কিন্তু এখনও বলাইয়ের প্রস্তাবে আবার তার হুঁশ হল। সত্যিই চাবিটা না পেলে বড় অসুবিধা হবে। নিজের বাড়িতে তালা ভেঙে ঢোকা জিনিসটা খুব পছন্দের নয়। তার ওপরে তালা ভাঙা ব্যাপারটায় গুরুপদর কোনও অভিজ্ঞতা নেই। কী করে তালা ভাঙতে হয় সে ভাবতেই পারে না।
বলাইয়ের পরামর্শ মতো স্থির করে যে একবার বাস-ডিপোটা ঘুরে যেতে হবে। যদি সেখানে জমা পড়ে থাকে। বলাই রইল, গুরুপদ একাই বাসে উঠল। প্রথমে নামল গিয়ে ডিপোতে। নেমে এদিক ওদিক কাকে ঠিক প্রশ্নটা করা দরকার স্থির করতেই গেল কয়েক মিনিট। তারপর ভয়ে ভয়ে একজন নিরীহ গোছের কর্মচারীকে বলল, আচ্ছা মশায়, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
সেই কর্মচারীটি বললেন, কী, বলে ফেলুন!
গুরুপদ বলল, দেখুন, আজ এই সকালের দিকে…
সেই মুহূর্তে কোথায় একটা হুইসল বেজে উঠল। গুরুপদ যে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিল তিনি একটি লাফে সামনের সদ্যচলন্ত বাসটিতে উঠে পড়লেন, আমার ট্রিপের সময় হয়ে গেছে। ঘণ্টা বাজিয়ে বাসটা চলে গেল।
গুরুপদর নিজের ওপরেই একটু রাগ হল। এত ভণিতা করার কোনও প্রয়োজন নেই, সে তো আর চুরি করতে আসেনি। এবার একটু বেপরোয়া হয়ে টিকিট-ঘরের দিকে অর্থাৎ যে ঘর থেকে কন্ডাক্টররা টিকিট ও ভাঙানি নিয়ে আসছেন সেই ঘরের সামনে গিয়ে বলল, ও মশায়, শুনছেন।
কে, পার্টনার নাকি? ভেতর থেকে একটি কোমল কণ্ঠ শোনা গেল। গুরুপদ একটু আশান্বিত হল। কিন্তু সেই কণ্ঠটি যখন গরাদের চৌকো দিয়ে একটু বেরিয়ে এসে গুরুপদকে দেখল, মুহূর্তে স্বরযন্ত্রটি কেমন রুক্ষ হয়ে গেল, কী চাই?
গুরুপদ বলে, আমার একটা চাবি হারিয়েছে।
তা আমাকে কী করতে হবে? আমাকে কি তালাচাবিওয়ালা পেয়েছেন?
না, ঠিক তা নয়। তবে আপনাদের বাসে হারিয়েছে। গুরুপদ বিনীতভাবে নিবেদন করল।
কিন্তু ওই আপনাদের শব্দটি লোকটিকে যেন ক্ষিপ্ত করে দিল, হ্যাঁ, আমাদের! সত্তর টাকা মাইনে আর কোম্পানি আমার হয়ে গেল! এ মশায় সরকারি ব্যাপার, কারুর একার কোম্পানি নয়।
কী সব বাজে কথা বলছ। পাশ থেকে একজন ভারিক্কিমতন লোক এসে গুরুপদকে উদ্ধার করে, কী দরকার বলুন তো?
গুরুপদ এতক্ষণে সমস্ত ব্যাপারটা গুছিয়ে বলার সুযোগ পায়। এবং এক নিশ্বাসে বলে ফেলে।
ভারিক্কিমতন লোকটি সব মনোযোগ দিয়ে শোনে। তারপর গুরুপদকে আবার জিজ্ঞাসা করে, আচ্ছা কত নম্বর বাসে হারিয়েছে বলুন তো?
