নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট স্থানে উমাকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন। উমা গটগট করে নেমে মঞ্চেও উঠে একঘণ্টা ঝড়ের মতো বলে গেল পরিবেশ দূষণের ফলে কী করে বাঁশগাছ ছোট হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ, এতে কী ক্ষতি হচ্ছে পৃথিবীর, মানবসমাজের, জীবজগতের এবং এর প্রতিকারই বা কী?
শ্রোতারা, শুধু শ্রোতারাই বা কেন, ডক্টর উমাকুমার চক্রবর্তীও মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন সেই বক্তৃতা। এরপর যখন সভাকক্ষ থেকে পণ্ডিত শ্রোতারা একে একে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন শ্রীমতী বক্তাকে, উমাকুমার একটু চিন্তিত হলেন, এসব কঠিন প্রশ্নের উত্তর কী করে দেবে মেয়েটা?
কিন্তু উমাকে তখনও তার সঠিক পরিমাপ করা হয়নি। প্রশ্নগুলো শোনামাত্র উমা মঞ্চ থেকে নামতে নামতে বলল, এসব অতি সাধারণ প্রশ্নের আমি আর কী উত্তর দেব? আমার ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করুন সেই সব বলতে পারবে, বলে সে ইঙ্গিতে উমাকুমারকে দেখিয়ে দিল। আইনস্টাইনকে জড়িয়ে এ ধরনের একটা গল্প উমাকুমার আগে কোথায় যেন পড়েছিলেন, এখন উমার কথা শুনে তাজ্জব হয়ে গেলেন।
এ গল্প আর বেশি টেনে নিয়ে লাভ নেই। যাঁরা যা বোঝার, সবাই বুঝতে পেরেছেন। শুধু শুধু কালি কাগজ অপচয় করে কী হবে?
শুধু একটা কথা, এদেশের হাওয়া, ভেজাল সরষের তেল, রোদ, মশা ডক্টর উমাকুমারের আর সহ্য হচ্ছে না। তিনি আমেরিকায় ফিরে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে তার সুযোগ্য সহকারিণী শ্রীমতী উমা চক্রবর্তীও যাচ্ছেন।
কণ্টকাকীর্ণ
যথা সময়েই পৌঁছানো গেল। আমার বন্ধু সমীরের কাকার শ্রাদ্ধবাসর। আশা করেছিলাম বন্ধুবান্ধব অন্যান্য অনেকেই হয়তো আসবেন। কিন্তু গিয়ে দেখলাম আমি একা, আর সবই সমীরদের আত্মীয়স্বজন এবং পারিবারিক বন্ধুবান্ধব। একা একাই চুপচাপ বসেছিলাম, এমন সময় সমীর এসে আমার পাশে বসল।
বাইরের ঘরের পাশে একটা প্যাসেজের মধ্যে বসে আছি। একে একে অতিথি-অভ্যাগত সব প্রবেশ করছেন। সমীর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে–ইনি আমার মেজো মেলোমশাই, ইনি আমার রাঙাদির দেওর। ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও সময়োচিত গাম্ভীর্যসহকারে ভদ্রতা বিনিময় করছি। এর মধ্যে একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন, সুসজ্জিত অবয়ব। কিন্তু সমীর তার পরিচয় দিতেই আঁতকে প্রায় চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম, ইনি আমার যে কাকা মারা গেছেন, আজ যাঁর শ্রাদ্ধ…ইতিমধ্যে ভদ্রলোক আমাদের সামনে এসেছেন। আমি ইতস্তত করতে করতে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনার সঙ্গে দেখা হবে আশা করিনি।
ভদ্রলোক বিগলিত হাস্যে জানালেন, হ্যাঁ, আমি একটু দূরে থাকি আজকাল, তার উপরে, আসা-যাওয়ারও অসুবিধা।
ভদ্রলোক ভেতরের দিকে চলে গেলেন। আমি সমীরকে বললাম, আমি চলি ভাই। যাঁর শ্রাদ্ধে এসেছি তার সঙ্গে দেখা হবে এরকম আশা করতে পারা যায় না। এইবার সমীর বলল, আরে, না শুনুন, ইনি হচ্ছেন আমার যে কাকা মারা গেছেন…
আমি বাধা দিয়ে বলি, আমিও সেই জন্যেই বলছিলাম।
এইবার সমীর বাক্য সম্পূর্ণ করে, আরে ইনি হচ্ছেন যে কাকা মারা গেছেন, যাঁর শ্রাদ্ধ তার বন্ধু।
