–ও কী, ও কী হয়েছে আপনার আঙুলে? ওর হাতের দিকে তাকিয়ে বিছানা থেকে ছিটকে দাঁড়িয়ে পড়ে অমলা।
-হাতুড়ি! আর কিছু বেরুল না গুরুপদর গলা দিয়ে। অতি তীব্র একটি দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে চোখও বন্ধ করে ফেলল। নীল শাড়ির খানিকটা ছিঁড়ে ফেলেছে অমলা, তুলো, ডেটল ২০৪
আনিয়েছে চাকরটাকে দিয়ে। কোমল, নরম একটা স্পর্শে গুরুপদ চোখ খুলে দেখল হালকা এক টুকরো নীল আকাশকেই যেন ডান হাতে পেয়ে গেছে সে।
–চলুন আপনার ঘরে চলুন। ইস, একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড করে ফেলেছেন!
গুরুপদর ঘরে এসে অমলা অবাক।
–এ কী কাণ্ড, দরজা ভাঙা, ঘরময়
–মানে ওই চাবিটা পাচ্ছিলাম না কিনা, তাই…কাতর কণ্ঠে আরও কী বলতে যাচ্ছিল, অমলার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল। নীল শাড়ির মধ্যে হঠাৎ অমলার মুখটা কেমন লাল হয়ে উঠল, মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে গুরুপদকে প্রায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়া গলায় বলল অমলা।
–আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। সত্যি ভীষণ অন্যায়…মানে আজ সকালে বেরুনোর সময় আপনি দরজায় তালা দিতে ভুলে গিয়েছিলেন, চাবিটা
গুরুপদ স্পষ্ট দেখতে পেল, ধীরে ধীরে কাধ থেকে নীল শাড়ির ভেঁড়া আঁচলটা টেনে তার চাবিটা খুলে দিচ্ছে অমলা।
গুরুপদর প্রবল ইচ্ছে হল চিৎকার করে বাধা দেয় অমলাকে, কিন্তু অমলাই শেষ পর্যন্ত আর খুলল না।
–থাক আমার কাছেই থাক, আপনি তো আর এক হাতে চাবি দিতে পারবেন না।
ঘুমোতে ঘুমোতে গুরুপদ সেদিন একটা হাজারদুয়ারি বাড়ির স্বপ্ন দেখেছিল।
হন্তদন্ত
সমস্যার পর সমস্যা।
অস্থির হয়ে পড়েছেন হরেন মিত্র। এতই অস্থির হয়েছেন তিনি যে একেক সময় আশঙ্কাষিত বোধ করছেন, পাগল না হয়ে যাই।
না, এখনও পাগল হয়ে যাননি তিনি। কিন্তু এত সমস্যার ধাক্কা সামলানো সহজ নয়।
বিপদ আর সমস্যা কখনও একা আসে না। এক সমস্যার ঘাড়ে এসে আরেক সমস্যা চেপে বসে। ঘরের দেয়ালের দিকে তাকালেন হরেনবাবু, সেখানে ইস্কুলের একটা বাতিল ব্ল্যাকবোর্ড টাঙানো আছে। সেখানে এখনও ঝকঝকে অক্ষরে লেখা আছে ন্যালাখ্যাপা, সেই ন্যালাখ্যাপার সমস্যা না মিটতেই এখন ঘাড়ে এসে পড়েছে হন্তদন্ত
হরেনবাবুর বর্তমান বৃত্তান্ত আরম্ভ করার আগে হরেন মিত্র লোকটির ইতিহাস একটু বলে নিই।
হরেন মিত্র সম্পর্কে লোকটি বলা অবশ্য সঠিক হল না। হরেনবাবু কিছুদিন আগেও কলাখোঁপা রামসুন্দর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বাড়ির অবস্থা খারাপ নয়। বাগুইহাটিতে পৈতৃক বাড়িতে থাকেন। পঞ্চাশের এদিকে বয়েস, বিয়ে করেননি। সংসার চালাবার দায় বা ঝামেলা নেই। এই বাড়িতেই তাঁর দুই ভাইপো থাকে। তাদের আলাদা আলাদা হেঁসেল, বিয়ের পর বউদের মধ্যে সদা সর্বদা খিটিমিটি লাগায় হরেনবাবুই মধ্যস্থতা করে তাদের ভিন্ন করে দিয়েছেন। এতে অবশ্য পরবর্তীকালে হরেনবাবুরই সুবিধে হয়েছে। দুই ভাইপোর হেঁসেলে এক মাস এক মাস করে অন্নগ্রহণ করেন, বিনিময়ে তাদের কিছু অর্থ সাহায্য করেন।
