কিন্তু শ্যামাদাসীর ঠেকের চুল্লুর জাত ছিল আলাদা। তার যেমন তেজ, তেমনি ঝঝ। বাইরে থেকে আসত না, শ্যামাদাসীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তার ঠেকে সরাসরি তৈরি হত সেটা। মাতালদের মুখে মুখে তার নামকরণ হয়েছিল শ্যামা চুল্ল। দু গেলাস খাওয়ার পরে জিব জড়িয়ে যেত। আলজিব থির থির করে কঁপত, মাতালেরা আর শ্যামা চুল্লু বলতে পারত না, বলত ছেমাউল্লু।
শ্যামা চুল্লু প্রস্তুত প্রণালী ছিল যথেষ্ট সহজ। এক বালতি কর্পোরেশনের জল, এক টিন মেথিলেটেড স্পিরিট আর কয়েক কেজি কলিচুন। সঙ্গে সম্ভবত নিশাদল বা ওই জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য। প্রতি গেলাসের দাম ছিল আট আনা। সাধারণ গেলাস নয়, আজকাল আর সেরকম পেল্লায় সাইজের মহাভারতীয় কাঁচের গেলাস দেখতে পাওয়া যায় না। মোটা কাঁচের ভারি ওজনের রীতিমতো তিনপোয়া আয়তনের সেই গেলাস শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কেরাই এক হাতে ধরতে পারত। শিশু বালক বা দুর্বল নারী-পুরুষের পক্ষে সে গেলাস দু-হাতে না ধরে উপায় নেই।
এই রকম একটা গেলাসে একটু কেমিক্যাল, একভাগ জল, একভাগ স্পিরিট আর একভাগ চুন–সব একসঙ্গে মেলালে প্রথমে ধোঁয়া বেরোবে, ফিকে নীল রঙের ঝাঝালো ধোঁয়া। তারপরে প্রচুর বুদবুদ এবং সেই সঙ্গে ফেনা আর ফেনা।
বেকুবের ঢালা বিয়ারের ফেনা যেমন কখনও কখনও গেলাস উপচিয়ে পড়ে, এ ফেনাও সেই রকম উপচিয়ে পড়ত, তবে কখনও কখনও নয়, সর্বদাই।
নীল ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার পরে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে তেড়ে তেড়ে উঠে আসত বুদবুদ আর ফেনা। গেলাস উপচিয়ে শ্যামাদাসীর কাঠের পাটাতনের ওপরে হ্যাঁক হ্যাঁক করে পড়ত সেই গলিত বিষাক্ত তরল। সেই পাটাতনের সর্বত্র চাকা চাকা পোড়া দাগে ভরে গিয়েছিল।
প্রতি গেলাস চুল্লু আলাদাভাবে তৈরি করা হত। তারপরে লোহার জালের ছাকনি দিয়ে অন্য একটা গেলাসে ঘঁকা হত। তখন কাদা, ফেনা এসব বাদ দিয়ে প্রায় অর্ধেক গেলাস হত সেই পানীয়। যার দাম ছিল আট আনা। ভুলে গেলে চলবে না তখন এক প্যাকেট চারমিনার সিগারেটের দাম ছিল পুরনো সাত পয়সা, একসঙ্গে বড় দোকান থেকে পাঁচ প্যাকেট নিলে আট আনা।
সন্ধ্যার দিকে যখন চুল্লুর গ্রাহকদের খুব ভিড় বেড়ে যেত, ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যেত, তখন আর ছাকনি দিয়ে হেঁকে নেবার অবসর হত না। তখন গেলাসে গেলাসে সেই জ্বলন্ত পানীয় তুলে দেওয়া হত গ্রাহকদের হাতে, গ্রাহকদের নিজ দায়িত্বে গেলাসের উপরিভাগের ফেনার অংশ এবং নীচে থিতিয়ে পড়া চুনটুকু ফেলে অত্যন্ত কৌশলে মধ্যভাগের পানীয়টুকু গলাধঃকরণ করতে হত।
তিরিশ বছর। ঠিক তিন দশক আগের গল্প এটা।
বড়দিন।
২৫ ডিসেম্বর।
