একাধিক কারণে এই প্রস্তাবে আপত্তি ছিল মহিমাময়ের। গাঁজার দোকানে আবগারির খাতা লেখা, এত ছোট কাজ সে করে কী করে, পিরোজপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির ছেলে সে। তার ধমনীতে বইছে নীল রক্ত। পিরোজপুরের বিখ্যাত মোক্তার ভুবনময় রায়চৌধুরীর সে পৌত্র। আজ পার্টিশন হয়েছে বলে তাকে পাইস হোটেলে খেতে হচ্ছে। তাই বলে গাঁজার হিসেব লেখা!
ভাগ্য বিপর্যয়ে মানুষ কত কী করে। না হয় গাঁজার খাতাই লিখতে হবে কিন্তু তার জন্যে গাঁজাও খেতে হবে! তা ছাড়া মহিমাময়ের কাছে গাঁজার চেয়েও মারাত্মক হল দুধ। ছোটবেলায় জোর করে বাটি বাটি দুধ তাকে খাওয়ানো হয়েছে। আর সেই পিরোজপুরের ঘন ক্ষীরের মতো দুধ, লালচে আভা তাতে। মিষ্টি স্বাদে ভরা সেই দুধ দিনের পর দিন খেয়ে খেয়ে আর খেয়ে মহিমাময়ের দুধ সম্পর্কে প্রচণ্ড অনীহা।
কিন্তু একটা কিছু করাও তো দরকার।
উত্তরাধিকার সূত্রে ভবানীপুরের একটা প্রাচীন তিনমহলা অট্টালিকার শেষ মহলের অর্ধেক অংশ সে পেয়েছে। তার মানে নীচে দেড়খানা আর ওপরে একখানা ঘর। নীচের সেই দেড়খানা ঘরে বারো টাকা ভাড়ার এক ঘর আদ্যিকালের ভাড়াটে। দোতলার ঘরটায় মাথা গোঁজার কাজ চলছে, কিন্তু ওই একমাত্র বারো টাকা মাসিক আয়ে চালানো অসম্ভব।
অগত্যা বাধ্য হয়েই মহিমাময় গাঁজার দোকানে খাতা লেখার কাজ নিল। তবে গাঁজা দুধ নয়, নগদ টাকার বিনিময়ে। মাসে পনেরো টাকা।
মহিমাময়ের তবু বারো আর পনেরো এই দুই মিলে মাসে সাতাশ টাকা বাঁধা আয়। তার মাসে দরকার অন্তত সত্তর বাহাত্তর টাকা। হোটেল, চা-জলখাবার, খবরের কাগজ, ইলেকট্রিক বিল, যৎসামান্যই হাতখরচ, সব মিলে এর থেকে কমে কিছুতেই হতে চায় না।
থাকার মধ্যে আছে কিছু পুরনো কাসা পিতলের বাসন আর টুকরো-টাকরা কিছু সোনার গয়না। মহিমাময়ের ঠাকুমা রেখে গেছে মহিমাময়ের বউয়ের জন্যে।
কোথায় বউ? কীসের কী? নিজের খাওয়া-পরার সংস্থান নেই, এর মধ্যে বউ আসবে কোথা থেকে?