শিক্ষক জীবনে হরেনবাবু অত্যন্ত মারকুটে ছিলেন। ছাত্রদের বেধড়ক পেটাতেন। শুধু তাই নয়। এক তরুণ শিক্ষক কাজে নতুন যোগদান করেছিলেন। টি শার্ট এবং জিনস পরা সেই শিক্ষকটি ক্লাসে ঢোকার মুখে, জীবনে প্রথম ক্লাস নেওয়া তাই একটি সিগারেট টেনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনোবল সংগ্রহ করছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই নতুন শিক্ষককে হরেনবাবু আগে দেখেননি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধূমপানরত অবস্থায় তাকে দেখে ছাত্ৰভ্রমে হরেনবাবু তার কান ধরে বারান্দার ওপরে নিল ডাউন করিয়ে দেন।
এই ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে হরেনবাবুকে শিক্ষকতার চাকরিটি মানে মানে ছাড়তে হয়। কিছু প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ছিল, সামান্য পেনশনও পাবেন। তাতে মোটামুটি চলে যাচ্ছে।
তা ছাড়া হরেনবাবু নতুন একটা কাজ জোগাড় করেছেন। তার পাড়ায় কলেজ স্ট্রিটের একজন প্রকাশক আছেন। সেই প্রকাশকের বইগুলোর তিনি প্রুফ দেখে দেন।
প্রুফ দেখা খুব কঠিন কাজ। তবে হরেনবাবু একনিষ্ঠ, পরিশ্রমী এবং বানান সচেতন। তিনি খুব ভাল প্রুফ দেখেন। প্রকাশক মশায়েরও তার ওপর খুবই আস্থা।
কিন্তু এই প্রুফ দেখতে গিয়েই যত বিপদ আর সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
বিপদ প্রকাশক মশায়ের, যিনি পাড়ায় ভুতোবাবু নামে পরিচিত। ভুতোবাবু ছাপোষা মানুষ, বইয়ের ব্যবসা করেন। তবে তিনি তো পণ্ডিত লোক নন। তা ছাড়া খুব পণ্ডিত লোকও হরেনবাবুর কাছে সহজে পার পাবে না।
হরেনবাবুর যেটা সমস্যা, ভুতোবাবুর সেটাই বিপদ। প্রুফ দেখতে দেখতে কথায় কথায়, সময়ে অসময়ে হরেনবাবু ভুতোবাবুর কাছে ছুটে আসেন।
মাসখানেক আগের একটা ঘটনা বলি।
রাত এগারোটা, ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ ঘনঘন কলিংবেলের আওয়াজে জানলার খড়খড়ি তুলে ভুতোবাবু দেখেন সদর দরজায় ছাতা মাথায় হরেনবাবু দাঁড়িয়ে।
তাড়াতাড়ি দরজা খুলে হরেনবাবুকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে ভুতবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার। হরেনবাবু? এই বৃষ্টির মধ্যে, এত রাতে?
হরেনবাবু ভেজা ছাতাটা দরজার একপাশে রাখতে রাখতে বললেন, আপনার বনবিহারীবাবুর উপন্যাসের প্রুফটা দেখতে গিয়ে দারুণ সমস্যায় পড়ে গেছি।
এই অসময়ে কী এমন সমস্যা হল? কপিতে কোনও গোলমাল?–ভুতোবাবু ঘুমচোখে প্রশ্ন করেন।
