সামনের ফুটপাথ থেকে দুটো রঙিন কাগজের টুপি কিনে জয়দেব নিজে একটা মাথায় দিল আর একটা মহিমাময়কে দিল। মহিমাময় অবশ্য সেটা মাথায় দিল না, রাস্তা দিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে যাচ্ছিল তার মাথায় পরিয়ে দিল। জয়দেব সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে তাড়াতাড়ি মহিমাময়ের হাত ধরে টানতে টানতে রাস্তার ওপারে ট্রাম স্টপে এল।
উত্তর দিক থেকে একটা গড়িয়াহাটার ট্রাম আসছিল, প্রায় কঁকা। দুজনে মিলে সেটায় উঠল। তারপরে গড়িয়াহাটায় নেমে সোজা আলুর আড়তের পিছনে শ্যামাদাসীর ঠেক।
প্রিয় পাঠক মহোদয়, অনুগ্রহ করে একবার তিরিশ বছর পিছন ফিরে তাকান।
ওইখানে আলুর আড়তের ফাঁক দিয়ে দেখুন। কলঙ্কিত তক্তাপোশের ওপরে জয়দেব এবং মহিমাময় বসে আছে। আশেপাশে আরও দু-চারজন। আগামী তিরিশ বছরের বর্ণোজ্জ্বল মাতাল জীবনে আজ মহিমাময়ের হাতেখড়ি। সামনে বড় কাঁচের গেলাসে টগবগ করে ফুটছে কড়া পানীয়, উচ্ছল ফেনা গেলাস থেকে চারপাশে গড়িয়ে পড়ছে, ছ্যাঁক হ্যাঁক করে শব্দ হচ্ছে।
একটু পরে গেলাসের উচ্ছ্বাস থেমে গেল। নতুন খদ্দের দেখে শ্যামদাসী নিজের হাতে আঁকনি। দিয়ে হেঁকে মহিমাময়ের হাতে একটা গেলাস এগিয়ে দিল। কম্পিত হাতে গেলাসটা ধরে একটু ঠোঁটে ছোঁয়াল মহিমাময় স্বাদ নেওয়ার জন্যে এবং সঙ্গে সঙ্গে টের পেল যে শুকনো লঙ্কা সরষের সঙ্গে বেটে অ্যাসিডে মেশালে যে স্বাদ হবে সে এর চেয়ে অনেক নরম ও সুস্বাদু।
কিন্তু মুহূর্তের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এক হাতে নাক টিপে, চোখ বুজে এক নিশ্বাসে মহিমাময় সেই তরল গরল গলাধঃকরণ করল। বন্ধুর এই কীর্তি দেখে জয়দেব হাততালি দিয়ে উঠল। শ্যামাদাসীও অবাক হয়ে মহিমাময়ের দিকে তাকিয়ে রইল, তার পোড়খাওয়া আসববৃত্তির দীর্ঘজীবনে এর আগে আর কাউকে দেখেনি, জীবনের প্রথম পানীয় বিশেষ করে এই এসপেশাল চুল্লু এমন চোঁ-চোঁ করে এক টানে মেরে দিতে।
মহিমাময়ের নাক আর কান দিয়ে তখন গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে, গলায় আগুন জ্বলছে, পায়ের গোড়ালি থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত ঝিমঝিম করছে, সে হঠাৎ দেখতে পেল শ্যামাদাসী তাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, এবং একটু পরেই দেখল শ্যামদাসীকে হাটিয়ে দিয়ে তার প্রাণের বন্ধু জয়দেব গড় হয়ে তার পায়ের ধুলি নিচ্ছে।
হাস্যকর
ডাক্তারবাবু তাকে সিগারেট খেতে মানা করেছেন। বলেছেন, যদি চান, সন্ধের দিকে মদ একটু-আধটু খেতে পারেন, অল্প মদ শরীরের পক্ষে খারাপ নয়, বরং স্বাস্থ্যকর। কিন্তু সিগারেট নৈব। নৈব চ।
অর্ণব দত্ত বলেছিলেন, কিন্তু সিগারেট ঠোঁটে না থাকলে এক লাইন লিখতে পারি না।
