এ ছাড়া বাকি ছয়-সাতজন তারা সবাই ধান্দায় ঘুরছে। অধিকাংশই বিশ্বাসযোগ্য নয়, কিন্তু কাউকে বলা যাবে না। কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্বও দেওয়া যাবে না। এদিকে মাঝেমধ্যেই ইনকিলাব জিন্দাবাদ করতে করতে সরকারি হারে মহার্ঘভাতা দাবি করে চেঁচায়। কোম্পানির টাকা কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে এরা যদি একটুও ভাবত।
ভাবতে হয় তারিণীবাবুকেই। তাই আজকাল তিনি নিজেই বিলের তাগাদায় যান। বিভিন্ন সরকারি অফিসে ঘোরেন।
সম্প্রতি সরকারি অফিসগুলিতে তাড়াতাড়ি কাজ হওয়ার একটা চেষ্টা চলেছে। কিন্তু বিল পেমেন্টের ক্ষেত্রে তাতে কোনও লাভ নেই। বিল পাশ হলে কী হবে, সরকারের ঘরে অর্থ না থাকলে বিলের টাকা আসবে কোথা থেকে।
আজকাল বিভিন্ন অফিসে একটা নতুন জিনিস দেখতে পাচ্ছেন তারিণীবাবু। খুব পছন্দ হয়েছে তাঁর।
জিনিসটা একটা বিজ্ঞপ্তি। বড় বড় হরফে হিন্দি, বাংলা, ইংরেজি এবং উর্দুতে লেখা
আর দেরি নয়, এখনই।
যার যা করবার আছে
এখনই করে ফেলুন।
পোস্টারের মতো মুদ্রিত এই বিজ্ঞপ্তিগুলি একটা অফিসের দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় সেই অফিসের দুজন পিয়ন আঠা দিয়ে লাগাচ্ছিল। তাদের কাছে চাইতে তারা সানন্দে একটা পোস্টার তারিণীবাবুকে দিয়ে দিল।
পরের দিন সকাল সকাল অফিসে গিয়ে ভেতরের দিকে একটা দেয়ালে এই পোস্টারটি স্বহস্তে তারিণীবাবু লাগালেন। অফিসে এসে সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল।
তারিণীবাবু সবাইকে ঘুরে ঘুরে বললেন, বিজ্ঞপ্তিটা খেয়াল রাখবেন। হাতের কাজ মোটেই ফেলে রাখবেন না। যার যা কাজ এখনই করে ফেলুন। এখনই।
.
তারিণী কল্পনাও করতে পারেননি, এই বিজ্ঞপ্তির পরিণাম কী ভয়াবহ হতে পারে।
তাঁর খাস আর্দালি রামলাল বছর খানেক হল দু মাসের ছুটি চাইছিল দেশে যাওয়ার জন্যে। ওই বিজ্ঞপ্তি দেখার সঙ্গে সঙ্গে সে, অন্যান্যবারের মতো তারিণীবাবু যাতে বাধা দিতে না পারেন তাই কোনও রকম ঝুঁকি না নিয়ে টেবিলে একটি ছুটির দরখাস্ত রেখে দেশে রওনা হয়ে গেল।
এর অল্প পরেই আর একটা দরখাস্ত এল, তাতে যুগ্ম স্বাক্ষর স্বর্ণেন্দু এবং তহমিনার। দরখাস্তে লেখা আছে।
শ্রদ্ধেয় স্যার,
আর দেরি নয়, এখনই। বিজ্ঞপ্তি পাঠ করে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা এত দিন যা নিয়ে ইতস্তত করছিলাম সেই বিয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের কাছে যাচ্ছি। বিয়ে, হনিমুন ইত্যাদি বাবদ আমরা কেউ মাস দেড়েক অফিসে আসতে পারব না।
ছুটি ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করি,
তহমিনা এবং স্বর্ণেন্দু।
.
