হরিনাথবাবু করুণ কণ্ঠে বললেন, ওগো, তুমি মোটেই বুঝতে পারছ না। আমি এত রাত পর্যন্ত জেগে রয়েছি আমার চোখ লাল হবে না? তোমার চোখও তো দেখি লাল হয়েছে।
সত্যি তাঁর নিজের চোখ লাল হয়েছে কিনা এবং যদি লাল হয়েই থাকে তবে তার কতটা ক্রোধে ও উত্তেজনায় এবং কতটাই বা রাত্রি জাগরণে সে প্রশ্নের মধ্যে প্রবেশ না করে কোনও জটিলতা সৃষ্টি না করে হরিমতী দেবী এবার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাকে এরকম এলোমেলো দেখাচ্ছে কেন? তোমার পা টলছে কেন?
নিষ্ঠুরা স্ত্রীর এ হেন কঠিন প্রশ্ন শুনে এবার কপালে করাঘাত করলেন হরিনাথবাবু। ইতিমধ্যে তার নেশা প্রায় সম্পূর্ণ অন্তর্হিত হয়েছে। বেশ গোলাপি একটা নেশা হয়েছিল, সেটা কেটে যাওয়ায় কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটু খারাপই লাগছিল এখন হরিনাথবাবুর।
তাঁর বারবার ইচ্ছে হচ্ছিল বউকে তেড়ে যান, পরিষ্কার বলে দেন, নেশা করে এসেছি, বেশ করেছি, তার তোর কীরে মাগী। বেশি গোলমাল করবি তো এরপরে আর আসবই না।হরিমতাঁকে চুলের মুটি ধরে গোটা কয়েক থাপ্পড় ভাল করে তার গালে কষিয়ে কিছুক্ষণ আগের বঁটা প্রহারের উপযুক্ত প্রতিশোধ নেওয়ার একটা অদম্য ইচ্ছা হরিনাথের মনের গোপনে উঁকি দিচ্ছিল।
কিন্তু হরিনাথের এরকম সাহস নেই। তাঁর তিরিশ বছরের দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে এ ধরনের সাহস প্রদর্শনের কোনও চেষ্টাই কখনওই তিনি করেননি। আজও হরিনাথবাবু সেরকম কোনও চেষ্টার ধারকাছ দিয়ে গেলেন না।
বরং কপালে করাঘাত করে বললেন, কী বললে, গিন্নি? আমাকে এরকম এলোমেলো দেখাচ্ছে কেন, আমার পা টলছে কেন?
অতঃপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে হরিনাথবাবু বললেন, তুমি বুঝতে পারছ না। রাত কাবার হতে চলেছে, আর সেই দুপুর থেকে কিছু খাইনি। চোদ্দো ঘণ্টা পেটে একটা দানা পড়েনি। আমার পা টলবে না তো কার পা টলবে গিন্নি? আমাকে এলোমেলো দেখাবে না তো কাকে এলোমেলো দেখাবে গিন্নি? তুমি কি ভাবো আমি মানুষ নই?
হরিনাথবাবু এরপর একটু দম নিয়ে আর একটি উদগত দীর্ঘনিশ্বাস চাপা দিয়ে প্রায় বিলাসের সুরে বললেন, আমার কি রক্ত-মাংসের শরীর নয়?
কিন্তু ভবি এত সহজে ভুলবার নয়।
শ্রীযুক্তা হরিমতীদেবী এ জীবনে শ্রীযুক্ত হরিনাথবাবুর এতাদৃশ অভিনয় বহুবার দেখেছেন। তিনি এত সহজে ছেড়ে দেবার পাত্রী নন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বার দুয়েক নাক কুঁচকে হরিনাথবাবুর দেহনিঃসৃত কটু গন্ধ শুকে হরিমতী বললেন, কিন্তু তোমার মুখ দিয়ে তোমার সারা শরীর দিয়ে এত খারাপ গন্ধ বেরচ্ছে কেন?