ডাক্তারবাবু, তিনি কোনও সামান্য ডাক্তার নন, একশো টাকা ভিজিট, ডাক্তারসাহেব বলাই উচিত, তিনি বললেন, অন্য কোনও উপায় দেখুন! একেকটা সিগারেট গড়ে তিন ঘণ্টা করে পরমায়ু কমিয়ে দেয়।
অর্ণব দত্ত একজন খ্যাতনামা লেখক। অবশ্য নিতান্ত এইটুকু বললে তার অবমাননা করা হয়। এখনকার বাংলা ভাষার পাঠক-পাঠিকারা তাকে জানেন, হাসাহাসির গল্পে তার জুড়ি নেই।
বছরে দু-চারটে বই বেরোয় অর্ণব দত্তের। সেই বইগুলোও চমৎকার বিক্রি হয়। সম্প্রতি একটি বই অর্ণববাবু উক্ত ডাক্তারসাহেবকেও উৎসর্গ করেছেন। তাঁর আশা ছিল হয়তো ডাক্তারবাবু এর পরে আর ভিজিট নেবেন না। কিন্তু তা হয়নি, ডাক্তারবাবু এর পরেও অত্যন্ত নির্বিকারভাবে ভিজিটের টাকা নিয়েছেন।
অবশ্য উৎসর্গের ব্যাপারটাও খুব সুবিধের নয়। বই উৎসর্গ করতে লেখকের কোনও পরিশ্রম বা অর্থ ব্যয় করতে হয় না। একটু ভেবে-চিন্তে চেনাজানা বা দামি কোনও লোকের নামে এই উৎসর্গ করলেই হল। অথচ উৎসর্গ করলে উৎসর্গপত্র ও তার পরের সাদা পৃষ্ঠাটি সমেত বইয়ের দুই পৃষ্ঠা বেড়ে যায়। যার জন্যে বইয়ের দাম আজকের বাজারে পঞ্চাশ ষাট পয়সা বেশি হয়। আনুপাতিক হারে লেখকের রয়ালটিও বাড়ে।
তা ছাড়া কারও নামে খ্যাতনামা লেখক বই উৎসর্গ করলে সেই ব্যক্তি যদি অনুগত বা প্রিয়জন কেউ হন, তিনি কৃতার্থ বোধ করেন। আবার ইচ্ছে হলে, নামীদামি লোকদেরও বই উৎসর্গ করে খুশি করা যায়।
অর্ণব দত্তের মতো জনপ্রিয় লেখকের একটা উৎসর্গীকৃত বই পেয়ে ডাক্তারসাহেবও নিশ্চয় খুব। খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু তার কোনও বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি, তার ভিজিট তিনি যথারীতিই নিয়েছেন।
সে যা হোক, অর্ণব দত্তের শরীরের আজ বেশ কিছুদিন হল বেহাল অবস্থা চলছে। ডাক্তারের নিষেধ অমান্য করা তাঁর পক্ষে উচিত নয়।
তবে এ বয়সে মদ ধরা তার পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়। জিনিসটা পার্টি-টার্টিতে দুয়েকবার খেয়ে দেখেছেন অর্ণববাবু, তার মোটেই সহ্য হয় না। অনেক সময় বমি পর্যন্ত করে ফেলেছেন। মাথা ঘুরেছে, পা টলেছে, পরের দিন সকালে কপাল টনটন করেছে। তাঁর তালেবর বন্ধুরা অর্ণববাবুকে বলেছেন, এসব কিছু নয়। ধীরে ধীরে নিয়মিত খেয়ে যাও সয়ে যাবে। সকলে খেতে পারে, আর তুমি পারবে না।
কিন্তু অর্ণববাবুর মদ্যপানে রুচি নেই। ডাক্তারসাহেবের নির্দেশের পরে একদিন এক বোতল মদ কিনে সন্ধ্যাবেলা লেখার টেবিলে নিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু অল্প একটু পান করার পরে লেখা তো এগোলই না, বরং সবকিছু ঘুলিয়ে গেল।
তখন আরও একটু খেলেন। এবার কিন্তু ফ্লো এসে গেল। তাড়াতাড়ি কাগজকলম টেনে নিয়ে তরতর করে লিখে গেলেন।
