অবশেষে যখন ছেচল্লিশ বছর বয়েসে এসে পৌঁছলেন উমাকুমার, তখন তার সব কিছুর উপর বিতৃষ্ণা এসে গেল। ঠিক করলেন আর নয়, এবার সব ছেড়ে-ছুঁড়ে দেশে চলে যাবেন। ইতিমধ্যে উমাকুমার পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ে বিভিন্ন উচ্চকুলশীল প্রতিষ্ঠানে এবং সভা-সমাবেশে বক্তৃতা করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন।
বছরখানেক আগে মাসখানেকের জন্যে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি। তার কিছুটা কাটিয়েছিলেন কলকাতায়, বাকিটা দিল্লিতে। দিল্লিতে তাঁর একদম ভাল লাগেনি। সন্ত্রাসবাদীদের অত্যাচারে সর্বদা একটা তটস্থ ভাব। তিনি থাকতে থাকতেই দুজন সন্ত্রাসবাদী মোটর সাইকেলে চড়ে এক পাড়ার মধ্যে ঢুকে স্টেনগান চালিয়ে নির্বিচারে নিরীহ লোকদের হত্যা করে। নিউইয়র্কে কিংবা লস এঞ্জেলসে বসে এসব খবর শুনে উত্তেজিত হওয়া যায়, বিতর্ক করা যায়, কিন্তু একেবারে পাশের পাড়ায় এমন ঘটলে খুবই বিড়ম্বনা এবং আতঙ্কের ব্যাপার।
সেই তুলনায় বহু-নিন্দিত কলকাতা ভাল। কিন্তু তার যানবাহন, রাস্তাঘাট, কুখ্যাত লোডশেডিং আর সেই সঙ্গে ডক্টর উমাকুমার চক্রবর্তীর অনাবাসী ভারতীয় অভ্যেসসমূহ বাদ সেধেছিল।
কিন্তু তবুও উমাকুমার নানা দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রবাসে যে নিঃসঙ্গ জীবন তার চেয়ে কলকাতায় কষ্টে থাকা ভাল। সব চেয়ে বড় কথা, জনমদুখিনী মাতৃভূমির প্রতি কিছু কর্তব্য পালন করার জন্যে, যেমন এসব ক্ষেত্রে হয়, উমাকুমারবাবুর মনে আদর্শবোধ জাগ্রত হল। এই সঙ্গে আর একটা কথাও বিশেষ বিবেচ্য ছিল তার কাছে, সেটা হল যে পরিবেশের ব্যাপারে তৃতীয় পৃথিবীর এই অর্ধসভ্য দেশের লোকদের সচেতন করার দায়িত্বও তার যথেষ্ট রয়েছে। টরেন্টো, ওয়াশিংটন অথবা ব্রাসেলসের সাদা চামড়ার লোকদের পরিবেশ-বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তার নিজের দেশের লোকেদের ব্যাপারটা বোঝানো।
এই যে গাছের পর গাছ কাটা হচ্ছে, বছরের পর বছর খরা হচ্ছে, এই যে কুমিরেরা আর ডিম পাড়ছে না, ব্যাঙ আর বানর সাপ হয়ে যাচ্ছে, ধানখেতে পোকামাকড় নেই, এসবের কারণ ও ফলাফল, অনিবার্য মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে সকলকে সচেতন করার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিলেন উমাকুমার। তিনি ঠিক করলেন পাকাপাকিভাবে কলকাতায় এসে বাস করবেন আর গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-শহরে পরিবেশ নিয়ে বক্তৃতা করে এই হতভাগ্য দেশের মানুষদের পরিবেশপরায়ণ করে তুলবেন।
এন-আর-আই জীবনে রীতিমতো ঘেন্না ধরে গিয়েছিল উমাকুমারের। কিন্তু একটা অসুবিধে হয়েছে এই আঠারো বছর প্রায় এক নাগাড়ে বিদেশে থেকে, নানারকম খারাপ-ভাল অভ্যেস তৈরি হয়েছে তার। এখন গরম একদম সহ্য হয় না, মশা কামড়ালে চিৎকার করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করে, সরষেবাটা সজনেড়াটা চচ্চড়ি চিবোতে বিরক্ত লাগে। রসগোল্লার রস হাতে লেগে থাকলে হাত চটপট করে।
