এন-আর-আই-এর সংজ্ঞা সংক্রান্ত আইনের ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে সরাসরি সোজা করে বলা চলে যে, মোটামুটি এন-আর-আই-রা হলেন সফল প্রবাসী ভারতীয়, এঁরা আর্থিকভাবে অত্যন্ত সচ্ছল, এঁদের অনেকেই বিদ্যায়-কীর্তিতে বিদেশে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন।
ডক্টর উমাকুমার চক্রবর্তীও তাই।
আমরা এই সামান্য কথিকায় প্রথমে তার পূর্ব জীবন যথাসম্ভব সংক্ষিপ্তাকারে স্মরণ করে নিচ্ছি।
উমাকুমারবাবু পুর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তু। তাদের পূর্বনিবাস বরিশাল জেলায়। এখন তার বয়েস সাতচল্লিশ। উনিশশো পঞ্চাশ সালে, সেই ভয়াবহ দাঙ্গার বছরে, বরিশাল শহরের কয়েক মাইল দূরে তাদের গ্রামের বাড়ি পুড়ে ছারখার হয় এবং তার দুই কাকা দাঙ্গাকারীদের হাতে নিহত হন।
উমাকুমারবাবুর বাবা থাকতেন কলকাতায় একটা মেসে, কাজ করতেন সেকালের ক্লাইভ স্ট্রিটের একটা সওদাগরি অফিসে। ঠিক এই সময়েই পরাজিত ক্লাইভ সাহেব ওই ঘিঞ্জি রাস্তাটা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসকে ছেড়ে দিয়ে পাশের গলিতে আশ্রয় নেন।
সে যা হোক উমাকুমারবাবুরা দাঙ্গার পরে সর্বস্বান্ত হয়ে যখন কলকাতায় এসে পৌঁছালেন, তাঁর বাবা মেস ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণ কলকাতার শেষ সীমান্তে একটি নবগঠিত উদ্বাস্তু কলোনিতে কোনওরকমে একটা টিনের ঘর তৈরি করে নতুন জীবন শুরু করলেন।
উমাকুমারবাবুর পিতামহের বয়েস তখন প্রায় সত্তর। তবে তিনি বেশ শক্ত-সমর্থ ছিলেন। তিনি গ্রামে মাস্টারি করেননি, তবে নাতি-নাতনিদের খুব যত্ন করে পড়াতেন।
অল্প দিনের মধ্যেই উদ্বাস্তু কলোনির ভিতরে একটি স্কুল গড়ে ওঠে এবং সেখানে উমাকুমারবাবু ভরতি হন।
বলা বাহুল্য উমাকুমারবাবু মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং সেই সঙ্গে ছিল তাঁর পিতামহের সুনজর। শুধু ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষাগুলিতে তিনি ভাল করলেন তাই নয়, বিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষায় স্কুল ফাঁইন্যালে তার বছরে তিনি পঞ্চম স্থান অধিকার করলেন। একটি অখ্যাত উদ্বাস্তু পল্লির নগণ্য একটি নতুন স্কুলের নাম তার দৌলতে খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বেরোল।
এসব তথ্য অবশ্য আমাদের এই গল্পের পক্ষে মোটেই জরুরি নয়, বিশেষত হালকা গল্পে এসব তথ্য না দেওয়াই রীতি। কিন্তু এই আখ্যান পাঠান্তে কেউ যেন উমাকুমারবাবুকে হাসির পাত্র মনে না করেন, শুধু সেই জন্যে এতক্ষণ কিছু বাস্তব তথ্য জানানো হল।
এর পরের ইতিহাস একটু সংক্ষেপ করেই বলছি। উমাকুমারবাবু সসম্মানে এবং উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের সঙ্গে কলেজ ও ইউনিভার্সিটির স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষাগুলি উত্তীর্ণ হলেন। তার অধীত বিষয় ছিল উদ্ভিদবিদ্যা। উদ্ভিদবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষার জন্যে তিনি অবশেষে আমেরিকায় পৌঁছালেন।
