সেদিনের সেই ছাত্র এখন দারোগা। তিনি এখন নিজের চেয়ারে বসে টেবিলের পাশে দাঁড়ানো এক ছিঁচকে চোরের হাত-পায়ের গিটে গিটে রুলার দিয়ে মারছিলেন। থানায় মারধর নিষেধ। একধরনের আসামিদের বলা থাকে, চেঁচাবি না। যদি বাইরে কেউ টের পায় থানার পিছনের গ্যারেজে নিয়ে ডাণ্ডা-ধোলাই দেব। তাই প্রহৃত আসামিটি বিনা বাক্যব্যয়ে নীরবে অশ্রুবিসর্জন করছিল।
এই সময়ে সুদর্শনবাবুকে নিয়ে গোয়েন্দাদের থানায় প্রবেশ। সেই চড়ুইয়ের বাসায় ডিম তুলে দেয়া লম্বা ছাত্রটি এখন দারোগা। তিনি এখন আসামিকে কেঁচকি দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। পিঠের নীচে যেখানে মেরুদণ্ডের শুরু, উত্তমাঙ্গ এবং অধমাঙ্গ শরীরের এই দুই অংশের সীমানা, সেখানে দক্ষ হাতে পেটালে যথাসময়ে প্রহৃত ব্যক্তির হেঁচকি উঠতে থাকে, এই হেঁচকি অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা থাকে। হেঁচকি তোলার এই মারকেই বলে কেঁচকি।
সুদর্শন স্যারকে দেখে কেঁচকি মার মুলতুবি রেখে তাড়াতাড়ি দারোগাবাবু এগিয়ে এলেন, স্যার, আপনি এখানে?
.
তিনটি কাগজের তিন রকম খবর পাশাপাশি বিশ্লেষণ করতে করতে আজ সুদর্শনবাবু পরিষ্কার বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা বেশ জটিল। যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তা হল, এক বৃদ্ধ স্বহস্তে নিজের অফিসে অগ্নিসংযোগ করতে গিয়ে আনাড়ির মতো ধরা পড়ে গিয়েছেন।
কিন্তু কেন তিনি এরকম করলেন? সুদর্শনবাবু ঠিক করলেন, ঘটনাস্থলে যাবেন। কী দুঃখে, কতটা দুঃখে সেই বৃদ্ধ নিজের অফিসে আগুন লাগাতে পারেন–সুদর্শনের সমবেদনাপূর্ণ বিশ্লেষণের জন্যে পরিপূর্ণ তথ্য প্রয়োজন। তিনি ঠিক করলেন, নিশ্চয় ঘটনাস্থলে যাবেন। কালকেই যাবেন।
এরপর একটু ভাবলেন। গেলে দেরি করা উচিত নয়। আজকেই যাওয়া উচিত। আবার ভাবছেন খোঁজখবর করতে গিয়ে আবার ঝামেলার মধ্যে না পড়েন। তিনি যে নিতান্তই মানবিক কৌতূহলবশত এধরনের খোঁজখবর নিচ্ছেন এ কথা সকলকে বোঝানো কঠিন।
ঠিক এই সময়ে সামনের দরজায় দ্রুত এবং ব্যস্ত করাঘাতে চিন্তায় ছেদ পড়ল অধ্যাপক সেনের। ধাক্কার চোটে দরজা ভেঙে যেতে পারে তাই তাড়াতাড়ি ছুটে গেলেন।
একতলার সামনের দিকের এই ঘরটা এ বাড়ির বাইরের ঘর। এখানেই অধ্যাপক সেন চা খান, খবরের কাগজ পড়েন, লেখাপড়া করেন। ছাত্র-ছাত্রীরা এলে তাদের সঙ্গে কথা বলেন, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দেন।
একতলা-দোতলার দু ঘর-দু ঘর ছোট চার ঘরের বাড়ি। রিটায়ার করার পর বাইরের ঘরটায় আশ্রয় নিয়েছেন সুদর্শনবাবু। শুধু স্নান-খাওয়া এবং শোয়ার জন্যে ভেতরে যান। ভেতরে গেলেই নানা ঝামেলা। এখুনি বাজারে যাও, ডাক্তার ডাক, না হলে ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে খবর দাও। এধরনের কাজ পছন্দ নয়, অবসরপ্রাপ্ত অকৃতদার অধ্যাপকের। ভ্রাতুস্পুত্রর সঙ্গে থাকেন। মাসের শেষে পেনশন থেকে চার হাজার টাকা ভ্রাতুস্পুত্রবধূর হাতে তুলে নিয়ে তিনি নিশ্চিন্তে বাইরের ঘরে অবসরজীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন। সাধারণত কেউ তাঁকে বিশেষ ঘাঁটায় না। তিনি নিরিবিলিতেই থাকেন।
