অনেক হাতেপায়ে ধরা, কাদাকাটি অনেক কিছু করেও রামভজন ভগবানের মন গলাতে পারলেন না। স্বর্গে হুকুম জারি হয়ে গেলে তার আর কোনও নড়চড় হয় না।
বিচারসভার শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে স্বর্গের কাণ্ডকারখানা প্রত্যক্ষ করছিলেন চিন্ময়বাবু। তার আর কিছু করার নেই, তিনি তো নিজ পুণ্যবলে ভাল এয়ারকন্ডিশন গাড়ি পেয়েছেন। এখন শুধু মজা দেখছেন, যেমন যেমন লোক আসছে তাদের কথাবার্তা শুনে, কাগজপত্র-রেকর্ড দেখে একেকজনকে একেকরকম যান বরাদ্দ করা হল।
একটি সুন্দরী মেয়ে এল। খুব চঞ্চলা, প্রগলভা ছিল পৃথিবীতে, তবে বোধহয় দুশ্চরিত্রা ছিল না, তাকে চাকা লাগানো দ্রুতগতি স্কেটিং বোর্ড দেওয়া হল।
এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এলেন, দেখা গেল দেশে তিনি যথেষ্ট সংযত থাকলেও যতবারই বিদেশে গিয়েছেন মেমসাহেবের সঙ্গে যথেষ্ট বদমায়েসি করেছেন। তাকে একটা পুরনো মোটর সাইকেল দেওয়া হল।
পুলিশের এক প্রাক্তন বড়কর্তা এমনিতে ভালই ছিলেন, তবে মধ্যযৌবনে একবার যখন তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে মাসছয়েক হাসপাতালে ছিলেন তখন পাশের বাড়ির বিধবা বউদির সঙ্গে একটু লটঘট বাধিয়ে ফেলেছিলেন।
ভদ্রলোককে একটা ফিটন গাড়ির কোচম্যান করা হল। ভদ্রলোক প্রাক্তন পুলিশকর্তা, তিনি জানতে চাইলেন, আমাকে কি খালি ঘোড়ার গাড়ি চালাতে হবে?
চিত্রগুপ্ত খাতা দেখে বললেন, তা কেন? তোমার সেই পাশের বাড়ির বিধবা বউদি তিনিই তো ওই গাড়ি চড়েন। আগের কোচম্যান নরকে মেয়াদ খাটতে গেছে। এখন থেকে তুমি চালাবে ওঁর ঘোড়ার গাড়ি।
এইভাবে ছোট বড়, সাধারণ, বিলাসবহুল মোটরগাড়ি, স্কুটার, মোটর সাইকেল, ঘোড়ার গাড়ি, ঘোড়া, সাইকেল, সাইকেল রিকশা, টানা রিকশা, পায়ের নীচের স্কেটিং চাকা একেকজনকে একেকরকম বরাদ্দ করা হল।
চরিত্রদোষ অনুযায়ী চুলচেরা বিচার করে যার যেমন প্রাপ্য তেমন বাহন সে পেল।
কাউকে কাউকে বাহন দেওয়াই হল না। তাদের ড্রাইভার, কোচম্যান বা রিকশাওয়ালা করা হল।
বিগত যুগের এক বিখ্যাত নর্তকী শ্রীমতী মদালসা দেবীকে দায়িত্ব দেওয়া হল চিন্ময়বাবুর গাড়ি চালানোর।
মহিলা বহুকাল আগেই এসেছেন, তবে আগে যাঁর সারথি ছিলেন তিনি সম্প্রতি আবার মানব জন্ম পরিগ্রহণ করতে ধরাধামে গিয়েছেন।
সে যা হোক, মদালসা দেবীকে নিয়ে চিন্ময়বাবুর আপত্তি নেই। আর আপত্তি করে লাভই বা কী? স্বর্গে নিজের ইচ্ছের কোনও দাম নেই।
মদালসা দেবী পারিজাত স্কোয়ারে চিন্ময়বাবুর জন্যে নির্দিষ্ট বাংলোয় গাড়ি চালিয়ে চিন্ময়বাবুকে নিয়ে গেলেন। চমৎকার বাংলো, সুন্দর ব্যবস্থা, সব নিখুঁত, কোথাও কোনও ত্রুটি নেই। স্বর্গের ব্যাপারই আলাদা।
মদালসা কাছেই কোথাও থাকেন। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এসে তিনি চিন্ময়বাবুকে পারিজাত স্কোয়ারে, নন্দন অ্যাভিনিউয়ে, ব্রহ্মা রোডে, মহাদেব মার্কেটে গাড়ি করে বেড়িয়ে নিয়ে আসেন।
রাস্তায় অনেক চেনা লোক। তাদের বাহন দেখেই সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় পৃথিবীতে কে কতটা সচ্চরিত্র ছিলেন। সেদিন চিন্ময় এক নীতিবাগীশ গার্লস কলেজের প্রিন্সিপ্যালকে দেখলেন সাইকেল চালাচ্ছেন, ভদ্রলোক চিন্ময়বাবুকে দেখে চিনতে পেরে লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে পাশের গলিতে কেটে পড়লেন।
মদালসা দেবী অবশ্য বলেন, স্বর্গে আবার লজ্জা কী? এ নিয়ে চিন্ময়বাবুর সঙ্গে মদালসা দেবীর। অনেক আলোচনা হয়। সে আলোচনায় চিন্ময়বাবু বেশ মজা পান।
কিন্তু এ মজা দীর্ঘস্থায়ী হল না। রাস্তায় বিভিন্ন লোককে হরেক রকম যানবাহনে দেখতে দেখতে হঠাৎ একদিন চিন্ময়বাবু দেখলেন তার স্ত্রী সর্বজয়া আসছেন সামনের রাস্তা দিয়ে।
সর্বজয়াকে দেখেই কপালে করাঘাত করলেন চিন্ময় রায়। গাড়ির গতি একটু মন্থর করে দিয়ে মদালসা দেবী বললেন, কী হল?
