পরের দিন সকালবেলা আগের রাত্রে লেখা পাণ্ডুলিপি পড়তে গিয়ে তার চোখ কপালে উঠল। এসব কী আবোল তাবোল লিখেছেন। গল্পের নায়ক শেয়ালদা স্টেশন থেকে পুরী এক্সপ্রেসে চড়ে আসানসোল চলেছে। গল্পের শুরুতে নায়কের স্ত্রীর নাম মালতী, আসানসোল বাড়িতে তার স্ত্রীর নাম সরমা, পরে পুরী থেকে নায়ক স্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন প্রিয়তমা অমলিনা বলে। অবশ্য নায়কের নামও ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়েছে, প্রথমে পুরন্দর, তারপরে পুণ্ডরীকাক্ষ অবশেষে পৌন্ড্রবর্ধন।
নিজের লেখা রচনা পড়ে অর্ণব দত্ত একেবারে থ মেরে গেলেন। টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, প্রায় আধবোতল মদ খেয়েছেন কালরাতে। পরে রাতে বিছানা থেকে উঠে বমিও প্রচুর করেছেন। এই সকালবেলায় বাথরুম দিয়ে টক গন্ধ বেরোচ্ছে। জমাদার ডাকিয়ে পরিষ্কার করাতে হবে।
কিন্তু এই গল্পটা কাল রাতেই শেষ করার কথা ছিল। পুরনো দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে অর্ণব দত্ত দেখলেন সাড়ে দশটা বাজে। অতিরিক্ত মদ্যপান করে এবং শেষ রাত পর্যন্ত ঘর-বাথরুম করে অর্ণব দত্ত ঘুম থেকে উঠতে বেলা করে ফেলেছেন, সাড়ে নটা বেজে গেছে।
এখন আর লেখার সময় নেই। আরেকবার করুণ চোখে গতরাতের হাবিজাবি লেখাটার দিকে তাকালেন অর্ণব দত্ত। মদ খেয়ে, কঠোর পরিশ্রম করে, হেঁচকি তুলতে তুলতে গল্পটা লিখেছিলেন অর্ণববাবু। খুব বেশি লেখা এতটা মেহনত করে তিনি লেখেননি। এখন লেখাটা সামনের কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
এই রকম ভাবতে ভাবতে নিজের মনে একটু হাসলেন অর্ণববাবু। জ্ঞানী, গুণী লোকেরা, সমালোচকরা অনেকেই অনেক সময় বলেন অর্ণব দত্তের কোনও লেখাই পড়বার যোগ্য নয়। বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া উচিত, আজ অবশেষে তিনি নিজেই তার এত কষ্টের লেখা বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিচ্ছেন।
ফেলে না দিয়ে উপায় নেই। কিন্তু এখন কী করা যাবে? রামলগন তেওয়ারির এগারোটার সময় আসার কথা, পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে অর্ণববাবু জানেন যে কাঁটায় কাটায় এগারোটাতেই রামলগন এসে যাবেন।
কাল রাতে রামলগনের গল্পটাই লেখার কথা ছিল অর্ণববাবুর। এর জন্যে ইতিমধ্যে কিছু আগামও তিনি নিয়েছেন।
রামলগন ভাল টাকা দেন। তার চেয়ে বেশি টাকা আজকাল আর কেউ দেন না। রামলগন তেওয়ারির কাগজের নাম নবযুগ। কলকাতা থেকে একসঙ্গে পাঁচটি ভাষায় প্রকাশিত হয়, বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, অহমিয়া এবং নেপালি–পূর্বাঞ্চলের সব কয়টি ভাষায়।
প্রত্যেক ভাষায় একজন করে আলাদা সম্পাদক আছে। কিন্তু সে নামমাত্র। রামলগনই সব। তিনিই প্রতিষ্ঠাতা, তার নিজস্ব কোম্পানি রামলগন অ্যান্ড সন্সই কাগজগুলির মালিক।
রামলগনের অবশ্য কোনও ছেলে নেই। তিনি এখন পর্যন্ত বিয়েই করেননি। কিন্তু ভবিষ্যতে বিয়ে করলে, তখন যদি ছেলে হয়, তাদের মালিকানার ক্ষেত্রে তাঁর মৃত্যুর পরে যদি কোনও বাধা হয় তাই আগে থেকেই ব্যাপারটা তিনি কোম্পানির নামকরণের মধ্যে দিয়ে সেরে রেখেছেন।
