চাবি হারানো, সবাই ব্যাপারটাকে বেশ লঘু বলে ধরে নিয়েছিল কিন্তু গুরুপদ যখন জানাল যে চাবি ছাড়া আর বাড়িতে ফেরাই সম্ভব নয়, কেননা তার ফ্ল্যাটের সদরের চাবি ওতেই রয়েছে, ওই রিংয়েই, যে রিংটা সে এইমাত্র এই ঘরে হারিয়েছে, এবং যে চাবি ওই রিংয়ে ছাড়া আর কোথাও নেই। এ কথায় অনিলকে একটু দুশ্চিন্তিত দেখা গেল কেননা গুরুপদকে সে বিলক্ষণ জানে। গুরুপদ যেকোনও মুহূর্তে বলতে পারে, আমার ঘরের চাবি তোমার ঘরে হারিয়েছে, যতদিন বা যতক্ষণ এই চাবি না পাওয়া যাচ্ছে আমি তোমার ঘরে থাকব। সুতরাং অনিলকে ব্যস্ত হতে হল, অনিলের স্ত্রী নীরাকেও রান্না বান্না স্নান ফেলে গাছকোমর শাড়ি বেঁধে স্বামী-সুহৃদের নিরুদ্দিষ্ট চাবিটির সন্ধানে ব্যাপৃত হতে হল।
এবং সমস্ত ঘর তছনছ হল, ওলোট-পালোট হল, কিন্তু চাবিটার সন্ধান হল না। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে আপনি আজ চাবিটি ঘরে না লাগিয়েই বেরিয়ে এসেছেন?নীরা একবার বিনীতভাবে প্রশ্ন করল। গুরুপদ জানাল, তা হতে পারে, নাও হতে পারে। তবে এরকম আগে কোনওদিন হয়নি। তা হলে তুমি তো বাড়ি থেকে বাসে করে এলেবাসে কিংবা রাস্তায় কোথায়ও পড়তে পারে তো? বলাই-এর এই প্রশ্নে গুরুপদ ঠিক কোনও উত্তর দিল না। একটু মৃদু হেসে বন্ধু-পত্নীর দিকে তাকিয়ে করুণকণ্ঠে বলল, দেখুন, আমার চাবি হারানোর আসল দুঃখটা কী জানেন?
অনিল র্যাকের ওপর চাবিটাকেই হাতড়াচ্ছিল, সে সেখান থেকে গুরুপদর কথায় বাধা দিল, দ্যাখ গুরুপদ, বেলা দেড়টার সময় আমার বউকে বোকা পেয়ে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদবি না। এখন। কোনও গালগল্প সইবে না। তোর ঘরের চাবি হারিয়ে গেছে, খুঁজছি, বেশ। ওই চাবির মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও স্মৃতিচিহ্নের ব্যাপার নেই। চাবি চাবিই, হারিয়ে গেলে তালা ভাঙতে হয়। এ ছাড়া তোর। দুঃখের আর কী কারণ হতে পারে? অনিল গুরুপদর ওপর বিশেষ চটে গেছে বোঝা গেল।
কিন্তু গুরুপদ থামল না, পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দেশলাইয়ের ওপর একটু একটু করে ঠুকতে লাগল, দেখুন নীরা দেবী, চাবিটা হারিয়ে গেছে, যেতে পারে। কিন্তু এটা তো আমার পকেটে থাকার কথা নয়। হারাবেই তো! আমাকে কেন বয়ে নিয়ে বেড়াতে হচ্ছে? গুরুপদর কণ্ঠে স্পষ্ট অভিযোগের সুর শোনা গেল।
নীরা একটু হেসে সামনের উপুড় করে ফেলা আলমারিটার একধারে বসে জিজ্ঞাসা করল, কেন, এটা আর কারওর ঘরের চাবি নাকি?
গুরুপদ ম্লান হাসল, প্রায় ঠিকই বলেছেন। এ চাবি তো আমার কাছে থাকার কথা নয়, এটা থাকার কথা কারওর আঁচলের গিটে। একটা অস্পষ্ট দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দও যেন শোনা গেল।
গুরুপদর এই শোকপ্রকাশে অনিল এবং বলাই হো হো করে অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ল, নীরা একটু কম হাসল।
নীরাই আবার প্রশ্ন তুলল, কেন, সেই নীলবসনা সুন্দরীর কী হল?