দুই বন্ধু জয়দেব আর মহিমাময় পার্ক স্ট্রিট, চৌরঙ্গি ইত্যাদি নানা অঞ্চলে ঘুরেফিরে রাত প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ গড়িয়াহাটের মোড়ে এসে পৌঁছাল।
দুই বন্ধুরই তখন অল্প বয়েস, বিশের কোঠার নীচের দিকে। যার যেটুকু লেখাপড়ার ব্যাপার ছিল, বেশ কিছুদিন হল সেসব চুকিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন চলছে দুঃসহ বেকারত্বের জীবন।
কিন্তু ঠিক নির্ভেজাল বেকারত্ব নয়।
মহিমাময় ভবানীপুরে গাঁজা পার্কের খুব কাছেই একটা আফিং, ভাং এবং গাঁজার দোকানে প্রতিদিন রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত আবগারির খাতা লেখে।
খুব কঠিন কাজ।
তখন গাঁজা ছিল দু রকমের–গাঁজা আর চরস। সেই সঙ্গে আরও বিক্রি হত ভাং এবং আফিং।
চার রকম মাদকের চারটে রেজিস্টার ছিল। প্রত্যেক খাতায় দৈনিকের কী স্টক, কতটা বিক্রি, দিনের শেষে কত পরিমাণ কী জিনিস রইল। খুব ঝামেলার হিসেব, সামান্য একটু এদিক ওদিক হয়ে গেলে আবগারির দারোগা এসে ধরবে। আর সেই রোগা, শুটকো আবগারি সাব-ইন্সপেক্টরের সে কী ছিল হম্বিতম্বি। তোলা-ভরি-পুরিয়ার হিসেবে লাল পেনসিল দিয়ে সই দেয়ার আগে নগদ দশ টাকা নিত আর কোমরে দড়ি বেঁধে ঘাড়ে ধাক্কা দিতে দিতে নিয়ে যাব এই ধরনের খারাপ শাসানি দিতে থাকত।
সেসবে ভয় পেত না মহিমাময়। আসল অসুবিধে ছিল মাইনে নিয়ে। মহিমাময়ের আগে যে লোকটি খাতা লিখত সে ছিল এক রিটায়ার্ড কেরানি। তার টাকা পয়সার দিকে খুব লোভ ছিল না।
আসলে সে ছিল এক বদ্ধ গেঁজেল।
গাঁজার দোকানদার সেই রিটায়ার্ড কেরানিকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দু-ছিলিম গাঁজা সরবরাহ করত, আর সেই সঙ্গে পাশের মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে এক পোয়া গরম দুধ। গেঁজেলদের দুগ্ধ একান্ত আবশ্যক। কিন্তু এত দুধ খেয়েও কিন্তু সেই আগের ভদ্রলোক শেষরক্ষা করতে পারেননি। একদিন সন্ধ্যায় গাঁজার কলকেতে মুখ দিয়ে একটা চো চো টান দিতেই চোখ উলটিয়ে পড়ে যান, তারপর আর জ্ঞান ফেরেনি। দিনকয়েক পরে দেহত্যাগ করেন।
মহিমাময় তখন দুবেলা ভাত খেত যতীন দাস পার্কের কাছে ভবসিন্ধু পাইস হোটেলে। সেখানে ওই গাঁজার দোকানের এক কর্মচারিও খেতে আসত। তার সঙ্গে সামান্য মুখ-পরিচয় ছিল মহিমাময়ের।
কী যেন নাম ছিল সেই লোকটার, রসিকলাল, বোধহয় রসিকলই হবে। সেই রসিকলালই খাতা লেখার প্রস্তাবটা দেয় মহিমাময়কে। দৈনিক সন্ধ্যাবেলা আধঘণ্টাখানেক মাত্র কাজ, আগের লোককে বিনিময়ে মাগনা গাঁজা আর দুধ দেওয়া হত।
রসিকলাল পরামর্শ দিল সন্ধ্যাবেলা কয়েক ছিলিম গাঁজা আর একটু দুধ খেলে রাতের মিলের খরচা বেঁচে যাবে, কোনও খাবার খেতে হবে না। হোটেলে শুধু দিনে একবেলা খেলেই হবে, তাতে মাসে অন্তত পনেরো-ষোলো টাকা বাঁচবে, সেটাই বা কম কী!
