হরেনবাবু বলেন, না, কপিতে কোনও গোলমাল নেই। কপি চমৎকার, কিন্তু ওই যে বনবিহারী লিখেছেন, …ভুবন চক্রবর্তী মানুষটি একটু ন্যালাখ্যাপা গোছের। …তা এই ন্যালাখ্যাপা কথাটার মানে কী?
ভুতোবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, ডিকশনারি দেখেছেন? সেখানে নেই?
হরেনবাবু বললেন, তা একটু আছে। কিন্তু শব্দটা এল কোথা থেকে?
বিরক্ত হয়ে ভুতোবাবু বললেন, তা যেখান থেকেই আসুক। বনবিহারীবাবু বড় লেখক, তিনি যখন শব্দটা ব্যবহার করেছেন। আপনি প্রুফ দেখে ছেড়ে দিন।
হরেনবাবুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, এ কী বলছেন আপনি? আপনি একটা বই ছাপছেন, সেই বইয়ে এমন একটা শব্দ আছে, যেটা কোথা থেকে এসেছে। আপনি কিছু জানেন না। এ হয় নাকি?
মধ্যরাতে আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে! আপাতত হরেনবাবুকে এড়ানোর জন্যে ভুতোবাবু বললেন, ঠিক আছে, আমি দু-একদিনের মধ্যে বনবিহারীবাবুর কাছ থেকে জেনে এসে আপনাকে বলব।
প্রশ্নটা শুনে বনবিহারীবাবু হো হো করে হেসে উঠেছিলেন। প্রবীণ প্রতিষ্ঠিত লেখক, ভুতোবাবু তাকে আর ঘাঁটাতে সাহস পাননি। পাড়ায় এসে হরেনবাবুকে বলেছিলেন, বনবিহারীবাবুর আন্ত্রিক হয়েছে, নার্সিংহোমে আছেন। তাই জিজ্ঞাসা করা হয়নি।
হরেনবাবু বললেন, খবরের কাগজে যে দেখলাম বনবিহারীবাবু ভবানীপুর হিতসাধিনী সভার শতবর্ষ উৎসবে কালকেই সভাপতি হয়েছেন।
কোনওরকমে আমতা আমতা করে ভুতোবাবু বললেন, তারপরেই তো ঘটনাটা ঘটল। হিতসাধিনী সভার শেষে ওখানেই চা-সিঙাড়া-জিলিপি দিয়ে জলযোগ করেছিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বমি, পেট ব্যথা। তারপরে ওই ভবানীপুরেই নার্সিংহোমে তাকে ভর্তি করা হয়।
হরেনবাবু কী বুঝলেন কে জানে! ওই ন্যালাখ্যাপা শব্দ নিয়ে তিনি আর ভুতোবাবুকে জ্বালাতন করেননি। সমস্যাসংকুল ন্যালাখ্যাপা শব্দটি তিনি তার ব্ল্যাকবোর্ডে তুলে দিয়েছেন।
এই ব্ল্যাকবোর্ডটির একটি ব্যাপার আছে। শিক্ষকতা থেকে স্বেচ্ছা-অবসরের পর ফেয়ারওয়েলের সময় তিনি ছাত্র বা শিক্ষকদের তরফ থেকে কোনও উপহার না নিয়ে বিদ্যালয়ের একটি পুরনো ব্ল্যাকবোর্ড চেয়ে নেন।
তারপর সেই ব্ল্যাকবোর্ডটির নামকরণ করেন সমস্যা। যেসব শব্দ নিয়ে সমস্যা হবে, সেগুলোর কোনও সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এখানেই লেখা থাকবে, যাতে সমস্যাটি সব সময়ে চোখের সামনে থাকে।
আজ সপ্তাহ চারেক ন্যালাখ্যাপা শব্দটি ব্ল্যাকবোর্ড আলো করে রয়েছে। এরই মধ্যে গতকাল আবার হন্তদন্ত যোগ হয়েছে।
তরুণ কবি মোজাম্মেল হকের নতুন কাব্যগ্রন্থটির নাম হন্তদন্ত। নাম কবিতাটিও হন্তদন্ত। বইটি ভুতোবাবুই প্রকাশ করছেন।
নাম কবিতাটি এইভাবে আরম্ভ হয়েছে,
হসন্তগুলি কোথায় পালালো
হন্তদন্ত তদন্ত করা ভালো।
বইয়ের নাম, কবিতার নাম, তার ওপরে প্রথম কবিতার দ্বিতীয় পংক্তিতে আবার হন্তদন্ত, সব মিলে হরেনবাবুকে বিপর্যস্ত করে দিল।
ন্যালাখ্যাপার সমস্যা না মেটার আগেই তিনি অন্য কোনও সমস্যায় জড়িত হতে চাইছিলেন না। কিন্তু উপায় নেই হন্তদন্ত তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। সঙ্গে অনেক প্রশ্নও দেখা দিচ্ছে।
লোকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। এসে বলে, আজ ব্যাপারটার একটা হন্তদন্ত করতে চাই। কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে হরেনবাবু ভাবেন, এই দুই হন্তদন্তের মানে তো এক হতে পারে না।
আর শেষ পর্যন্ত মানে যাই হোক, হন্তদন্ত কথাটা তৈরি হল কী করে? মনের গভীরে প্রশ্নের বুদ্বুদ উঠছে তো উঠছেই, শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে হরেনবাবু ন্যাল্যাখ্যাপার নীচে লিখলেন হন্তদন্ত।
ইচ্ছে করলে এখনই তিনি ভুতোবাবুকে গিয়ে ধরতে পারেন, কবি মোজাম্মেলের কাছ থেকে জেনে আসার জন্যে হন্তদন্তের ব্যাপারটা। কিন্তু তার ওপরে হরেনবাবুর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু ন্যালাখ্যাপা নয়, তারপরেও অর্ধচন্দ্র, হড়িকাঠ এবং গোঁফ-খেজুরে নিয়ে ভুতোবাবু রীতিমতো বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
তবে এগুলো সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারেনি। কলাখোঁপা ইস্কুলে গিয়ে পেনশনের তাগাদা দেয়ার সময়ে স্কুল লাইব্রেরি থেকে পুরনো আমলের অতিকায় বাংলা অভিধান থেকে এগুলোর অর্থ ও ব্যুৎপত্তি পেয়ে গেছেন এবং সন্তুষ্ট হয়েছেন।
কয়েকদিন আগে জগাখিচুড়ির পাল্লায় পড়েন হরেনবাবু। অথচ জগাখিচুড়ির ব্যাপারটা খুব সহজে সমাধান হয়েছিল।
জগাখিচুড়ি হাসির গল্পের পাঁচ নম্বর লেখক গয়ারাম দাসের আশু প্রকাশিতব্য গল্প সংকলন। হাসির গল্পের লেখকদের নম্বর ফুটবলের নম্বরের মতো। যত বড় লেখা তত বেশি নম্বর, পাঁচ হল সবচেয়ে বড় নম্বর।
জগাখিচুড়ি বইটার প্রুফ হাতে পেয়ে গয়ারামবাবুকে পাড়ার বুথ থেকে ফোন করেছিলেন হরেনবাবু। গয়ারাম তার পুরনো বন্ধু, এক সময়ে কলাখোঁপা ইস্কুলে তিনি ড্রিল মাস্টার ছিলেন। সেই সঙ্গে সংস্কৃতের সেকেন্ড পণ্ডিত। সংস্কৃত উঠে গেল, ড্রিল উঠে গেল! গয়ারাম মনের দুঃখে মাস্টারি ছেড়ে হাসির গল্প লিখতে লাগলেন।
গয়ারামের সঙ্গে হরেনবাবুর বন্ধুত্ব আজও ছিন্ন হয়নি। গত বছরই গয়ারামের মেয়ের বিয়েতে তিনি নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছেন। গয়ারামকে ফোন করা মাত্র তিনি হরেনবাবুকে জগাখিচুড়ির বৃত্তান্ত সংক্ষিপ্ত করে ফোনেই শোনালেন।
জগা নামে এক পাগল থাকত কালীঘাট মন্দিরের চত্বরে। তার হাবভাব পাগলদের মধ্যেও ছিল অতি অস্বাভাবিক। কোমরে খুপরির তলোয়ার, হাতে বাঁশের তির ধনুক, কপালে কাঁঠালপাতার মুকুট–সে সবসময় বীর রাজার বেশে থাকত। প্রত্যেকদিন সন্ধ্যাবেলা কালীঘাট বাজারের সবজি আর মুদি দোকানিদের কাছ থেকে অল্প করে সবজি-চাল-ডাল-নুন-মশলা চেয়ে নিত। ভাল খারাপ নানারকম চাল, মুগ-মসুর-ছোলা সব রকম ডাল, কচু থেকে কাঁচকলা, ফাটা আলু, শুকনো বেগুন যে যা দিত–তাই জগা নিয়ে ঝুলিতে ভরত। তারপর রাতে ইটের উনুনে বিরাট মাটির হাঁড়িতে সব মিলিয়ে খিচুড়ি রান্না হত। সেই খিচুড়ি মন্দিরের সব ভিখিরির সঙ্গে ভাল করে জগা খেত।