এরপরে আর সহ্য করতে পারলেন না শ্রীযুক্ত হরিনাথবাবু। এ বয়সে ডুকরে কেঁদে ওঠা অস্বাভাবিক ব্যাপার, তা না করলেও বুক চাপড়ালেন হরিনাথবাবু, তারপর বললেন, হরিমতী, তুমি কিছু বুঝতে পারছ না। বারো ঘণ্টা হাসপাতালে ছিলাম। আমার গায়ে, মুখে, জামায় জুতোয় এসব হাসপাতালের গন্ধ।
অতঃপর আজকের দাম্পত্য মামলায় জয়ী হলেন হরিনাথবাবু।
কিঞ্চিৎ অনুতপ্তা, (ঝাটামারা, কটুক্তি ইত্যাদির জন্যে), হরিমতীদেবী উনুনে ভাত-টাত গরম করে হরিনাথবাবুকে খাওয়াতে বসলেন।
ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে চালকুমড়োর চচ্চড়ি চিবোচ্ছিলেন হরিনাথবাবু, আরেক হাতা গরম ভাত ঢেলে দিতে দিতে হরিমতীদেবী বললেন, তোমার যে বন্ধুকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলে আমি কি তাকে চিনি? কি নাম তার?
পরিতৃপ্তভাবে ইলিশ মাছের একটা কানকো চিবোতে চিবোতে হরিনাথবাবু বললেন, দেখো গিন্নি, ওর শরীরটা এতই খারাপ, ও এতই অসুস্থ যে ওকে আর জিজ্ঞেস করে উঠতে পারিনি ওর নামটা কী?
হরিনাথবাবুর ভাগ্য ভাল। ঠিক এই মুহূর্তে লোডশেডিং হয়ে গেল। অন্ধকারে উঠোন থেকে হরিমতীদেবী হরিনাথবাবুর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া বঁটাটা কুড়িয়ে আনতে গিয়ে চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন।
নিশ্চিন্ত চিত্তে অন্ধকারে ইলিশ মাছের কাটা চিবোতে লাগলেন হরিনাথবাবু।
হাতে খড়ি
পুরনো গড়িয়াহাট বাজারের ভিতরে যেখানে আলুর আড়ত ছিল তারই একেবারে পিছনদিকে ছিল শ্যামাদাসীর ঠেক। ঠেক মানে একটা বে-আইনি চুল্লুর দোকান। এ দোকানের কোনও দরজাকপাট ছিল না।
সারা দিনরাতই খোলা। সারা দিনরাতই জমজমাট। গড়িয়াহাট মোড়ের এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে চারপাশে দিনরাতে যত মাতাল দেখা যেত তার আধাআধি এই ঠেক থেকে বেরুত।
গল্পের মধ্যে যাওয়ার আগে শ্যামাদাসী ও তার চুল্লুর একটু বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন।
এ প্রায় তিরিশ বছর আগেকার কথা। শ্যামাদাসীর বয়েস তখন পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবে। শক্ত পাকাটে চেহারা। গায়ের রং কালো কুচকুচে, সাদা ঝকঝকে দাঁত। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার এক গ্রাম থেকে সবজি বেচতে এসে সে কী করে চুল্লুর ঠেকওয়ালি হয়েছিল তার ইতিহাস উদ্ধার করা আর মহেঞ্জোদারোর শিলালিপি পাঠ করা প্রায় একই রকম কঠিন।
গাছকোমর করে কালো ফিতে-পাড় সাদা শাড়ি পড়ত শ্যামাদাসী, সম্ভবত সে ছিল বালবিধবা। দুর্দান্ত পরাক্রম ছিল তার, তার আদেশে চোরে-পুলিশে এক গেলাসে চুল্লু খেত।
চুল্লু নামে যে কুটির-শিল্পজাত বঙ্গীয় পানীয় নানা জায়গায় বিক্রি হয় সেটা একেক ঠেকে একেক রকম। কোথাও সেটা নেহাত দিশি চোলাই, সাইকেলের টিউবে বা ফুটবলের ব্লাডারে কোনও ঘাঁটি থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
