সে যা হোক, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজের পৃষ্ঠায় একটা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বের সংবাদ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন অধ্যাপক সেন।
তিনটে কাগজে সংবাদটা তিন রকমভাবে বেরিয়েছে। ইংরেজি দৈনিকে খুবই ছোট করে খবরটি ছাপা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে মধ্য কলকাতায় এক পুরনো সমাজবিরোধীকে একটি অফিসে অগ্নিসংযোগের কালে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। এর কারণ জানা যায়নি, পুলিশি তদন্ত চলছে।
বাংলা কাগজগুলোর একটায় সংবাদটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা অবশ্য ঘটনাটি অন্যভাবে নিয়েছেন, তাঁদের সংবাদের ওপরে একটা ছোট হেডলাইন, পাগলের কীর্তি।
ঘটনার বিবরণ প্রায় একই রকম। তবে এই সংবাদটিতে দুষ্কৃতকারীকে পুরনো সমাজবিরোধী না বলে বুড়ো পাগল বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে যে উক্ত ব্যক্তি, যে ওই অফিসে আগুন লাগাতে গিয়েছিল, সে ওই অফিসেরই কর্তা ও মালিক।
এই দুটি সংবাদেই বলা হয়েছে যে গ্রেফতারের সময় উক্ত ব্যক্তির হাতে এক বোতল কেরোসিন ছিল।
তৃতীয় পত্রিকাটির একটু রঙচঙে খবরের দিকে ঝোঁক। এই পত্রিকাতেই রাজকমল আছেন এবং সুদর্শনবাবু লেখেন।
এই কাগজে বেশ বড় করে হেডলাইন দিয়ে ছাপা হয়েছে।
ছদ্মবেশী আতঙ্কবাদী পুলিশের জালে।
এই পত্রিকার সংবাদেও একটু ব্যতিক্রম দেখা গেল। এরা লিখেছে সন্ত্রাসবাদীর হাতে পেট্রলের টিন ছিল, সে পেট্রলে রাইটার্স বিল্ডিংস, হাওড়া স্টেশনের মতো বড়ো বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া যায়। পুরো ব্যাপারটা গোয়েন্দা পুলিশ দেখবে। প্রয়োজনে সি-বি-আই, মার্কিনি এফ-বি-আই, এমনকি ইন্টারপোলের সাহায্য নেওয়া হবে।
তিনটে পত্রিকাই চায়ের টেবিলের ওপরে পাশাপাশি ফেলে এই সামান্য ব্যাপারটির একটি সামঞ্জস্য রচনা করার চেষ্টা করছিলেন অধ্যাপক সেন।
এটা তাঁর একটা বাতিক। সেই কবে ছোটবেলায় তাঁর জ্যাঠামশায় তাঁকে বলেছিলেন, পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ–এই যেমন চার দিক, প্রত্যেক ঘটনার তেমনই চার দিক আছে। প্রথম, আমি যেমন জানি বা দেখেছি। দ্বিতীয়, তুমি যেমন জান বা দেখেছ। তৃতীয়, সে যেমন জানে বা দেখেছে। আর চতুর্থ দিক হল, সত্যিই যা ঘটেছে।
এই বয়সে এসে, প্রত্যহ সকালবেলা তিনটি খবরের কাগজের নানা রকম সংবাদ যাচাই করতে করতে জ্যাঠামশায়ের কথা মনে পড়ে যায় সুদর্শনবাবুর।
বহুকাল পরলোকহত জ্যাঠামশায়ের উপদেশ মনে রেখে খবরের কাগজ খুঁটিয়ে দেখেন সুদর্শনবাবু।
গরমিল সাধারণত বেশি দেখা যায় স্থানীয় সংবাদে। খুন-মারামারির বিবরণ এক এক কাগজ এক এক রকম ছাপে। সেগুলি বিশ্লেষণ করে ভালই সময় কাটে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ
তিনটি খবরের কাগজ পাশাপাশি বিছিয়ে আজ সকালে অধ্যাপক সুদর্শন সেন গভীর অভিনিবেশসহকারে অগ্নিসংযোগের একটা ঘটনার সমীক্ষা করছিলেন। রীতিমতো তুলনামূলক পর্যালোচনা।
