পথে নেমেই সামনে একটা ঝালমুড়িওয়ালা। যেন গুরুপদর জন্যেই দাঁড়িয়েছিল। ঝাল বেশি করকে, পেঁয়াজ বেশি করকে আর মুড়ি বেশি করকে–চার আনা কো। গুরুপদ আদেশ দিয়ে একটা গাছের নীচে মাথাটা সূর্যের আক্রমণ বাঁচিয়ে দাঁড়ায়। এটা কলেরা ঋতু। দোকানের ওমলেট পর্যন্ত গুরুপদ খায় না কিন্তু কোনও কোনও সময় মহামারীও তুচ্ছ মনে হয়। গুরুপদর এখন সেই সময়। চার আনার ঝালমুড়ি হাতে করে লালদিঘির ভেতরে গিয়ে বসল গুরুপদ। দাম দেয়ার সময় নোট বের করতে গিয়ে সেই ভদ্রমহিলার দেয়া হারানো-প্রাপ্তির দরখাস্ত ফর্মটা কখন পকেটে রেখে ছিল, সেটা হাতে এসেছিল, তাই হাতে করে গুরুপদ পা ছড়িয়ে বসল। একবার ফর্মটার ওপরে চোখ বুলিয়েই বুঝল, পৃথিবীর আর দশটা ফর্ম পূরণ করার মতোই এ ফর্ম-ও পূরণ করা তার পক্ষে অসম্ভব।
হারানো জিনিস ফিরিয়া পাইবার আবেদনপত্র।
(দ্রব্য প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত ১৯৫৮ সালের XVIIনং আইনের গ ধারা মতে আবেদন করিতে হইবে। আবেদনকারী নাবালক বা উন্মাদ হইলে অভিভাবক (গার্জিয়ান) বা আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে ভারপ্রাপ্ত প্রাধিকারিক কর্তৃক এই আবেদনের যৌক্তিকতা গ্রাহ্য হইবে)।
১। নাম
পূর্বনাম–আপনার পূর্বে কী নাম ছিল? যাঁহারা নিজেদের পূর্বনাম পরিত্যাগ করিয়াছেন, তাঁহাদের প্রতি প্রযোজ্য।
২। পিতার নাম পিতার পূর্বনাম–যাঁহাদের পিতা পূর্বনাম পরিত্যাগ করিয়াছেন তাহাদের প্রতি প্রযোজ্য। পিতা মৃত কি জীবিত? কেন?
৩। ঠিকানা– পূর্ব বাসস্থান বর্তমান বাসস্থান
আপনি কি গত সাত বৎসরের মধ্যে বাসস্থান পরিবর্তন করিয়াছেন, যদি করিয়া থাকেন সমস্ত ক্ষেত্রে বিশদ ঠিকানা দিতে হইবে।
৪। ভারতীয় উন্মাদ আইন অনুসারে আপনাকে কি কখনও উন্মাদ বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছিল? যদি হইয়া থাকে, কেন? ঘোষণাপত্রের তারিখ ও নম্বর।
৫। আপনি কি কখনও কোনও আদালতের বিচারে কারারুদ্ধ হইয়াছিলেন? যদি হইয়া থাকেন, কী অপরাধে, কত দিনের জন্য, কোন জেলে ছিলেন?
৬। (ক) যে জিনিস হারাইয়াছে বলিয়া আপনি ভারতীয় হৃত-অপহৃত দ্রব্য প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইনের ১৭ (ক) ধারামতে এই আবেদন করিতেছেন সেই জিনিসটির বিশেষ বিবরণ :
(এইরূপ ভাবে বর্ণনা করিতে হইবে যে যাহাতে জিনিসটি দেখামাত্র বোঝা যায় এবং কোনও প্রশ্ন না ওঠে।)
(খ) যে জিনিসটি হারাইয়াছে তাহা আপনি ইতিপূর্বে আরও হারাইয়াছেন কি?
(গ) যদি (খ) প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে নিম্নলিখিত ঘরগুলি পূরণ করুনঃ
(অ) কতবার হারাইয়াছেন?
(আ) প্রত্যেক বারই ফেরত পাইয়াছেন কি?
(ই) ইতিপূর্বে যতবার হারাইয়াছেন ততবারই ফেরত পাইয়াছেন কি?
(ঈ) পাইয়া থাকিলে কোথায় পাইয়াছেন?
(উ) কীরূপে পাইয়াছেন?
(ঊ) কখন পাইয়াছেন?
৭। যে জিনিস হারাইয়াছেন তাহার মূল্য কত?
পূর্ব মূল্য কত ছিল? বর্তমান মূল্য আনুমানিক কত?