ঠিক বাসেই হারিয়েছে কিনা সে বিষয়ে অবশ্য আমি যথেষ্ট নিশ্চিত নই। তবে বাসের নম্বরটা হল…গুরুপদ যে রুটে এসেছিল সেই রুট-নম্বরটা বলল।
কিন্তু তাতে কোনও কাজ হল না। ভদ্রলোক রুট-নম্বর নয়, যে বাসে গুরুপদ এসেছে সেই বাসের নম্বরটি কী তাই জানতে চাইল। এর উত্তরে ঘাড় চুলকানো ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। গুরুপদ তাই করল, কেননা, কে বাসের নম্বর টুকে রাখে, কীই বা প্রয়োজন?
সে যা হোক, বাসের নম্বর বলতে পারলেও বিশেষ কোনও সুবিধা হত বলে মনে হল না। কেননা গুরুপদ তখনই জানতে পারল যে বাসে যাই হারাক এখানে তা পেলেও ফেরত দেয়া হয় না, তা ফেরত পেতে হলে যেতে হবে ডালহৌসি স্কোয়ারে লস্ট প্রপার্টি অফিসে।
গুরুপদ হাল ছাড়ল না। লস্ট প্রপার্টি অফিসের ঠিকানাটি কোনও রকমে সংগ্রহ করে নিয়ে তখনই রওনা হল সেই অফিসের দিকে।
অফিস পৌঁছাতে ততক্ষণ বেলা তিনটে। এনকোয়ারিতে একজন মহিলা বসে রয়েছেন। গুরুপদ কয়েক মিনিট দাঁড়ানোর পর তিনি ভ্রুক্ষেপ করলেন। একবার গুরুপদর মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হারিয়েছে?
গুরুপদ বিনীতভাবে জানাল।
থানায় ডায়েরির কপি কই? ভদ্রমহিলা সুরঞ্জিত কয়েকটি নখাগ্র কাউন্টার-পথে নিক্ষেপ করলেন।
গুরুপদ জানাতে বাধ্য হল যে থানায় কোনও ডায়েরি নেই।
তা হলে তো হবে না। আপনার যে জিনিস হারিয়েছে এবং সেই জিনিসই যে আপনার তার প্রমাণ কী? যে এলাকায় হারিয়েছে সেই এলাকার থানায় একটা ডায়েরি করে নকল নিয়ে আসতে হবে আর এই একটা ফর্ম নিন, এটা পূরণ করে দিন।
ভদ্রমহিলা একটি ছাপানো ফর্ম এগিয়ে দিলেন।
গুরুপদ জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আমি তো বাসে চড়ে গিয়েছি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। সে প্রায় তিন চারটে থানার এলাকা দিয়ে বাস গেছে। কোন থানায় ডায়েরি করতে হবে?
আপনি একটু বসুন। ভদ্রমহিলা দ্রুত পদক্ষেপে ভিতরের দিকে চলে গেলেন। বসবার কোনও বন্দোবস্ত নেই, বসতে গেলে ভদ্রমহিলার পরিত্যক্ত আসনে গিয়ে বসতে হয়, গুরুপদ তাই দাঁড়িয়েই রইল।
ভদ্রমহিলা ফিরলেন একটু পরে, দেখুন আমি আপনাকে সঠিক বলতে পারছি না, আসলে এটা অনীতাদির কাজ। অনীতাদি আজ কদিন আসছেন না, ওঁর ভাইয়ের বিয়ে কিনা। আমাকেই ওঁর কাজ করতে হচ্ছে। আর কেউই কিছু বলতে পারছে না। আপনি এক কাজ করুন, সব থানাতেই একটা করে ডায়েরি করুন না।
যেন ব্যাপারটা খুবই সহজ এই রকম মুখভাব রেখে গুরুপদ জানতে চাইল, তারপরে চাবি কি নাগাদ পাওয়া যাবে?
চোদ্দোদিন পরে খোঁজ নেবেন। অবশ্য ততদিনে অনীতাদি ফিরে আসবেন। অনীতাদি এখানেই বসবেন, দেখলেই চিনতে পারবেন। এই আমার চেয়ে আরেকটু কালোমতন…ভদ্রমহিলা আরও কী সব বলতে যাচ্ছিলেন, গুরুপদ কোনও কিছুতে কান না দিয়ে একটি দ্রুত নমস্কারে কক্ষত্যাগ করে পথে অবতরণ করল। ভদ্রমহিলা বিশেষ নিরাশই হলেন বলে মনে হল, তাঁর যেন আরও কী কী বলার ছিল।