এরকম ব্যাপারে তাঁর কৌতূহল যতটা, ধৈর্য ততোধিক। দুয়েকবার মূল ঘটনা অনুধাবন করবার জন্যে সশরীরে সংবাদের উৎসমূলে গিয়ে খোঁজখবর করেছেন। সব সময় অভিজ্ঞতা সুখের হয়নি। অকুস্থলের লোকেরা তাঁকে সঙ্গত কারণেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছে। একবার পুলিশের পাল্লায়ও পড়েছিলেন, কী প্রয়োজন, কেন এসব খোঁজ করছেন–এইসব প্রশ্ন।
সেটা ছিল একই পাড়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে সাংঘাতিক মারামারির ঘটনা। দলে জনাবিশেক জখম হয়েছিল, দশজনকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছিল, তার মধ্যে একজন, দু-কানকাটা বোঁচা নামে পরিচিত এক স্থানীয় মস্তান, মরণাপন্ন অবস্থায়।
সাধারণত ঠাকুমা-দিদিমারা শিশুর নাক একটু বেশি চ্যাপটা হলে সেই নবজাতককে বোঁচা নামে সম্বোধন করতে থাকেন, যে ডাকনাম সারাজীবন মানুষটার সঙ্গে লেপটে থাকে, এমন কী তার ভাল নাম যদি হয় শান্তনীল কিংবা অপরাজিত তবু লোকসমাজে তার পরিচয় হয় বোঁচা, বোঁচাদা কিংবা বোঁচাবাবু নামে। কেউ কেউ মোটা বোঁচা, কিংবা নেকা বোঁচাতেও পরিণত হয়।
এক্ষেত্রে সুদর্শনবাবু সমস্যার আরও গভীর প্রদেশে গিয়েছিলেন। কানকাটা বোঁচা কথাটা অধ্যাপক মহোদয়কে বিচলিত করেছিল। বোঁচা মানে যৎসামান্য নাক, তদুপরি কানকাটা, মাস্তান-ফাস্তান যাই হোক, নাক কান হীন মানুষটির জন্যে সরল প্রকৃতির দর্শনের অধ্যাপক সুদর্শন সেনের খুব মায়া হয়েছিল। খবরের কাগজে ঘটনার বিবরণ পাঠ করে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে কানকাটা বোঁচার খবর নিতে গিয়েছিলেন।
এলাকায় পুলিশের গোয়েন্দারা ঘোরাঘুরি করছিল, সুদর্শনবাবুর মহৎ উদ্দেশ্য তারা অনুধাবন করতে পারেনি, তাদের মনে সন্দেহ দেখা দেয়, তারা তাঁকে থানায় নিয়ে যায়।
ভাগ্য ভাল যে ওই থানার এক দারোগা ছিল সুদর্শনবাবুর প্রাক্তন ছাত্র। ছাত্রজীবনে সুদর্শন স্যারের নানারকম খামখেয়ালিপনার বিষয় নিয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সে নিজেও খুব হাসাহাসি করেছে।
একবার ক্লাসরুমে ঘরের ভেন্টিলেটারের চড়ুই পাখির বাসা থেকে পাখির ডিম মেঝেতে পড়ে ভেঙে যায়। সুদর্শনবাবু তখন পড়াচ্ছিলেন, ক্লাসে প্রায় দেড়শো ছাত্র–সব উপেক্ষা করে চড়ুই বাবা-মা প্রচণ্ড লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি চিৎকার-চেঁচামেচি করতে লাগল। পরের দিন বাজার থেকে একটা খুব ছোট মুরগির ডিম কিনে সেটা সুদর্শনবাবু রুমালে আলতো করে জড়িয়ে পকেটে নিয়ে কলেজে এলেন। তারপর একজন লম্বা ছাত্রকে অনুরোধ করে জানলায় উঠিয়ে ভেন্টিলেটারে চড়ুইয়ের বাসায় ডিমটা রেখে দেন। চড়ুই মা-বাবাকে ভোলানোর জন্যে এই ব্যবস্থা। ছাত্ররা কেউ কেউ বলেছিল, স্যার, চড়ুইয়ের এত বড় ডিম! চড়ুই মেনে নেবে না। আত্মসন্তুষ্ট অধ্যাপক সেদিন বলেছিলেন, ওই টুকু পাখি চড়ই, তার পক্ষে এই তারতম্য ধরা খুব সহজ হবে না।
