এবং তারপর আবার জয়দেবের দৌড়।
এবং তারপর আবার জয়দেবের আড়াই হাত পিছনে শাণিত জিহ্বা, কস্তুকণ্ঠী, খরনখী শ্রীমতী বাভারিয়া সুন্দরীর ক্রমাগত আস্ফালন।
যেকোনও মানুষ এর পরে হয় আত্মসমর্পণ করত অথবা হার্টফেল হয়ে মরে যেত।
কিন্তু আত্মসমর্পণ বা সনাতন হার্টফেল করার জন্যে জয়দেব জন্মায়নি।
আধ মাইলের মাথায় নিমতলার মড়াখোঁচা কয়েকটি নেড়ি কুকুরকে শেষবার ধরাশায়ী হয়ে ওঠার মুহূর্তে সে লেলিয়ে দিল বিউটির দিকে।
শ্রীমতী বিউটি পথ-লড়াই বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞা, চোঁ চোঁ পালানো ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না।
ফলে এ যাত্রা জয়দেব রক্ষা পেল। কিন্তু বিউটির ভয়ে মামাবাড়ির বারোয়ারি আশ্রয় তাকে ছাড়তে হল। এমনকী দু-একটা পুরনো জামাকাপড়, একজোড়া প্রায় নতুন চটি, গামছা, টুথব্রাশ এই সব দৈনন্দিন ব্যবহারের টুকিটাকি জিনিস মামাবাড়িতে সব কিছুই পড়ে রইল, সে আর সাহস পেল না সেগুলো উদ্ধার করে আনতে যেতে।
কিন্তু কোথাও তো মাথা গুঁজতে হবে, রাতে শুতে হবে। তা ছাড়া একটা কারণে জয়দেবের একটু ফঁকা জায়গা লাগে। সে ছবি আঁকে। অল্প অল্প নাম করছে। শিল্পী জয়দেব পালের নাম তত বিখ্যাত হলেও তখন বেশ ছড়াতে শুরু করেছে।
মনে রাখতে হবে পাকা তিরিশ বছর আগের ঘটনা এটা।
তখনও ভবঘুরে আর ধান্দাবাজেরা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বত্ত্ব দখল করে নেয়নি।
বলা যায় যে জয়দেবই এ ব্যাপারে পথিকৃৎ। একেকদিন রাতে, অনেক রাতে মদ খেয়ে, অনেক মদ খেয়ে শেয়ালদা স্টেশনে ঢুকে পড়ে জয়দেব। কোনও অসুবিধা হয় না, কেউ আপত্তি করে না।
এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এ ছাড়াও সে হাওড়া স্টেশনে, লেক গার্ডেন বাস টার্মিনাসের ডিপোতে, ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে, এমনকী একদিন রাজভবনে আর একদিন হাইকোর্টে মত্ত অবস্থায় অবলীলাক্রমে গভীর রাতে ঢুকেছে। কখনও কোনও অসুবিধে হয়নি।
শুধু হাইকোর্টে সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পণে যে ঘরে ঢুকে সে ঘুমিয়েছিল সেটা ছিল এক বদরাগী জজ সাহেবের এজলাশ। তাতে কিছু আসে যায় না, রাতের বেলা তো আর জজসাহেবের এজলাশ তখন বসে না।
কিন্তু পরের দিন সকালে জয়দেবের ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়, অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে সে যখন জজবাহাদুরের খাস কামরায় বাথরুমে প্রাতঃকৃত্য করছিল তখন বেলা সাড়ে দশটা। জজবাহাদুর এসে গেছেন, তিনি এজলাশে ওঠার আগে নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাসবশত বাথরুমের আয়নায় একটু চিরুনি চালিয়ে আকপাল বিস্তৃত টাকের সামান্য অঙ্গসজ্জা করতে গিয়ে দেখলেন ভেতর থেকে বন্ধ।