কথাটার একটা গূঢ় অর্থ আছে। গুরুপদ যে ফ্ল্যাটটায় সম্প্রতি অধিষ্ঠিত হয়েছে, তারই পাশের ফ্ল্যাটে অমলা থাকে। নীরার ধারণা, অমলা সব সময়েই নীল শাড়ি পরে থাকে। অন্তত নীরা যে কবার গুরুপদর ফ্ল্যাটে গিয়েছে অমলাকে নীলবসনাই দেখেছে। নীরার আরও ধারণা এই রকম যে অমলার ব্যাপারে গুরুপদর কিঞ্চিৎ দুর্বলতা রয়েছে। গুরুপদ অবশ্য কোনও সময়েই ব্যাপারটিকে বিশেষ অস্বীকার করেনি।
কিন্তু সম্প্রতি কিছুদিন হল গুরুপদর ভাবগতিক কথাবার্তায় কেমন যেন একটা অভূতপূর্ব হতাশার ভাব দেখা দিয়েছে। হয়তো অমলা-সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনও গোলযোগ দেখা দিয়েছে। গুরুপদ নীরার প্রশ্নের জবাবও একটু ঘুরিয়ে দিল।
গুরুপদ বলল, আপনার অযাচিত সহানুভূতি প্রদর্শনের জন্য ধন্যবাদ নীরা দেবী। তবে আপনার অবগতির জন্যে জানাই, নীলবসনা আর নেই।
সে কি মরে গেছে? অনিলের কণ্ঠে কপট উদ্বেগ প্রকাশ পেল।
গুরুপদ প্রায় কোনও বাধাই না দিয়ে বলল, বলাই জানে।
বলাই বলল, নীলবসনা আর নীলবসনা নেই। সে এখন নানা ধরনের রঙে মনোনিবেশ করেছে। এখন দেখা যাচ্ছে অন্য যেকোনও রংই তার সমান পছন্দ। আজ সকালে দেখলাম একটা ফিকে সবুজ রঙের শাড়ি পরনে।
ব্যাপারটা গুরুপদর পক্ষে মর্মান্তিক। ইতিমধ্যে একাধিক দিন গুরুপদ নীল রঙ এবং তার মূল্য, অর্থ, ব্যঞ্জনা, সেই রঙ যাদের পছন্দ তাদের মানসিকতার উৎকর্ষ ইত্যাদি আলোচনায় বিশেষ উৎসাহ দেখিয়েছে। অসাধারণ বিশ্লেষণ-ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে নীল রঙের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে। সেই অমলা যদি ক্যাটক্যাটে হলুদ বা ফিকে সবুজের অনুরাগিণী হয় তাতে গুরুপদর কী? এই ধরনের একটা শুষ্ক অনুযোগ তুলে গুরুপদ আর বলাই অনিলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। অনিল ও নীরা অবশ্য দেরি যখন হয়েছেই স্নান খাওয়া করে যেতে বলল। কিন্তু ওরা আর বসল না।
ঝাঁ ঝাঁ দুপুরের গনগনে রোদ। বেলা দেড়টা বেজে গেছে, সেও বেশ কিছুক্ষণ হল। সবে চৈত্রের শুরু। এর মধ্যে রাস্তাঘাট ভয়ংকর তেতে উঠেছে। শহরতলির এদিকটায় গাছপালা বিশেষ নেই। দুজনে ঘামতে ঘামতে বাস-স্টপের দিকে এগুল। বলাই বলল, কিন্তু তুই তো চাবিটা বাসেও ফেলতে পারিস! এই ধর পকেট থেকে পড়ে যেতে পারে!
গুরুপদ জানে ব্যাপারটা অসম্ভব নয়। কিন্তু এখন এই চো-চো পেটে কোন ধাবমান বাসের পশ্চাদনুসরণ করতে হবে সেই হারা-উদ্দেশে–সেই আশঙ্কায় সে আর এদিকটায় মাথা ঘামাতে চায়নি। যা হয় তোক।
