হিতু কয়লাশহরে ডাক্তারবাবুর কাছে রয়ে গেল। দিন যায়। ক্রমশ সে ডাক্তারখানার বাইরের ফাঁইফরমাস খাটা থেকে ফার্মেসির অন্দরে প্রবেশ করল। সে লেখাপড়ায় খারাপ হলেও নির্বোধ নয়। আস্তে আস্তে সে কম্পাউন্ডারবাবু না এলে কম্পাউন্ডারের কাজ চালাতে শিখল। তারপর যেমন হয়, একদিন বুড়ো কম্পাউন্ডারবাবু অবসর নিতে সে পাকাপাকি কম্পাউন্ডার হয়ে গেল।
এখানেই শেষ নয়, কিছু টাকা জমিয়ে বছর দুয়েকের মাথায় নিজেই একটা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারখানা খুলে ফেলল। সে নিজেই ডাক্তার, ডক্টর এইচ চক্রবর্তী। অল্পদিনের মধ্যে রমরমা পশার জমে উঠল। আগের ডাক্তারবাবুর পশার এখন পড়তির দিকে, সে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁকে হারিয়ে দিল। এইবার থামতে হচ্ছে। আর নয়।
হিতু নামক এক বাড়িপালানো যুবকের জীবনের সাফল্য বর্ণনার জন্য এ গল্প আমি লিখতে বসিনি। এ গল্প হিতুর বাবাকে নিয়ে।
সংক্ষেপে শেষ ঘটনাটা বলি।
বাড়ি থেকে একশো টাকার নোট ভাঙাতে গিয়ে পালানোর পাঁচ বছর পরে প্রাক্তন হিতু বর্তমান ডাঃ চক্রবর্তী একদিন ভবানীপুরের বাড়িতে দেখা করতে এল। তার পরনে ক্রিম রঙের সাফারি স্যুট, হাতে আন্তর্জাতিক মানের ঘড়ি। সঙ্গে সালঙ্কারা বধূ। সে নিজস্ব মারুতি ডিলাক্সে চেপে নিজের বাড়ির দরজায় এসে পৌঁছাল এক সন্ধ্যায়।
বাইরের ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। হিতু আস্তে আস্তে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকল, পিছনে বউ। ঘরের মধ্যে একটা পঁচিশ পাওয়ারের আলো টিমটিম করে জ্বলছে। সেই পুরনো দৃশ্য। তার বাবা সিদ্ধেশ্বরবাবু একটা প্রাচীন বেতের চেয়ারে গালে হাত দিয়ে বসে রয়েছেন। স্পষ্টতই মনে মনে কোনও হিসেব করছেন। হিতুকে ঘরে ঢুকতে দেখে, পাঁচ বছর পরে হিতু ফিরছে, তা সত্ত্বেও কোনও ভাবান্তর হল না সিদ্ধেশ্বর চক্রবর্তীর। তাঁর পিতৃহৃদয়ে কোনওরকম উচ্ছ্বাস দেখা গেল না, একবার মুখ তুলে ছেলেকে দেখে বললেন, একশোটা টাকা ভাঙাতে গিয়ে এত দেরি করলি! দে, ভাঙানিটা তাড়াতাড়ি দে!