চিন্ময় বললেন, আমার স্ত্রী।
মদালসা বললেন, কোথায়?
চিন্ময় বললেন, ওই টুং টাং করতে করতে সামনের গলিতে ঢুকছে।বলে আবার কপালে করাঘাত করলেন, এবার বেশ জোরে।
মদালসা দেবী বললেন, আপনার স্ত্রী মারা গেছেন তাই পরলোকে এসেছেন। পৃথিবীতে স্ত্রী মারা গেলে স্বর্গে স্বামী শোক করে নাকি? চিন্ময় বললেন, আমি শোক করছি না, আমি নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছি। ধিক্কার? মদালসা দেবী প্রশ্ন করলেন, ধিক্কার কীসের? চিন্ময়বাবু বিমর্ষ কণ্ঠে বললেন, দেখলেন না আমার স্ত্রী রিকশা টানছেন। বুঝতেই পারছেন কেমন চমৎকার চরিত্রবতী ছিলেন উনি। আর সারাজীবন ধরে মূর্খ আমি, ওঁকে কী তোয়াজটাই না করেছি। ওঁর মতো মহিলার কথা ভেবে সারাজীবন শুকনো কাটিয়েছি। হায়, কপাল আমার। বলে চিন্ময়বাবু আবার কপালে করাঘাত করলেন।
স্বর্গের চাবি
না, কিছুতেই পাওয়া গেল না। সমস্ত ঘর ওলোট-পালোট করে ফেলা হয়েছে। ঘরের চারদিকে যে বিশৃঙ্খলা এখন দেখা যাচ্ছে, কে বিশ্বাস করবে মাত্র আধঘন্টা আগেও এই গৃহ আবাসযোগ্য ছিল! সামনের চেয়ারগুলো উলটে ফেলা হয়েছে, আলনাটা বাঁদিকের জানলার পাশে চিত, একটা আলমারি হাটখোলা, অধিকাংশ বই নীচে নামানো। আর তিনজন ঘর্মাক্ত পুরুষ ও একজন মহিলার বহু পরিশ্রমের দীর্ঘনিশ্বাসে ঘরে ঝড়।
গুরুপদ আর বলাই এসেছে বেলা আটটায়। আর আসার পর থেকেই গুরুপদর যা স্বভাব–এই ঘরের সমস্ত জিনিসগুলো একে একে ঘেঁটেছে। প্রথমে ধীরে-সুস্থে এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘরের আসবাবপত্র লক্ষ করেছে। তারপর বইপত্র যা কিছু সব নেড়েচেড়ে দেখেছে। এখন বেলা দেড়টা। গুরুপদ আর বলাই কারওরই মানখাওয়া হয়নি, যার বাড়িতে এসেছে সেই বন্ধু অনিল এবং অনিলের। স্ত্রী-ও অভুক্ত এখনও। সাড়ে বারোটাতেই গুরুপদ উঠছিল, যাই, বেলা হয়ে গেছে, আর দেরি করার কোনও মানে হয় না। এবং সেই সময়েই বিপত্তিটা ঘটল। গুরুপদ পকেট থেকে সিগারেট বার করার জন্যে হাত দিয়ে অচেতনভাবেই খোঁজ করেছিল ওর ফ্ল্যাটের চাবিটার এবং তার তিন পকেট ঘেঁটে ঘোষণা করল, আমার চাবি পাওয়া যাচ্ছে না! কোথায় হারালাম বল তো?
