এ ছাড়া নববর্ষ, বিজয়া দশমী, উৎসবে-অনুষ্ঠানে তারিণীবাবুর বাড়িতে অবারিত দ্বার সুদর্শনের।
তিরিশ পঁয়তিরিশ বছর কম সময় নয়। রমা বড় হল। রমার বিয়ে হল। তারিণীবাবুর স্ত্রীকে, যদিও বয়সের তেমন ব্যবধান ছিল না, সুদর্শন অন্যান্য ভাড়াটের দেখাদেখি মাসিমা বলতেন। সেই মাসির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে রমার বিয়ের বাজার করলেন। এমনকী রমার বিয়েতে সাত পাকের সময় পিড়ি পর্যন্ত ধরেছিলেন।
সেই রমা বিয়ে হয়ে দিল্লি চলে গেল। পরে একদিন বিধবা হয়ে শিশুকন্যা ঝিমলিকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে এল। ঝিমলি একেবারে ছোটবেলার রমার মতো দেখতে, তারও একই দোষ, সেও সুদর্শনের খুব ন্যাওটা। কবে সুদর্শন তারিণীবাবুর বাড়ির দেড়তলায় থাকতেন সেই সূত্রে রমা তাঁকে দেড়তলার দাদা বলত, এখন রমার মেয়ে ঝিমলি তাঁকে দেড়তলার মামা বলে।
.
এতক্ষণ এ গল্পের আশেপাশের চরিত্র ইত্যাদি নিয়ে অনেক কিছু বলা হল কিন্তু এই গল্প যাঁর জন্যে, এই গল্পের যিনি মূল ও মুখ্য চরিত্র সেই তারিণীবাবু সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলা হয়নি।
এ কাহিনিতে তারিণীবাবুর পদবি বা উপাধি অপ্রয়োজনীয়। অশীতিপর সুস্থ, সচল, কর্মময় বাঙালি একালে বিরল। সেদিক থেকে তারিণীবাবু উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
মানিকতলার মোড়ের কাছে একটা ছোট বাড়ি আর বউবাজারের কালীবাড়ির পশ্চিমে একটা দুশো বছরের পুরনো গলিতে ভাঙা তিনতলা বাড়ির পুরো একতলা জুড়ে, তারিণীবাবুর পৈতৃক ব্যবসায় ভারত স্টেশনার্স অ্যান্ড সাপ্লায়ার্স।
চিরকাল অবশ্য এ নাম ছিল না, প্রথমে নাম ছিল, ইম্পিরিয়াল স্টেশনার্স। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নাম হয় ভিক্টরি সাপ্লায়ার্স। পরে চল্লিশের দশকে মুসলিম লিগের আমলে নাম পালটিয়ে করা হয়, মুন অ্যান্ড স্টার স্টেশনার্স অ্যান্ড সাপ্লায়ার্স। তবে গত পঞ্চাশ বছর ধরে ভারত স্টেশনার্স অ্যান্ড সাপ্লায়ার্স নামটি চলছে।
মধ্য কলকাতায় বিবাদী বাগের কাছাকাছি অঞ্চলে ওই রকম কোম্পানি অনেক আছে। এগুলি অধিকাংশই বাঙালি মধ্যবিত্তের পুরনো ব্যবসা। এদের কাজ হল বিভিন্ন সরকারি এবং সওদাগরি দপ্তরে অফিসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কলম পেনসিল, আলপিন থেকে আলমারি–যা কিছু একটি অফিসের প্রয়োজনে লাগে এইসব সরবরাহ করা। ছোটখাটো ছাপার কাজ, ফর্ম, মেমো, প্যাড, ভিজিটিং কার্ড, এমনকী বার্ষিক রিপোর্ট পর্যন্ত এইসব কোম্পানির মাধ্যমে মুদ্রিত হয়।
সাদা বাংলায় এর নাম সাপ্লাইয়ের ব্যবসা। এঁরা বাজার থেকে জিনিস সংগ্রহ করে বিভিন্ন অফিসে তাদের চাহিদামতো সরবরাহ করেন। কেনাবেচার মধ্যে যে ফারাক থাকে সেইটাই লাভ।
.
