এই ইচ্ছের গভীর ব্যঞ্জনা জয়দেব ছাড়া কেউ বুঝতে পারেনি। জয়দেব উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তাহলে সিংজি চলো যাই, দেখে আসি।
যেমন কথা তেমন কাজ। অন্য মাতালেরা কেউ কিছু বোঝার আগে প্রথমে জয়দেব তারপরে সিংজি নিঃশব্দে দেয়াল ডিঙিয়ে চিড়িয়াখানার ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
এর পর কী হয়েছিল বলা খুব কঠিন। কেউ বলে ওরা দুজনে জলহস্তির ডেরায় গিয়ে পড়েছিল, অন্যেরা হিসেব করে বলেছে তা নয়, ভালুকের খাঁচার ওপরে।
জয়দেব পরে বলেছিল, দেয়াল টপকে ভালুকের খাঁচার উপরে পড়া সম্ভব নয় তবে সামনে পড়েছিল।
কিন্তু আসল কথা হল তারা দুজনে পড়েছিল চিড়িয়াখানার এক অস্থায়ী অনতিপ্রৌঢ়া জমাদারনির দেয়াল-ঘেঁষা ঝুপড়ির বাঁশের চাল ভেঙে তার বিছানার ওপরে।
তারপরে চিৎকার, চেঁচামেচি হইচই। যা কিছু হওয়া সম্ভব। চিড়িয়াখানার ভেতরে রাত্রিতে যে দু-চারজন লোক থাকে এদিক ওদিক নানা কোয়ার্টারে, তারা ভাবল বাঘ কিংবা সিংহ খাঁচা খুলে বেরিয়েছে। কেউ বলল একটা হাতি খেপে গিয়ে শিকল ছিঁড়ে ছুটছে।
জয়দেবের এই রকম সব বহুমুখী অভিজ্ঞতার কাছে মহিমাময় নিতান্ত শিশু।
.
আজ এই বড়দিনের উৎসবের রাতে জয়দেব প্রায় জোর করেই মহিমাময়কে নিয়ে বেরিয়েছে পানীয়ের পৃথিবীর সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে। এর আগে মহিমাময় একটু-আধটু পানীয় শৌখিনভাবে কখনও কখনও চেখে দেখেছে। সেও সুপরিবেশে দামি পানীয়। কিন্তু সেসব খেতেও তার মোটেই ভাল লাগেনি। কেমন তেতো তেতো, ঝাঁঝওয়ালা স্বাদ।
আজও একটু আগেই সাহেবপাড়ায় পার্ক স্ট্রিটে জয়দেবের সঙ্গে একটা বারে গিয়েছিল মহিমাময়। বড়দিনের বাজারে সেখানে ভীষণ ভিড়, হই-হুঁল্লোড় ঠেলাঠেলি। বহু কষ্টে ধাক্কাধাক্কি করে জয়দেব কাউন্টার থেকে দু গেলাস হুইস্কি সোডা সংগ্রহ করেছিল, একটু দূরে কিঞ্চিৎ ফাঁকায় মহিমাময় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিল।
আসার পথে এক স্থূলকায়া মেমসাহেবের গুঁতো খেয়ে গেলাসসুদ্ধু জয়দেব উলটিয়ে গেল। মেমসাহেবের মহার্ঘ্য গাউন প্লাবিত হয়ে গেল দুই গেলাস মদে।
কোথায় দু গেলাস বৃথা গেল বলে শোক করবে, সে জায়গায় উলটে মেমসাহেব জয়দেবের কলার চেপে ধরল বদমায়েশি করে গাউন নষ্ট করে দেয়ার জন্যে। জয়দেব যত বোঝাতে চেষ্টা করে যে ক্ষতিটা তারই বেশি হয়েছে, এই দুর্দিনের বাজারে বহুকষ্টে আহরিত দু পাত্র দুমূল্য পানীয় লোকসান করে বদমায়েশি করার ক্ষমতা বা ইচ্ছে তার নেই, ততই মেমসাহেব শাটআপ শাটআপ বলে চেঁচাতে থাকে এবং সেই সঙ্গে মাঝে মাঝে জয়দেবকে স্কাউড্রেল এবং রাস্কেল বলে সম্বোধন করতে থাকে।