এর পরে আরও সব দরখাস্ত। বিজ্ঞপ্তি পাঠ করে সবাই উজ্জীবিত হয়েছে যা করার আছে এখনই করে ফেলার জন্য। সবচেয়ে ভয়ানক চিঠি ক্যাশিয়ারবাবুর। সেই যে কাগজের টুকরোগুলোর কী সব খুচখাচ হিসেব রাখতেন, সেইসব হিসেব আলপিন দিয়ে গেঁথে সঙ্গে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন।
কোম্পানির ক্যাশখাত অনুযায়ী নগদ যে এক লক্ষ দশ হাজার টাকা থাকার কথা তাহার মধ্যে বেয়াল্লিশ হাজার টাকা আমি ইতিমধ্যে তছরুপ করেছি, হিসাব সঙ্গের স্লিপগুলিতে আছে। বাকি আটষট্টি হাজার টাকা সঙ্গে নিয়ে গেলাম। আমাকে খুঁজিবার চেষ্টা করিবেন না।
দুপুরের মধ্যে অফিস প্রায় ফাঁকা। যে চার-পাঁচজন ছিল তারা একজোট হয়ে তারিণীবাবুকে ঘেরাও দিল, সরকারি হারে মহার্ঘভাতা দিতে হবে, দিতেই হবে। আজ থেকেই দিতে হবে। তারা তারিণীবাবুকে দিয়ে কবুল করিয়ে অবশেষে সন্ধ্যা ছয়টার পরে গেল।
ঘেরাও থাকা অবস্থায় চুপচাপ বসে বসে তারিণীবাবু নিজেও কী করবেন স্থির করে ফেলেন।
আজ এখনই করতে হবে, আর দেরি নয়।
কাজটি সাংঘাতিক। অগ্নিসংযোগ। আজ পঁচিশ বছর ধরে বছরে বছরে দশ হাজার টাকা করে ফায়ার ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম দিয়ে আসছেন। কখনও এক পয়সা উসুল হয়নি। এবার সুযোগ এসেছে, অফিস পুড়ে গেলে অগ্নিবিমাবাবদ লাখ পনেরো টাকা পাওয়া যাবে।
যেমন চিন্তা, তেমন কাজ। অফিসের প্যাসেজে, চা করার সাজসরঞ্জাম, জনতা স্টোভ, কয়েক বোতল কেরোসিন তেল আছে। এক বোতল তেল নিয়ে দেয়ালে যেখানে আর দেরি নয়, পোস্টারটি সেঁটেছিলেন সেখানেই প্রথমে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন লাগাতে যান। দুঃখের বিষয়, পাশের গঙ্গা কেমিক্যালস কোম্পানির দারোয়ান ব্যাপারটা দেখে ফেলে।
তারপর হইচই পুলিশ ইত্যাদি। তবে পুলিশ জেরা করার পরেও ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি তারিণীবাবু ইন্সিওরেন্সের টাকার জন্যে আগুন লাগাচ্ছিলেন। পুলিশ ভেবেছে, এটা বাণিজ্যে অসফল বৃদ্ধের পাগলামি।
.
তারিণীবাবুর কাহিনি শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে গেছে। ঝিমলি গিয়ে বিকেলের চা করে নিয়ে এল।
চা খেয়ে ধীরে ধীরে সুদর্শন সেন বাড়ির দিকে ফিরলেন। তাঁর জীবনে এই প্রথম একটা সংবাদ যার চার দিকই তিনি দেখতে পেয়েছেন।
এন-আর-আই
ডক্টর উমাকুমার চক্রবর্তী একজন এন-আর-আই, অর্থাৎ নন রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান, অর্থাৎ অনাবাসী ভারতীয়। এন-আর-আই এই শব্দটির সঙ্গে এখন অনেকেই রীতিমতো পরিচিত। অনেক সৌভাগ্যবানের নিকট-আত্মীয় বা বন্ধুই হয়তো এন-আর-আই। তবু কেউ যাতে নন রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ানকে রেড ইন্ডিয়ান বা ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান জাতীয় কিছু না ভাবেন, তাই প্রথমেই বলে রাখা ভাল এঁরা আমাদের মতো, আমাদেরই লোক। শুধু আমরা দেশে আছি, এঁরা বিদেশে আছেন।