(যদি দশ টাকার অধিক মূল্যের দ্রব্য হয় তবে ২২ ধারামতে দুই টাকার স্ট্যাম্পসমেত দরখাস্ত করিতে হইবে। প্রকৃত উদ্বাস্তু দরখাস্তকারীদের ক্ষেত্রে রিফিউজি সার্টিফিকেট দৃষ্টে এই স্ট্যাম্প ফি মাফ হইতে পারে। রিফিউজি সার্টিফিকেটের প্রত্যয়ীকৃত নকল দাখিল করিতে হইবে।)
৮…
আট, নয়, দশ এই রকম টানা বাইশ ঘর পূরণ করতে হবে। সাত নম্বর ঘর পর্যন্ত পৌঁছেই গুরুপদর মাথা রিমঝিম করতে লাগল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল পৃথিবীর আর সমস্ত ফর্মের মতোই এ ফর্ম পূরণ করা অসম্ভব। এই ফর্ম যে পূরণ করতে পারে সে হারানো জিনিস ফিরে পায়, নির্ধনের ধন হয়, বেকারের চাকরি হয়, উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন হয়। কিন্তু অসম্ভব, আর দু-এক ঘর পড়লেই গুরুপদ অজ্ঞান হয়ে যেত সে স্পষ্ট বুঝতে পারে।
সুতরাং আর কোনও গত্যন্তর নেই। গুরুপদ একটা ফেরত বাস ধরে বাড়ির দিকে রওনা হয়। কিন্তু বাড়িতে ফিরেই বা কী হবে? যে বাড়ির দরজা বন্ধ আর সেই দরজার চাবি নেই, সে বাড়িতে ফেরাও যা আর পথে পথে পার্কে ময়দানে ঘুরে বেড়ানোও তাই। গুরুপদও তাই করল। রাত্রি প্রায় দশটা পর্যন্ত পথে পথে ঘুরল। একবার ভাবল রাত্রে একটা পার্কে শুয়েই কাটাবে। কিন্তু বাড়িতে তো একসময়, আজ হোক কাল হোক ফিরতেই হবে। একটা তালাচাবিওয়ালা ধরতে পারলে বেশ হত। কিন্তু এত রাত্রে কোথায় পাওয়া যাবে? সেটা সময়মতো খুঁজলে হত। এখন যারা রাত্রে তালা খোলে, যেকোনও দরজার তালা খুলতে পারে, তারা কেউই প্রকাশ্যে খোলে না। আর ব্যর্থ অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে গুরুপদ বাড়ির দিকেই পা চালাল।
গুরুপদর শেষ একটা ক্ষীণ আশা ছিল যে হয়তো গিয়ে দেখবে দরজা বন্ধ করেই সে আদৌ বেরোয়নি। খোলা দরজায় তালা ঝুলছে দেখতে পাবে। কিন্তু দরজা নিতান্তই বন্ধ আর তার তালা ঝুলছে, বেশ ভাল ভাবেই ঝুলছে।
অমলাদের ফ্ল্যাটটার দিকে তাকায় গুরুপদ। আলো জ্বলছে না। এত সকাল সকাল অমলার ঘরের আলো নেভে না কোনও দিন। হয়তো দিদি জামাইবাবুর সঙ্গে সিনেমাই দেখতে গেছে রাত্রের শোতে। তাহলে পাশের বাড়িটা থেকেই হাতুড়িটা চাইতে হয়। হাতুড়িটা চেয়ে আনল। কিন্তু পুরনো। আমলের লোহার তালা অত সহজে ভাঙা সম্ভব নয়। লোহার তালাটাকে ঈশ্বরের মতন, বা প্রায় খোদাতালার মতোই সর্বশক্তিমান মনে হল গুরুপদর। দুমদাম, ঠুকঠাক ক্রমাগত শব্দ হতে লাগল, আশপাশের ফ্ল্যাটবাড়ির লোকেরা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ফেলল, একটা বাচ্চা ছেলের কান্না শোনা গেল। হাঁফাতে হাঁফাতে ঘামে স্নান করতে আরম্ভ করল গুরুপদ। হাতটা ক্রমাগত হাতুড়ি সমেত ওঠানামা করতে করতে ভারী হয়ে আসছে ক্রমশ। শেষ পর্যন্ত ওর মনে হল, হাত আর হাতুড়ির তফাতটা বোধ হয় আর একসময় থাকবেই না। তখন শুধু হাত দিয়েই ঠুকে ঠুকে তালা। খোলা যাবে। হাত আর হাতুড়ির মারাত্মক বিয়োগফলে ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা প্রায় থেঁতলে গেল। অন্ধকারে রক্ত দেখা যায় না, গেলে থেমে যেত গুরুপদ, তালে তালে তালার ওপর হাতুড়ি ঠুকত না আর। গুরুপদ জীবনে এই প্রথম চোরদের জন্যে মমতাবোধ করল এবং একাত্মতাও। চোরেরা কাউকে না জানিয়ে তালা ভাঙে কিন্তু গুরুপদ পাড়াসুদ্ধ লোক জানিয়ে দরজাটাই ভেঙে ফেলল শেষ পর্যন্ত। তালাটা তেমনি ঝুলছে, ডান দিকের দরজার পাল্লা হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতরে বড় আয়নাটা, টেবিল-ল্যাম্প সব চুরমার। তবু ভাল, দরজা ভাঙলে। ওপরের বালব ভাঙে না। সন্তর্পণে আলোটা জ্বালে। আলোটা জ্বালতেই রক্ত দেখল এবং রক্ত দেখেই সটান বিছানায় মাথা ঘুরে শুয়ে পড়ল। খানিক পরেই অমলার গলা শুনল গুরুপদ। কোত্থেকে ফিরল যেন। বুড়ো আঙুলটার জন্যে তুলো আর ন্যাকড়ার প্রয়োজন, অমলার গলা শুনেই যেন অনুভব করে সে। কোনও রকমে বুড়ো আঙুলটা চেপে অমলাদের ফ্ল্যাটের দিকে এগুল গুরুপদ। অমলার ঘরে আলো জ্বলছে। সেদিকে তাকিয়ে থেতলানো আঙুলের ব্যথাটা ও যেন ভুলে। গেল। আবার অমলা নীল শাড়ি পরেছে। খাটের ওপর হাটু মুড়ে বসে বাতাসে গাল পেতে চুল খুলছে। পেছন থেকে পায়ের পাতা, কোমর, বাঁকানো গ্রীবা এই সব দেখতে দেখতে কখন দরজার কড়া নেড়ে, অমলার ঘরের মধ্যে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে নিজেই টেরই পেল না।