আজ সকালে হঠাৎ বিপর্যস্ত এবং উত্তেজিত অবস্থায় ঝিমলিকে বাড়িতে আসতে দেখে সুদর্শনবাবু বুঝলেন নিশ্চয়ই কিছু একটা বড় রকমের গোলমাল হয়েছে তারিণীবাবুর বাড়িতে।
সোফায় বসিয়ে ভেতরের ঘর থেকে এক গেলাস জল এনে ঝিমলির হাতে দিয়ে বললেন, আগে জল খেয়ে নে। তারপর কী হয়েছে শুনছি।
গলা-পিঠ আর মুখের ঘাম রুমাল দিয়ে আলগোছে মুছে নিয়ে ঝিমলি বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে, দেড়তলার মামা। মা আমাকে তোমার কাছে পাঠাল।
মুখোমুখি বসে ঝিমলির মুখের দিকে তাকিয়ে সুদর্শনবাবুর অনেকদিন আগের সব কথা মনে পড়ল। ঝিমলির মা রমা এই বয়সে ঠিক এই রকমই দেখতে ছিল। এই বয়সেই রমার সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথা উঠেছিল।
হাতের গেলাসের জলটা কিন্তু খেল না ঝিমলি। একটু বসেই উঠে পড়ল, সুদর্শনবাবুর হাত ধরে টানল। বলল, দেরি করা যাবে না। আমাদের খুব বিপদ। তুমি আমার সঙ্গে চলো। মা কী করবে বুঝতে পারছে না।
কী হয়েছে? কী করবে? আমিও তো কিছু বুঝতে পারছি না। ব্যাপারটা কী আগে বল তো?
ঝিমলি বলল, সাংঘাতিক ব্যাপার। দাদুকে কাল পুলিশ ধরেছে।
অবাক হয়ে সুদর্শনবাবু বললেন, তারিণীবাবুকে পুলিশে ধরেছে? কেন?
আমরা তা জানি না, ঝিমলি বলল, তবে থানা থেকে খবর দিয়েছে, দাদু নাকি অফিসঘরে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। সেই সময় তাঁকে লোকজনেরা ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
ঝিমলির কথা শুনে সুদর্শনবাবুর আজ একটু আগে পড়া অগ্নিসংযোগের সংবাদগুলি মনে পড়ল। তাড়াতাড়ি জামাকাপড় বদলিয়ে, খবরের কাগজ তিনটে হাতে নিয়ে তিনি ঝিমলির সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন।
শেষ কথা
অধ্যাপক সুদর্শন সেনের বর্তমান বাসা থেকে তাঁর প্রাক্তন বাসা, ঝিমলির মাতামহ তারিণীবাবুর বাড়ি খুব দূরে নয়। ট্যাক্সিতে বড়জোর মিনিট দশেক লাগে।
ট্যাক্সি থেকে নামামাত্র ঝিমলি দৌড়ে গিয়ে মাকে খবর দিল যে, দেড়তলার মামা এসেছে।
রমা বোধহয় এতক্ষণ নীরবে চিন্তা করছিল। এবার অধ্যাপক সেনের আগমনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ ধরে হাউমাউ করার সুযোগ মেলেনি।
সুদর্শনবাবুরা আসবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ট্যাক্সির পিছনে একটি পুলিশভ্যান থামে। তার মধ্য থেকে তারিণীবাবুকে সঙ্গে করে একজন পুলিশ কর্মচারী নামেন। তিনি বাইরের ঘরে ঢুকে রমার কাছে তারিণীবাবুকে সমর্পণ করে বললেন, বুড়ো কর্তার মাথার গোলমাল হয়েছে। না হলে কেউ নিজের অফিসে আগুন লাগাতে যায়।
ভদ্রলোক চলে যাচ্ছিলেন, অধ্যাপক সেন একটু বিচলিত কণ্ঠে বললেন, বহু ধন্যবাদ। কিন্তু কোনও দিন কোথাও এর আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না যে, থানা থেকে মুক্ত আসামিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
