এই কথা শুনে পুলিশের ভদ্রলোক নিজের বুকের একটা ব্যাজের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, দেখতে পাচ্ছেন না, জনসংযোগ সপ্তাহ চলছে? ভদ্রলোক রাগে গরগর করতে করতে চলে গেলেন।
এদিকে তারিণীবাবুর ভয়াবহ বিধ্বস্ত অবস্থা। তাঁর এই সাতাত্তর বছর বয়সে জীবনের প্রথম হাজতবাস সে খুব সামান্য ব্যাপার নয়। মারধর না করুক, সারা রাত অভুক্ত অবস্থায় মেঝেতে বসে, এক পাল চোর-গুণ্ডার সঙ্গে বেশ তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে।
একটু বসে ধাতস্থ হয়ে বাথরুমে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে স্নান করে এলেন তারিণীবাবু। রমা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এরই মধ্যে আলু আর লুচি ভেজে ফেলেছে। তারিণীবাবু বাইরের ঘরে আসতে তাঁর সঙ্গে জলখাবার খেতে খেতে সুদর্শনবাবু সঙ্গে আনা খবরের কাগজ তিনটে তারিণীবাবুকে দেখিয়ে বললেন, আপনার কীর্তিকলাপ সবই এইসব কাগজে প্রকাশিত হয়েছে।
তারিণীবাবু ওই সংবাদ শুনে বিশেষ বিচলিত হলেন বলে মনে হল না। শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, নাম-ধাম কিছু দিয়েছে নাকি?
সুদর্শনবাবু বললেন, না তা নয়? কিন্তু আসল ব্যাপারটা কী?
সুদর্শনবাবুর প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে তারিণীবাবু আবার প্রশ্ন করলেন, তোমরা জানলে কী করে?
সুদর্শনবাবু বললেন, আমাকে রমা জানিয়েছে। রমাকে জানিয়েছে বোধহয়…।
কথা শেষ হওয়ার আগে রমা বলল, আমাকে তো কেউ কিছু কাল বলেনি। হাসপাতালে ফোন করেছি। লালবাজারে ফোন করেছি। অবশেষে আজ সকালে খবর পেলাম তোমাকে পুলিশ ধরেছে।
পুলিশ ধরেছিল। তা ছেড়েও তো দিয়েছে। খুব জব্দ করা গেছে পুলিশকে।তারিণীবাবু হাসতে হাসতে বললেন।
মূল ঘটনাটা কী সেটা জানার জন্যে খুবই কৌতূহলী হয়ে পড়লেন সুদর্শন। কিন্তু কতক্ষণ অপেক্ষা করা যায়? চট করে কোনও কিছু তারিণীবাবু কবুল করবেন বলে মনে হচ্ছে না।
অবশ্য একটা সুবিধে হয়ে গেল, অন্য ভাবে।
একটু আগে ঝিমলি বাজারের থলে হাতে বেরিয়ে গিয়েছিল। বাজার থেকে ফিরে রান্নাঘরে বাজারটা নামিয়ে দিয়ে এসে সে বলল, দেড়তলার মামা, তুমি দুপুরে এখান থেকে খেয়ে যাবে। তারপর লোভ দেখাল, চিতলমাছের পেটি এনেছি। বড় বড় পেটি। দাদুর ফিরে আসা সেলিব্রেট করতে হবে।
.