সুতরাং সেই অবাস্তব সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে, অনাগত বধূর বাসন-কোসন, গয়নাগাঁটি প্রয়োজন অনুসারে বিক্রি করে বা বন্ধক দিয়ে মহিমাময়ের আপাতত চলে যাচ্ছিল।
সে তুলনায় জয়দেবের অবস্থা কিন্তু ভয়াবহ। সে থাকে খায় মামার বাড়িতে। কিন্তু জামাকাপড়ের, ধোপানাপিতের হাতখরচের পয়সা তো চাই।
শুধু এসব নয়, দামি দামি নেশা আরম্ভ করছে জয়দেব। চোলাই, বাংলা, চুল্লু, হাতে পয়সা থাকলে বিলিতি থ্রি এক্স বা ড্রাই জিন। আর ওপরে উঠতে পারলে সাদা ঘোড়া, কালো কুকুর বা মাস্টারমশায় মার্কা আসল বিলাইতি, সোনালি পানীয়।
জয়দেবের অবশ্য এ ব্যাপারে কোনও বাদবিচার নেই। যখন যা হাতের কাছে পেল তাই সই।
এই হাতের কাছে পাওয়ার ব্যাপারটা শুধু পানীয় সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে নয়, পানীয়ের দাম সংগ্রহ করার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
টুকটাক এদিক ওদিক মামার বাড়ির জিনিসপত্র যখন যেটুকু সম্ভব জয়দেব সরিয়ে ফেলে এবং বেচে দেয়। পুরনো জিনিস বেচার ব্যাপারে তার মতো দক্ষ লোক জগৎ-সংসারে কোনও কালে পাওয়া যাবে না।
পুরনো পাপোশ কোথায় ভাল দামে বিক্রি হয়, রোয়া-ওঠা চল্লিশ বছরের ব্যবহৃত পারস্য গালিচা কারা কেনে, বাতিল হয়ে যাওয়া জং-ধরা ডি সি পাখার বাজার কোথায় রমরমা এসব জয়দেবের নখদর্পণে।
এমনকী চিৎপুরের একটা গলিতে পুরনো লেপ, কম্বল, শতরঞ্চি পর্যন্ত যে বিক্রি করা যায়, বউবাজারের পিছনে একটা বিক্রিওলা পুরনো পাথরের থালাবাটি কেনে আর নিমু গোস্বামীর লেনে এক ভট্টাচার্য বুড়ো পুরনো পাঁজি একেকটা চার আনা দামে কেনে এসব ধীরে ধীরে জয়দেব জানতে পেরেছে।
এতদিন পর্যন্ত ভালই চলছিল কিন্তু যখন মামাবাড়ির অ্যালসেশিয়ান কুকুরের তিনটে বাচ্চা জয়দেব হাতিবাগান বাজারে গিয়ে এক রোববার দশ টাকা করে তিনটেকে তিরিশ টাকায় বেচে দিল, তারপর তার পক্ষে আর মামার বাড়িতে থাকা সম্ভব হল না। মামা-মামিরা বা মামাতো ভাইবোনেরা হয়তো এ নিয়ে তেমন কিছু বলত না কিন্তু যে মাদি কুকুরটা এই বাচ্চা তিনটের মা সে ছিল যেমন হিংস্র তেমনি প্রতিহিংসাপরায়ণ। সে কী করে বুঝতে পেরেছিল জয়দেবই তার ছানাগুলিকে সরিয়েছে। বাচ্চাগুলিকে হাতিবাগানে বেচে দিন দুয়েক এদিক ওদিক ফুর্তি করে জয়দেব পরের মঙ্গলবার অনেক রাতে যখন মামাবাড়িতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করল বিউটি নাম্নী সেই সারমেয় জননী মামাবাড়ির দরজা থেকে আধ মাইল রাস্তা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল।
ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত এবং প্রভূত মত্ত অবস্থায় এর পরে সারাজীবন ধরে জয়দেব প্রচুর দৌড়েছে। সেই দীর্ঘ দৌড়যাত্রার হাতেখড়ি হয়েছিল শ্রীমতী বিউটির কাছে।
খাঁটি জার্মান ব্যাভারিয়ান শেফার্ড বংশের গাঢ় নীল রক্ত ছিল শ্রীমতী বিউটির ধমনীতে। সে চট করে কাউকে আক্রমণ করে না, শুধু তাড়া করে যায়। যখন কাছে পায় দাঁত দেখায়, নখ দেখায় কিন্তু ছিঁড়ে ফেলে না, হয়তো একটু আধটু ছোঁয়।
ছুটতে ছুটতে সেদিন জয়দেব তিন-চারবার ধরাশায়ী হয়েছিল, প্রচুর খিদে এবং সুপ্রচুর তৃষ্ণার সেই অভাব তার স্বাভাবিক তুরঙ্গম গতি বার বার ব্যাহত করছিল। কিন্তু শ্রীমতী বিউটি একবারে তাকে বাগে পেয়ে ছিঁড়ে টুকরো করেনি। শুধু উদ্যত নখর, খরশান দন্তরাজি, লেলিহান জিহ্বা ইত্যাদি যথাসাধ্য প্রদর্শন করে জয়দেবের ওঠা এবং পুনরায় দৌড়ান পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে।
