সেই থেকে জগাখিচুড়ি। জগাখিচুড়ি নাকি ছিল অতি উপাদেয়। গয়ারাম আরও বলেছিলেন যে ওই জগা ছিল সাধুপুরুষ, নিজের মৃত্যুর কথা সে বুঝতে পারে। সেদিন রাতে জগাখিচুড়ি বেঁধে সবাইকে খাইয়ে সে মন্দিরের সামনে কাঠের তলোয়ার নিয়ে একা একা লড়াই শুরু করে আর গলা খুলে গান গাইতে থাকে–
যম জিনিতে যায় রে জগা
যম জিনিতে যায়।
সেই রাতেই জগা মৃত্যুবরণ করে।
জগাখিচুড়ির কাহিনি শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন হরেনবাবু। সামান্য একটা চালু কথার পিছনে কত বড় গল্প। সেই থেকে তার আরও ঝোঁক বেড়ে গেছে সব গোলমেলে শব্দের মর্মার্থ জানার।
অবশ্য ন্যালাখ্যাপা শব্দটা এরপর প্রায় ঘাড়ের থেকে নামিয়ে দিয়েছেন হরেনবাবু। ধরে নিয়েছেন ওটাও ওই জগাখিচুড়ির মতো ন্যালা নামে কোনও খ্যাপার ব্যাপার।
কিন্তু এখন হন্তদন্ত ঘাড়ে ভূতের মতন চেপেছে। হরেনবাবু কলাখোঁপা ইস্কুলে গিয়ে সুবল চন্দ্র মিত্রের বাঙ্গালা অভিধান খুঁজে এসেছেন। সেখানে হন্তদন্ত নেই। ভুতোবাবুর কাছে জিজ্ঞাসা করেও কোনও লাভ নেই। তা ছাড়া আগেই বলেছি, তার ওপরে এখন আর হরেনবাবুর বিশ্বাসই নেই। অবশ্য কবি মোজাম্মেল হককে গিয়ে ধরা যেতে পারে। কিন্তু হয়তো দেখা যাবে, সে ছোকরাও কিছু জানে না। তার কবিতাগুলোর প্রুফ দেখার সময়েই হরেনবাবুর মনে হয়েছিল এই ব্যক্তি অনেক কিছু না বুঝে অনুমানে লিখেছে।
দিশেহারা হয়ে গেছেন হরেনবাবু। এই অবস্থায় একদিন অন্যমনস্কভাবে পথ চলতে গিয়ে একটা ইটে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন হরেনবাবু। পথের লোকজন তাকে টেনে তুলে পাশের ডাক্তারখানায় নিয়ে গেল।
পাড়ার মধ্যেই, ডাক্তারবাবু চেনা। তিনি ভাল করে দেখলেন। সামনের একটা দাঁত ভেঙে গেছে, আর ঠোঁটটা একটু কেটে গেছে। ওষুধপত্র দেওয়া হল।
ডাক্তারবাবু বললেন, আমি আপনাকে মাঝেমধ্যেই দেখি, রাস্তা দিয়ে এমন অন্যমনস্ক চলাফেরা করেন। সর্বক্ষণ এত কী ভাবেন মশায়?
ভাঙা দাঁতের গোড়ায় জিব বুলিয়ে হরেনবাবু বললেন, একটা শব্দের মানে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।
ডাক্তারবাবু বললেন, শব্দের মানে নিয়ে চিন্তা? কী সে শব্দ?