দাদুর ফিরে আসা ভালই সেলিব্রেট করা হল।
রমা ভাল রান্না করে, একেবারে ওর মায়ের মতো। প্রথম যৌবনে প্রবাসের দিনে রমার মায়ের রান্না কারণে-অকারণে কতবার যে খেয়েছেন সুদর্শন। সেসব স্বাদ এখনও জিভে লেগে আছে।
আজ রমার রান্না মটরের ডাল ছড়ানো আদাবাটা মাখা লাউয়ের তরকারি, কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা টমাটো দিয়ে মাখো মাখো রাঙা আলু আর রাঙা কুমডোর যুগলবন্দি, হালকা সরষেবাটা দিয়ে চিতল মাছের ঝোল আর সব শেষে গুড়, লঙ্কা, গন্ধরাজ লেবুর রস আর খোসা ছাড়ানো সেদ্ধ কাঁচা তেঁতুলের অম্লমধুর স্বাদ, পুরো মধ্যাহ্নভোজন ব্যাপারটা অনির্বচনীয় করে তুলেছিল।
এই সুখাদ্যের জন্যেই হয়তো, তারিণীবাবু শেষ পাতে তেঁতুলের চাটনি চাটতে চাটতে সব কথা বলে ফেললেন।
সেসব কথা গুছিয়ে বলা যাবে না। সময়াভাব, স্থানাভাব আছে।
তা ছাড়া সব সময় সব কথা বলারও কোনও প্রয়োজন নেই।
এই কাহিনির জন্যে যেটুকু প্রয়োজন শুধুমাত্র সেটুকু বললেই যথেষ্ট।
আর দেরি নয়, এখনই
আজ কিছুদিন হল তারিণীবাবুর ভারত সাপ্লায়ার্স কোম্পানির ব্যবসা ভাল চলছে না। এ জাতীয় সব ব্যবসারই এখন খারাপ অবস্থা।
ভারত সাপ্লায়ার্সের শতকরা নব্বই ভাগ কাজ সরকারি অফিসগুলির সঙ্গে।
আজ কয়েক বছর হল সরকারি অফিসগুলো থেকে বিলের পেমেন্ট পেতে খুব দেরি হচ্ছে। আগে সারা বছরের বিলের পেমেন্ট আর্থিক বছরের শেষে একত্রিশে মার্চের মধ্যে পাওয়া যেত। তারপরে আগের বছরের বিলের পেমেন্ট পরের বছরের মার্চ মাসে পাওয়া যেত।
আজকাল আর সেসব ব্যাপার নেই। কোন বিলের টাকা কবে পাওয়া যাবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
আগে যেমন এ বছরের বিল এ বছরেই পাওয়া যেত। না হলে, বড়জোর সামনের বছরে। কিন্তু আজকাল পাঁচ-সাত বছরেও বিল পাশ হয় না। তারিণীবাবুর হিসেব এরকম, তিনি এখনও চুরানব্বই-পঁচানব্বই সালের বিলের পেমেন্ট পাননি। কবে পাবেন জানেন না।
তার মানে সারা বছরের পেমেন্ট বাকি। ভারত সাপ্লায়ার্সের মাত্র দশ বারো জন কর্মচারির মাইনের টাকা সংগ্রহ করতেই তারিণীবাবু হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন। দুয়েকটা বেসরকারি সংস্থার কাজ হাতে আছে, খোলা বাজারের কেনাকাটায় কিছু কমিশন থাকছে। কোনও রকমে চালিয়ে যাচ্ছিলেন তারিণীবাবু, কিন্তু তাঁরও সাপ্লায়ার্স বোধহয় আর জোড়াতালি দিয়ে চলবে না।
তারিণীবাবুর অফিসের ম্যানেজার স্বর্ণেন্দু নামে এক বি.কম পাশ যুবক। বেশ চটপটে এবং কাজের ছিল ছেলেটা, কিন্তু সরকারি অফিসের বিল আদায়ে মোটেই সুবিধে করতে পারছে না। তা ছাড়া আজ কয়েক মাস হল তহমিনা নামে একটি লাজুক মেয়েকে এমপ্লয়মেন্ট টাইপিস্ট পদে নিযুক্ত করেছেন।
সারাদিন এই তহমিনার সঙ্গে স্বর্ণেন্দুর কী সব গুজগুজ, ফুসফুস। তার আর কোনও কাজেই মন নেই। তাকে দিয়ে বিল আদায়ের কাজ অসম্ভব।
জগন্ময়বাবু আছেন পুরনো ক্যাশিয়ার। আগে তিনিও প্রয়োজনে বিলের তাগাদা দিতে যেতেন। কিন্তু কোমরে বাত হওয়ায় আজকাল আর বিশেষ হাঁটাহাঁটি করতে পারেন না। কোনও রকমে অফিসে এসে বসে থাকেন, আর সদাসর্বদা ছোট ছোট স্লিপে কী সব হিসেব করেন।