এর পরের ঘটনা মুদ্রিত অক্ষরে বিস্তৃত করা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়বে। বরং মত্ত জয়দেবের চিড়িয়াখানায় রাত সাড়ে তিনটেয় প্রবেশ করার গল্পটা অনেক নিরাপদ।
খিদিরপুর খালের চারপাশে আরব্য রজনীর পৃথিবী, সেখানে খারাপ-ভাল, সস্তা-দামি এমন কোনও সাকি ও সুরা জগৎসংসারে নেই যা পাওয়া যায় না।
সুখের কথা জয়দেবের সাকিঘটিত দুর্বলতা কস্মিনকালেও ছিল না, সেই নবযৌবনেও না। তবে এবং সেই জন্যেই বোধহয় পরের দ্রব্যটি অর্থাৎ সুরার প্রতি তার টান ছিল অদম্য এবং মাত্রাতিরিক্ত।
সে যা হোক, সেই সময়ে চিড়িয়াখানার উত্তরদিকের গেটের সামনেই মানে খিদিরপুরের খালধারে শতাব্দী প্রাচীন গোরু-মোষের আন্তর্জাতিক হাট। আন্তর্জাতিক এই অর্থে যে যদিও তখনও বাংলাদেশ হয়নি, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের চোরাচালানি গোরুবাছুর, ভায়া দ্বারভাঙ্গা নেপালের মোষ, ভায়া কালিম্পং তিব্বতের চমরি ছাগল ইত্যাদি মাংসল জন্তু সেই সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানি উট এবং মূলতানি রামছাগল পর্যন্ত এই সমস্ত জন্তুর মেলা বসত সপ্তাহে একদিন।
হাটটা বসত সপ্তাহের মাঝামাঝি। সজ্ঞানে কখনও জয়দেব মনে করতে পারত না মঙ্গলবার নাকি বুধবার, একেক সময় ভাবত নিশ্চয়ই শুক্রবার হবে, বেস্পতিবার বা সোমবার হতেই আপত্তি কী!
কিন্তু এসব চিন্তা ও প্রশ্ন সাদা চোখে। পেটে দু-চার পাত্র পড়ার পরে জয়দেব অন্য মানুষ, যাকে বলে ত্রিকালজ্ঞ। তখন আর বার-তারিখ, তিথি-নক্ষত্র এগুলোর জন্যে অপেক্ষা করতে হয় না জয়দেবের, সে রক্তের স্পন্দনে টের পায় আজ অমুক জায়গায় দরজা খোলা, অমুক জায়গায় লেটনাইট পার্টি।
এই গোহাটার যে হাটবাবু অর্থাৎ সরকারি খাজনা আদায়কারী ছিল, তার সঙ্গে জয়দেবের আলাপ হয়েছিল ওয়েলেসলি স্ট্রিটের কুখ্যাত দিশি পানশালা খালাসিটোলায়। লোকটির নাম ছিল খুব কাব্যময়–হৃদয় বৈরাগী।
পানশালায় আলাপ, আলাপ থেকে গভীর বন্ধুত্ব। প্রায় প্রতি হাটবারে রাত দশটার পরে হাটের ভিতরে চিড়িয়াখানার দেয়াল ঘেঁষে আসর বসাত বৈরাগী। হই হই কাণ্ড। রাজস্থানি উটওয়ালা, দিনাজপুরি গোরুর পাইকার, বিহারের ছাগল সম্রাট, জৌনপুরের বলদ শ্ৰেষ্ঠী কেনাবেচা শেষ করে বৈরাগীর আসরে সামিল হত। সেই সঙ্গে এদিক ওদিক, এ প্রান্ত ও প্রান্ত থেকে জয়দেবের মতো আরও দু-চারজন রসিক বন্ধুবান্ধব।
এক বর্ষার শেষরাতে, রাত প্রায় তিনটে সাড়ে তিনটে, ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, পানীয় নিঃশেষিত, আড্ডাধারীরা সবাই ক্লান্ত ও স্তিমিত, এমন সময় রাজস্থানি উটওয়ালা বলল যে সে তার একটা পোষা উট বছরখানেক আগে কলকাতার চিড়িয়াখানায় উপহার দিয়েছে–সেটা এখন কেমন আছে, তার খুবই দেখতে ইচ্ছে করছে।