অতঃপর আশ্বস্ত হওয়া গেল। সমীর ইতিমধ্যে আমাকে খুব নিচু চাপা গলায় ফিসফিস করে জানাল যে, এই ভদ্রলোক একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি–কোনও এক বিখ্যাত গন্ধতৈল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের একমাত্র স্বত্বাধিকারী, থিয়েটার রোডে বিশাল বাড়ি এবং তার অন্যান্য ঐহিক গৌরব সম্বন্ধে বহু বিষয়ও আমাকে অবগত হতে হল।
খাওয়ার ডাক পড়ল। এবং সৌভাগ্যবশত আমি ঠিক সেই ভদ্রলোকের পাশেই বসলাম। খেতে খেতে একটা জিনিস দেখে ক্রমশই বিচলিত হচ্ছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি, ভদ্রলোক বড় বেশি গলাধঃকরণ করছিলেন। একে ঠিক খাওয়া বলা সম্ভব নয়, কোনও ধনবান ব্যক্তি যে এরকম গোগ্রাসে খেতে পারেন আমার ধারণায় ছিল না। এবং শেষে সেই সর্বনাশ ঘটল। আমি গুনে যাচ্ছিলাম, ষোড়শ অথবা সপ্তদশ মৎস্য খন্ডটি গিলতে গিয়ে ভদ্রলোকের গলায় কাঁটা ফুটল। এতক্ষণ কাটা যে কেন ফোটেনি সেটাই আশ্চর্য। গলায় না ফুটলেও তার পাকস্থলীতে অন্তত শতাধিক কাটা ইতিমধ্যে সমবেত হয়েছিল সে বিষয়ে আমি এবং হয়তো আরও অনেকেই নিঃসন্দেহ ছিল। সুতরাং যখন তিনি ঘোষণা করলেন যে তার গলায় একটা কাটা ফুটেছে, তখন আমরা কেউই বিশেষ আশ্চর্য হলাম না, বরং কেউ কেউ যেন এই ভেবে আশ্বস্ত হলেন যে, এইবার খাওয়ার বহর একটু কমবে।
কিন্তু কার্যকালে দেখা গেল, ফলাফল অন্য আকার ধারণ করেছে। ভদ্রলোক–ইতিমধ্যে জানা গিয়েছিল যে, ভদ্রলোকের নাম শচীবিলাসবাবু, ভয়ংকর হাঁস-ফাস শুরু করে দিলেন। তখন আমি ভদ্রলোককে বললাম, দেখুন, আমি খুব তাড়াতাড়ি খাই, আমার মধ্যে মধ্যেই গলায় কাঁটা ফোটে ও কিছু হয় না।
শচীবিলাসবাবু একবার গম্ভীর হয়ে আমার দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করলেন তারপর কঠিন কণ্ঠে বললেন সকলের জীবনের দাম সমান নয়। সত্যিই এর পরে আমার আর কিছু বলার থাকে না।
একজন পরামর্শ দিলেন শুকনো সাদা ভাত গিলে খেলে কাটা নেমে যেতে পারে। সাদা ভাত আনতে বলা হল। শচীবিলাসবাবু পর পর বড় লোহার হাতার চার হাতা সাদা ভাত গিলে ফেললেন। কিন্তু তাঁর মুখে-চোখে স্পষ্টই দেখা গেল তার কাটা তখনও রয়েছে। এবার একজন পরামর্শ দিলেন আস্ত কলা গিলে খেলে হয়তো একটা সুরাহা হতে পারে। বাড়িতে অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য সুলভ হলেও কলা নেই। নিকটবর্তী বাজার তখন প্রায় বন্ধ, তবুও অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে একটা ফলের দোকান খোলানো গেল, কিন্তু দোকানদার কিছুতেই দুজনের কম কলা এতরাত্রে বেচতে নারাজ। যে কিনতে গিয়েছিল সে বাধ্য হয়ে তাই-ই কিনে আনল। সবগুলি কলাই শচীবিলাসবাবুর কাজে লাগল, কিন্তু ফল হল না,ন যযৌ ন তস্থৌ, কাঁটা স্থির। রসগোল্লার রস ফেলে শুকনো শুকনো ছিবড়ে খেলে বোধহয় উপশম হতে পারে–এবার শচীবিলাসবাবু নিজেই বাতলালেন। অনুরূপ প্রক্রিয়ায় রসগোল্লা গ্রহণ করা চলল, না গুনিনি–গোনা সম্ভব ছিল না, প্রয়োজনও ছিল না। কেননা আমাদের বাকি অন্যান্যদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না, কিন্তু কাটাটি শচীবিলাসবাবুর গলায় তখনও বিধে রয়েছে। না, না এখনও খচখচ করছে। তার কাতরোক্তি অনবরত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