হরেনবাবু বললেন, হন্তদন্ত।
ডাক্তারবাবু বললেন, এই শব্দ নিয়ে এত মাথাব্যথা? আপনি নিজেই এখন হন্ত দন্ত। হন্ত মানে হত, দন্ত মানে দাঁত, পুরো মানে আপনার দাঁত হত হয়েছে।
হরেনবাবু অবাক। ডাক্তারবাবু কত সহজে শব্দটার মানে ধরতে পেরেছেন। ফাটা ঠোঁট আর ভাঙা দাঁতের দুঃখ ভুলে নিশ্চিন্ত মনে তিনি বাড়ি রওনা হলেন।
হরিনাথ ও হরিমতী
এক ভদ্রলোক প্রায় প্রতিদিনই অফিস থেকে সরাসরি বাড়ি না ফিরে এদিক ওদিকে অফিসের তাসের আড্ডায়, গলির মোড়ের চায়ের দোকানে, বেপাড়ার ক্লাবে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে তারপর আসতেন। এই খারাপ অভ্যেসটা তার রক্তের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল এবং কোনওদিনই সন্ধ্যেবেলায় তাকে বাড়িতে পাওয়া যেত না। তাঁর বাড়ি ফিরতে রাত দশটা সাড়ে দশটা হয়ে যেত।
গল্পের খাতিরে ভদ্রলোকের একটা নাম দিতে হবে। ধরে নেওয়া যাক, ভদ্রলোকের নাম হরিনাথবাবু।
হরিনাথবাবুর এই নৈশ আড্ডার ব্যাপারটা আর দশজন সাধারণ ঘরণীর মতোই হরিনাথবাবুর স্ত্রী শ্ৰীমতী হরিমতী দেবীর মোটেই পছন্দের নয়। রাত জেগে তিরিশ বছর ধরে স্বামীর ভাত বেড়ে অপেক্ষা করতে করতে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। তবু কিঞ্চিৎ চেঁচামিচি করে তিনি স্বামীকে ছেড়ে দিতেন। অবশেষে বোধহয় হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন। খুব প্রয়োজন না হলে গালাগাল করেই ছেড়ে দিতেন। কিন্তু ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করল একদিন রাতে। হিসেব মতো তখন রাত নয়, রাতগত দিন প্রায় সাড়ে বারোটা-একটা হবে।
হরিনাথবাবু আজ কোথায় গিয়েছিলেন কে জানে? অধিকাংশ দিন সাদাসিধে ভাবেই বাড়ি ফেরেন, আজ একটু নেশা করে বাড়ি এসেছেন। মুখে ম-ম করছে আরকের গন্ধ। চোখ ঠিক জবাফুলের মতো না হলেও বেশ লাল, তা ছাড়া পা টলছে, ঠোঁটে গুনগুনানি গান।
এতক্ষণ দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে ছিলেন হরিমতী দেবী। বিছানায় জেগে বসে ঢুলছিলেন খাটের বাজু ধরে আর মাঝেমধ্যে ভাবছিলেন পাড়া-প্রতিবেশীকে জানাবেন কি না। একই মেয়ে। তারও বিয়ে হয়ে গেছে, নিজের বাড়িতে তো আর কেউ নেই।
কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীকে, খবর দিলে এখন কী কেলেঙ্কারিই না হত।
এই মধ্যরাত পেরিয়ে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় টালমাটাল স্বামীকে দেখে হরিমতী দেবীর মাথায় রক্ত উঠে গেল। জীবনে কখনও যা করেননি আজ এই প্রৌঢ় বয়সে তাই করলেন। ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে নারকেল কাঠির মুড়ো বঁটাটা এনে মনের দুঃখে স্বামীকে দু ঘা কষালেন তিনি।
নিগৃহীত হতেই কিঞ্চিৎ সম্বিত ফিরে এল হরিনাথবাবুর। তিনি দুহাত দিয়ে জাপটে গৃহিণীর হাত থেকে বঁটাটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, ওগো তুমি আমাকে বিনা কারণে আঁটা দিয়ে মারছ। আমার কথাটা আগে শোনো।
ঝাটা মারার পরিশ্রমে হাঁফাতে হাঁফাতে হরিমতী দেবী বললেন, কী কথা?
হরিনাথবাবু বললেন, তুমি যা ভাবছ তা নয়। আমি কোনও খারাপ কাজ করিনি। খারাপ জায়গায় যাইনি। আমি হাসপাতালে এক মরণাপন্ন বন্ধুর শয্যার পাশে বসেছিলাম।
এই কথা শুনে হরিমতী দেবী আরও খেপে গেলেন। চিৎকার করে বললেন, তাই যদি হবে তোমার চোখ তবে এত লাল কেন?