কিছুদিনের মধ্যেই কয়েকটি ভারী ডিগ্রি অর্জন করে তিনি ওদেশেই অধ্যাপনা শুরু করলেন এবং এই পেশায় প্রচুর খ্যাতি ও অর্থ উপার্জন করলেন। উমাকুমারবাবু নিজে একজন শিক্ষকের পৌত্র, তিনি এর আগে কখনওই কল্পনা করতে পারেননি যে শিক্ষকতা করে এত অর্থ উপার্জন করা সম্ভব।
বছরের পর বছর দুহাতে লক্ষ লক্ষ ডলার উপার্জন করলেন ডক্টর উমাকুমার চক্রবর্তী। উদ্ভিদবিদ্যার উপান্তে পৌঁছে তার বিষয় হল পরিবেশ বিজ্ঞান। এই পরিবেশের ব্যাপারটা আজকের আধুনিক সভ্য পৃথিবী খুব খাচ্ছে, শুধু খাচ্ছে নয়, বলা চলে গোগ্রাসে গিলছে। উত্তর ক্যারোলিনের ফাঁচাচাও গাছের ফুল ফিকে হলুদ থেকে গাঢ় হলুদ হয়ে যাওয়ায় নিখিল বিশ্বের জীবজগৎ যে গভীর সংকটজনক অবস্থায় পড়ছে কিংবা নিম্নবাংলার বদ্বীপে সুন্দরবনের মোহনায় সুন্দরীগাছের পাতাগুলি যদি শীতের শুরুতে অন্তত একবার ঝরে যায় তাতে কুমিরের ডিম থেকে বাঘের বাচ্চা, এমনকী শেষ পর্যন্ত মানুষের শিশু কতটা লাভবান হবে, এসব বিষয়ে ডক্টর চক্রবর্তীর সাবলীল বিশ্লেষণে যেকোনও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিও সব কিছু প্রাঞ্জল বুঝতে পারে।
খ্যাতি ও সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন দেশের নিয়মানুযায়ী ডক্টর চক্রবর্তীর নামটা ছোট হতে লাগল। প্রথমে অত কষ্টের ডক্টর ডিগ্রি বিসর্জন দিতে হল, তারপরে গেল তার কৌমার্য, অর্থাৎ নামের মধ্যপদ, তারপরে আরও ছোট হয়ে তিনি উমা চাকর হয়ে গেলেন। অবশ্য কোনও কোনও ভদ্রজন তাকে উমা চাকর না বলে ডক্টর চাকরও বলতে শুরু করলেন।
কিছুই আপত্তি করেননি আমাদের উমাকুমারবাবু। আপত্তির সময় নয় সেটা। সাফল্যের সোপান ধরে দ্রুত উঠতে উঠতে তিনি সম্মান ও অর্থের সঙ্গে এ সমস্তই নিতান্ত ন্যায্য পাওনা বলে ধরে লাগলেন, তিনি মোটেই কিছু মনে করলেন না।
আটাশ বছর বয়েসে বিদেশে গিয়েছিলেন উমাকুমার। প্রথমবার বছর পাঁচেক পরে দেশে ফিরতে পেরেছিলেন তিনি। এর পরের বার ব্যবধান হল প্রায় আট বছরের। ততদিনে দেশের প্রতি আকর্ষণ কমে গেছে। বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। ঠাকুরদা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। উদ্বাস্তু কলোনির সেই বাড়িও বেহাত হয়ে গিয়েছিল স্বাভাবিক নিয়মেই।
উমাকুমারের ব্যস্ত জীবনে বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। দেশে থাকতে বিয়ে করার সচ্ছলতা আসেনি। বিদেশে সে সুযোগ আসেনি। তবে তার ব্যস্ত সফল জীবনে নারী-সান্নিধ্যের তেমন অভাব ঘটেনি। ছাত্রী, সহকর্মিণী, বান্ধবী, বন্ধুপত্নী অধিকাংশই মেমসাহেব, ভারতীয় বা বাঙালিও কেউ কেউ ছিল।