এ অবস্থায় কী করবে বুঝতে না পেরে দূরে দাঁড়িয়ে মহিমাময় ভয়ে ঠকঠক করে কঁপছিল, এমন সময় বারের ম্যানেজার এসে জয়দেবকে উদ্ধার করলেন। জয়দেব এখানকার পুরনো এবং বাঁধা খদ্দের, তার হেনস্তা দেখে তিনি বাধ্য হয়ে এগিয়ে এসেছেন।
অবশ্য ম্যানেজার সাহেব যা করলেন তা কহতব্য নয়। মোটা মেমসাহেবের ঘাড় ধরে দরজার দিকে ঠেলে নিয়ে গেলেন, যেতে যেতে বললেন ফ্যাট গার্ল গো হোম, দিস ইস নট ইয়োর নাইট (Fat girl go home, this is not your night.) সরাসরি অর্থ হল, মোটা মেয়ে বাড়ি যাও, এ রাত তোমার রাত নয়।
মেমসাহেব কী বুঝে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যানেজার সাহেবের গালে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে গাইতে লাগলেন, কে সারা সারা।
জয়দেব কী ভাবল কী ভাবল না কে জানে, কিন্তু মহিমাময়ের এ ধরনের অভিজ্ঞতা এই প্রথম। তার মনে হল দ্রুতপায়ে এখান থেকে সরে পড়াই ভাল। এবং এ কথা মনে হওয়া মাত্র সে বার থেকে ফুটপাথে গিয়ে নামল।
ফুটপাথে তখন বড়দিনের সন্ধ্যা জমজমাট। রাত প্রায় আটটা বাজে। বারের ভেতরের থেকে ফুটপাথের ভিড় আরও বেশি। ভিড়টা চৌরঙ্গির দিক থেকে, সুতরাং মহিমাময় পার্ক স্ট্রিট ধরে পুবমুখী পার্ক সার্কাসের দিকে হাঁটা শুরু করল।
বেশিক্ষণ যেতে হল না। এই ভিড় আর হই-হুঁল্লোড়ের গণ্ডগোলে জয়দেব একটু পরেই তাকে এসে ধরল, কীরে, পালাচ্ছিস কোথায়?
মহিমাময় বলেন, না পালিয়ে উপায় কী? ভিড়ে দমবন্ধ হয়ে মারা পড়ব নাকি?
জয়দেব জিব দিয়ে একটু চুক চুক করে বলল, ভিড় তত ভালই, শুধু এই বড়দিনের রাতে দু গেলাস হুইস্কি অদানে অব্রাহ্মণে গেল, তারপর মেমসাহেবের গালাগাল খেলাম। আর সাহেবপাড়ায় নয়, চল বাঙালি পাড়ায় নিরিবিলিতে ফুর্তি করা যাক।
মহিমাময় জানতে চাইলে, বাঙালি পাড়ায় আবার কোথায়?
জয়দেব বলল, গড়িয়াহাটায় শ্যামাদাসীর ওখানে, চমৎকার জায়গা।
এর আগে শ্যামাদাসীর নাম শোনেনি মহিমাময়, সে চমকিয়ে উঠল, না না, ওসব খারাপ জায়গায় যাব না।
জয়দেব হাত তুলে আশ্বস্ত করল, আরে না, কোনও খারাপ ব্যাপার নেই। মোটেই খারাপ জায়গা নয়। শ্যামাদাসীর খুব ডিসিপ্লিন। তা ছাড়া দামে সস্তা এবং খাঁটি মাল। চোখের সামনে তৈরি করে দেয়।
খাঁটি মাল শুনে খুব ভয় পেয়েছিল মহিমাময়, তবে সামনে তৈরি করে দেয় শুনে বুঝতে পারল জয়দেব সুরা সম্পর্কে বলছে, সাকি সম্পর্কে নয়।
এতক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে দুজনে লোয়ার সার্কুলার রোডের ট্রাম রাস্তায় এসে গেছে। এখানেও বড়দিনের জটলা, অধিকাংশ দিশি ফিরিঙ্গি আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান।