রামলগন অ্যান্ড সন্স তথা রামলগন তেওয়ারির আর কোনও ব্যবসা নেই, একমাত্র পত্রিকা প্রকাশ করা ছাড়া। মাসে মাসে পাঁচটি ভাষায় মোটমাট বেশ কয়েক লক্ষ পত্রিকা ছাপা হয় এবং দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে যায়। পাঠককুলে নবযুগ পত্রিকার খুব চাহিদা।
সব কাগজে একই লেখা ছাপা হয়। হিন্দি ধারাবাহিক উপন্যাস, ওড়িয়া রম্যরচনা, বাংলা গল্প ইত্যাদি একেকটি ভাষায় অনুবাদ হয়ে একেকটি পত্রিকায়। যোগ্য অনুবাদকদের ভাল মাইনে দিয়ে রেখেছেন রামলগন। সেই অনুবাদকদের নামই যার যার ভাষায় পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ছাপা হয়।
সাহিত্য ছাড়াও সিনেমা, থিয়েটার, যাত্রা, দূরদর্শন আছে, আছে খেলাধূলা, ফুটবল, ক্রিকেট। এসবের ওপর রামলগনের প্রবল উৎসাহ, অধিকাংশ মূল রচনাই হিন্দিতে তৈরি করেন তিনি। নানা খবরের কাগজ থেকে টুকে। ৪৮
তবে নবযুগ পত্রিকা মূলত হালকা চরিত্রের কাগজ। রম্যরচনা, হাসির গল্প, কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির কাহিনি এই সবের জন্যে পাবলিক নবযুগ পড়ে, কাড়াকাড়ি করে পড়ে।
কিন্তু রাজনীতির লাইনে রামলগন বা তার কাগজ নবযুগ নেই। রাজনীতি থেকে শতহাত দূরে থাকার চেষ্টা করে নবযুগ। তবু আজকালকার বাজারে রাজনীতির মধ্যেও এতসব হাসাহাসি মজার ব্যাপার এসে গেছে যে একটা তরল পত্রিকার পক্ষে সব সময় রাজনীতি বর্জন করে দূরে থাকা সম্ভব হয় না।
.
এই গল্পে রামলগন তেওয়ারি এবং তার প্রবর্তিত জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকা নবযুগ সম্পর্কে বোধহয় আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই।
এবার আমরা ফিরে যাব শ্রীযুক্ত অর্ণব দত্তের শয়নকক্ষে। বেলা প্রায় এগারোটা বাজে। একটু পরেই রামলগন গল্প নিতে আসবেন।
অর্ণব দত্ত থাকেন উত্তর-পূর্ব কলকাতার প্রত্যন্ত অঞ্চলে লেকটাউনের কাছাকাছি। নিজেই বাড়ি করেছেন। দোতলা করার ইচ্ছে আছে, সেই ভাবেই প্ল্যান পাশ করিয়েছেন, কিন্তু এখনও দোতলা করে উঠতে পারেননি। দোতলায় সিঁড়ির মুখে একটা বড়সড় চিলেকোঠা মতন ঘর করেছেন, সেটাই অর্ণববাবুর আস্তানা, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের হাসাহাসির গল্পের পীঠস্থান।
এই চিলেকোঠা ঘরই অর্ণববাবুর শয়নকক্ষ, ঘরের একপাশে দক্ষিণ দিকের জানলার পাশে একটি মাঝারি সাইজের খাট আছে। ঘরের অন্যপাশে উত্তর-পূর্ব কোণে দেয়াল ঘেঁষে লেখার টেবিল, তার দুদিকে দুটো চেয়ার। একটায় বসে অর্ণববাবু লেখাপড়া করেন, অন্যটায় বাইরের কেউ এলে বসে। টেবিলে লেখার প্যাড, কালিকলম। বইয়ের মধ্যে রয়েছে বাংলা ইংরেজি অভিধান, সঞ্চয়িতা আর কয়েকটি বিলিতি জোকবুক। বইপত্র এ ঘরে বিশেষ নেই। সবই একতলায় বইয়ের ঘরে আলমারিতে, কিছু অতি প্রয়োজনীয় এবং সদ্য উপহার পাওয়া তৎসহ নিজের সদ্যপ্রকাশিত বই দোতলায় উঠবার সিঁড়ির বাঁকে একটা ছোট সেলফে রয়েছে।
