিমাণ সপ্রতিভা মহিলা দেখতে পেলেন, কিন্তু তারা সুশিক্ষিতা অথবা সুন্দরী কিনা এত উঁচু থেকে ধরতে পারলেন না। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই অনুধাবন করতে পারলেন, হয়তো, হয়তো কেন নিশ্চয়, এই মহিলারা তার সেই সরল বিজ্ঞাপন দেখেই এসেছেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আদিম আত্মরক্ষার প্রেরণায় উমাকুমার ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে তার আগে যত দ্রুত সম্ভব প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে পেছনের লিফট দিয়ে নেমে সোজা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আপাতত ঘূর্ণায়মতী কালোপরীর ছায়ায় আশ্রয় নিলেন।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাঠের মধ্যেই একটা রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানে সামান্য চা-জলখাবার খেয়ে দশটা নাগাদ ফ্ল্যাটের দিকে ফিরে এসে দেখলেন ভিড় একটু হালকা হয়ে এসেছে। তবে তখনও মহিলার সংখ্যা যথেষ্ট। এবং তাদের কারও কারও চেহারা দেখে সুন্দরী বা সপ্রতিভা মনে না হলেও যথেষ্টই বিপজ্জনক মনে হচ্ছে। সুখের কথা, এঁরা কেউই তাঁকে চেনেন না এবং সেই সুযোগে অবস্থাটা একটু বুঝে উঠেই ফ্ল্যাটের মধ্যে না গিয়ে উমাকুমার আবার গা-ঢাকা দিলেন।
দুপুরে হোটেলে খেয়ে, বিকেলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে বার কয়েক চক্কর দিয়ে অবশেষে নাইট শোয়ে সিনেমা দেখে খুব সন্তর্পণে বাড়ি ফিরলেন উমাকুমার। অত রাত পর্যন্ত কারও অপেক্ষা করার কথা নয়, তবু খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি।
সে যা হোক, লিফটের কাছে নিজের ডাকবাক্সে দেখলেন গাদা গাদা দরখাস্ত পড়ে রয়েছে। তার অনেকগুলির সঙ্গেই সাটিফিকেট এবং ফটো যুক্ত। পাঁচতলায় ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে দেখলেন সেখানেও দরজার ফাঁক দিয়ে বহু সচিত্র এবং স-সার্টিফিকেট আবেদনপত্র গাদা করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মোটামুটি গোনাগুনতি করে মনে হল, অন্তত দুশো-আড়াইশো দরখাস্ত নিশ্চয়ই হবে। এর মধ্যে যেগুলির সঙ্গে ছবি আছে সেগুলি আলাদা করে বাছাই করলেন উমাকুমার। তারও সংখ্যা প্রায় ষাটটা হবে।
সেদিন বিনিদ্র রজনী যাপন করলেন কুমার উমাকুমার। অনেক রকম দেখেশুনে বিবেচনা করে অবশেষে ভোর চারটে নাগাদ মোটমাট সাতজনকে বাছাই করলেন তিনি, যাদের লেখাপড়া ভাল, দেখতে ভাল, তা ছাড়া ছবি দেখে স্মার্ট মনে হয়, বাংলায় যাকে বলে সপ্রতিভা। তবে এর পর এই সাতজনের নাম-ঠিকানা, কাছে থাকে না দূরে থাকে, জাতধর্ম কী ইত্যাদি বিবেচনা করতে গিয়ে শুধুমাত্র একটা দরখাস্তেই আবদ্ধ হয়ে গেলেন উমাকুমার। কারণ আর কিছুই নয়, দরখাস্তকারিণীর তারই নামে নাম, শ্রীমতী উমা চক্রবর্তী।