তবে একটা কাজ তাঁকে করতেই হয়। সেটা হল এই বাইরের ঘরের দরজা খোলা আর বন্ধ করা। কেউ এ বাড়িতে আসতে গেলে বা এ বাড়ি থেকে যেতে গেলে এই একটা দরজাই ভরসা।
যাচ্ছি। যাচ্ছি। বলে চেঁচিয়ে বাইরে যে ধাক্কা দিচ্ছিল তাকে নিবৃত্ত করে সুদর্শন গিয়ে বাইরের ঘরের দরজা খুললেন। সঙ্গে সঙ্গে জিনসের প্যান্ট এবং লাল-নীল স্ট্রাইপ শার্ট পরিহিতা এক উদ্ভিন্নযৌবনা অষ্টাদশী দুই হাতে তার নরম শরীরের মধ্যে সুদর্শনকে জাপটিয়ে ধরে কাঁদতে লাগল, ও দেড়তলার মামা, দাদুকে যে পুলিশ নিয়ে গেছে।
দেড়তলার মামা
এই পর্বে প্রবেশের মুখে দেড়তলার মামা এবং আনুষঙ্গিক ব্যাপারগুলি পরিষ্কার করে না বললে পাঠক-পাঠিকার প্রতি অন্যায় করা হবে।
এই মাত্র প্রবীণ অধ্যাপককে দেড়তলার মামা সম্বোধন করে যে বিস্ৰস্তবসনা এই বাইরের ঘরে এবং কাহিনিতে প্রবেশ করল, তার নাম ঝিমলি, সেই ঝিমলির মাতামহের বাড়ির দেড়তলার ঘরে প্রথম জীবনে বেশ কয়েক বছর সুদর্শনবাবু ভাড়া ছিলেন। মফস্সল থেকে এম.এ. পাশ করে কলকাতায় এসে অধ্যাপনার কাজে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে দেড়তলার বড়সড় ঘরটিতে ডেরা বাঁধেন। অনেক পরে, সাত ঘাটের জল ঘেঁটে অবশেষে একসময় দোতলা বাড়িতে ঠাঁই জুটেছে।
তা, এই বাড়ির দোতলায় বাড়িওলা তারিণীবাবু থাকেন। দেড়তলা মানে মেজানিন ফ্লোরে সুদর্শনবাবু ছাড়াও একতলায় আরও দু-তিন ঘর ভাড়াটে ছিলেন। বাড়িটা মানিকতলা অঞ্চলে।
সুদর্শনবাবুর মনে আছে ও বাড়িতে কেউ তাঁকে নাম ধরে ডাকত না। তারিণীবাবু এবং তাঁর স্ত্রী তাঁকে একটু স্নেহের সঙ্গে দেড়তলার ছেলেটি বলতেন। তখনও বর্তমান ঝিমলির মা রমা বেশ ছোট, আট-দশ বছর বয়স হবে। সে সুদর্শনবাবুর খুব ন্যাওটা ছিল। দেড়তলার দাদার চারপাশে ঘুরঘুর করত।
চিরকুমার সুদর্শনবাবুর এখন মনে পড়লে হাসি পায়, রমা কলেজে পড়ার সময় একবার তার সঙ্গে বিয়ের তোড়জোড় হয়েছিল। সেই সময়েই প্রায় জোর করেই সুদর্শনবাবু ওখান থেকে উঠে একটা মেসে চলে গিয়েছিলেন।
কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বাড়িওলা তারিণীবাবু সুদর্শনবাবুর নিয়মিত খোঁজখবর রেখেছেন, তা তিনি যেখানে যখন থেকেছেন। এমনকী সুদর্শনবাবুর কলেজেও গেছেন। দরকারে এবং অদরকারে। সুদর্শনবাবুকেও ও বাড়িতে যেতে হয়েছে। রমার বিয়ের আগে পর্যন্ত রমা তাঁকে নিয়মিত ভাইফোঁটা দিয়েছিল, শুধু যে সময় রমার সঙ্গে বিয়ের কথা উঠেছিল সেই দু-এক বছর বাদ দিয়ে।