এসব অসুবিধার কথা খুব একটা তোয়াক্কা না করে থিয়েটার রোডের পাশের একটা গলিতে এক বহুতল বাড়িতে একটা ভাল ফ্ল্যাট কিনে ফেললেন উমাকুমার। এয়ার কন্ডিশনার ইনভার্টার ইত্যাদি লাগিয়ে যতটা আরামদায়ক করা যায় বাসস্থান তা করলেন। টাকার অভাব নেই তার। বিদেশ ছেড়ে চলে আসার সময় ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ছোট বাড়ি আর লাখখানেক ডলারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছাড়া আর যা কিছু ছিল তার খানিকটা বেচে, কিছুটা দান করে বা উপহার দিয়েই সেই সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ নগদ টাকাপয়সা এবং তার নিজস্ব কিছু মার্কিনি গ্যাজেট, ফ্রিজ ইত্যাদি নিয়ে তিনি কলকাতায় চলে এলেন।
শুল্ক বিভাগের সঙ্গে প্রভূত লড়াই করে এবং বহু টাকা ডিউটি দিয়ে এসব দামি সাহেবি জিনিস বহুকষ্টে উদ্ধারও করলেন। এতে লাভক্ষতি যাই হোক, তিনি একসঙ্গে অনাবাসী বিলাস এবং আবাসী আনন্দ অর্জন করতে সমর্থ হলেন।
এসব তেমন কঠিন কঠিন ব্যাপার নয় শেষ পর্যন্ত। একটু লেগে থাকলে হয়ে যায়। সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হল সেটা, যে-উদ্দেশ্যে তিনি এদেশে ফিরে এসেছেন। উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট, বক্তৃতা করা।
নির্দিষ্টভাবে বলা যায়, পরিবেশ সম্পর্কে বক্তৃতা করা। কিন্তু ডক্টর উমাকুমার খেয়াল করেননি যে তাঁর মাতৃভূমিতে আর যা কিছুর অভাব থাক বক্তার কোনও অভাব নেই।
যেকোনও বিষয়ে যেকোনও স্থানে যেকোনও সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনর্গল বলে যেতে পারে, এমন ব্যক্তির সংখ্যা এদেশে অগুন্তি। দেখে বোঝার উপায় নেই, সভামঞ্চের একপ্রান্তে নড়বড়ে। ফোলডিং চেয়ারে যে-বুড়ো আগাগোড়া ঝিমোচ্ছেন, সভাপতি তাঁর নাম ডাকামাত্র তিনি তোক করে লাফিয়ে উঠে অনায়াসে আড়াই ঘণ্টা বলে যেতে পারেন। আলোচ্য বিষয়ের মূলে না গিয়েও এই রকম মহতি সভায় বক্তৃতা করার সুযোগ পেয়ে এই বৃদ্ধ যে ধন্য হয়েছেন এবং তিনি শ্রোতাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না এবং পূর্ববর্তী বক্তারা যা কিছু বলার সবই বলে দিয়েছেন, এই তিনটি পয়েন্টে তিনি একঘণ্টা করে তিন ঘণ্টা বলতে পারেন, শুধু তার অসুস্থ শরীর বলে আধঘণ্টা কমিয়ে আড়াই ঘণ্টা বলেন।
সে যা হোক, উমাকুমারবাবুর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধীরে ধীরে যোগাযোগ হতে লাগল। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সমিতি আছে যেগুলির শাখা বিভিন্ন জায়গায় ছোটবড় শহরে ছড়িয়ে আছে। এদের সভ্যবৃন্দ সপ্তাহে সপ্তাহে গুরুগম্ভীর সভা করে জ্ঞানীগুণীদের বক্তৃতা শুনতে ভালবাসেন। ক্রমশ চেনাজানা এর-ওর মাধ্যমে উমাকুমার এই জাতীয় দু-একটি সমিতিতে ভিড়ে গেলেন। দু-এক জায়গায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগও জুটে গেল।