এখনই
অধ্যাপক সুদর্শন সেন বাইরের ঘরে বসে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। তিনি নিজের পয়সা দিয়ে একটা ইংরেজি, একটা বাংলা, দুটো খবরের কাগজ রাখেন। এ ছাড়া আর একটি বাংলা কাগজে তিনি কখনও-সখনও প্রবন্ধাদি লিখে থাকেন বলে, পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সেই কাগজটা তাঁকে বিনামূল্যে দেয়।
এখন সকাল সাতটা। এখন থেকে সকাল নটা সাড়ে নটা পর্যন্ত তিনটে কাগজই তিনি প্রথম পৃষ্ঠার হেডলাইন, ফটো-ক্যাপশন থেকে শেষ পৃষ্ঠার প্রিন্টার্স-লাইন আগাগোড়া উলটে পালটে পড়বেন। অনেক অসঙ্গতি, ভুল বার করবেন।
এই তো সেদিন মার্কিন রাষ্ট্রপতি কটকটি বিস্কুট খেতে খেতে আরাম করে চেয়ারে শরীর এলিয়ে দূরদর্শনে খেলা দেখছিলেন। হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে যান। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে। এরকম অবস্থা যেকোনও সুস্থ মানুষের যেকোনও সময় হতে পারে। এ হল সাময়িক ব্ল্যাক-আউট।
মার্কিন রাষ্ট্রপতির এই হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া, তা নিয়ে সারা পৃথিবী মাথা ঘামিয়েছে। সুদর্শনবাবুও মাথা ঘামিয়েছেন। কিন্তু সেটা একটু অন্য কারণে। তিনি যে কাগজ প্রতিদিন বিনামূল্যে পান, সেই কাগজে লিখেছে বুশসাহেব প্রেটজেল নামে ওষুধের ট্যাবলেট খেতে গিয়ে গলায় আটকে অজ্ঞান হয়ে যান।
মার্কিনিদের কটকটি বিস্কুটের নাম প্রেটজেল, এটা কোনও ওষুধের ট্যাবলেট নয়। যিনি অনুবাদ করেছেন, ব্যাপারটা গুলিয়ে ফেলেছেন। প্রবীণ অধ্যাপক এ ধরনের ভুল মোটেই বরদাস্ত করেন না।
সুদর্শনবাবু কাগজ পড়া থামিয়ে টেলিফোন করেন পত্রিকার সহকারী সম্পাদককে। সহকারী সম্পাদক রাজকমল রায় একদা অধ্যাপনা করতেন, সুদর্শনবাবুর সঙ্গে একই কলেজে পড়াতেন। পরে অধ্যাপনা ছেড়ে সাংবাদিকতায় চলে যান।
এই রাজকমলবাবুই মাঝেমধ্যে সুদর্শনকে দিয়ে নানা বিষয়ে প্রবন্ধ লেখান। সংবাদ সাময়িকী জাতীয় রচনা সুদর্শন খুব ভাল লেখেন। তথ্যের প্রতি তাঁর কড়া দৃষ্টি, হেঁয়ালিহীন ভাষা।
প্রেসিডেন্ট বুশ অজ্ঞান হওয়ার সংবাদ খুব গুরুত্ব দিয়ে বেরিয়েছিল রাজকমলবাবুদের কাগজে এবং সেখানেই বলা হয়েছিল, ওষুধের ট্যাবলেট গলায় আটকে বুশসাহেব অজ্ঞান।
সুদর্শনবাবু তাঁর ওয়েবস্টারের বড় ডিকশনারিতে ওই প্রেটজেল শব্দের অর্থ ভাল করে যাচাই করে সেই সকালেই অনুজপ্রতিম রাজকমলকে ফোন করে বললেন, রাজকমল আজকের কাগজে ওটা কী করেছ?
বলা বাহুল্য, রাজকমল ব্যাপারটার দায় এড়িয়ে যেতে চাইছিলেন, সুদর্শনবাবুকে অনুরোধ করলেন, দাদা চেপে যান। পাঠকেরা কেউ ওসব খেয়াল করবে না।
তা সুদর্শনবাবু ভাল করেই জানেন। বেশ কয়েক বছর আগে ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান সুব্রত মুখার্জি বিদেশে ডিনারের আগে হঠাৎ হার্টফেল করে মারা যান। মৃত্যুর সময় তিনি অ্যাপেটাইজার খাচ্ছিলেন যার নাম হর্স-দ্য-অ্যাভুয়ার, ছোট বিস্কুটের ওপরে আচার বা চিজ বা একরত্তি খাদ্য, ফরাসি মুখরোচক। কিন্তু ওই হর্স শব্দটি বিভ্রান্ত করেছিল অনুবাদককে, পরদিন সকালে কাগজে ছাপা হল, ঘোড়ার মাংস গলায় ঠেকিয়া এয়ার মার্শালের মৃত্যু।
এই ঘটনার পর বহুকাল চলে গেছে, কিন্তু এখনও কোথাও কোথাও শোনা যায় এয়ার মার্শালের ঘোড়ার মাংসের হাড় গলায় ঠেকে মৃত্যু হয়েছিল। এরই সূত্র ধরে অনেকে এ রকমও মন্তব্য করেন। যে, বাঙালির ছেলের ওরকম অখাদ্যকুখাদ্য না খাওয়াই উচিত।
