সুখস্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় এবং অন্যান্য বহুবিধ কারণে বিরক্ত সর্বজয়া চিন্ময়ের হাত সজোরে সরিয়ে দিয়ে ধমকে উঠলেন, চোপ, মাতাল।
সর্বজয়ার ধমকের প্রয়োজন ছিল না। ঠিক পনেরো মিনিট পরে পৌনে পাঁচটা নাগাদ চিন্ময়বাবু চিরতরে সম্পূর্ণ চুপ করে গেলেন। ইহলোক পরিত্যাগ করলেন।
এখন সকাল দশটায় স্বর্গের অফিসঘর খোলার পর পরলোকে তার ইন্টারভিউ হচ্ছে। আর বালিগঞ্জের বাড়িতে ভিড়েভরা আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবের মধ্যে তখনও সর্বজয়া ইনিয়ে-বিনিয়ে কঁদছেন, ওগো, তুমি না একেবারে চুপ করে গেলে গো!
নামধাম ইত্যাদি ইন্টারভিউয়ের প্রাথমিক পর্যায় মিটে যাওয়ার পরে এবার আসল প্রশ্নের পালা।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যেমন নানা বিষয়ে নানারকমের প্রশ্ন করা হয়, ভেনেজুয়েলা থেকে কুয়ালালামপুর কাছে না বাগদাদ থেকে রেঙ্গুন কাছে?রেঙ্গুনের নতুন নাম কী, ভেনেজুয়েলার পুরনো নাম কী? মাছির কটা চোখ, আরশোলার বা মাকড়সার কটা পা? সত্যিই কি পা না হাত?
এরকম ইয়ার্কি, এ জাতীয় প্রশ্ন স্বর্গে করা হয় না। রীতি নেই।
চিন্ময়বাবু একদা একটা সরকারি চাকরির চেষ্টা করেছিলেন। অনেকদূর উতরে যাওয়ার পর মৌখিক পরীক্ষায় আটকে যান, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, হিজলপুকুর পল্লিসমবায় উন্নয়ন সমিতির পরিচালকের নাম কী?
হিজলপুকুর পল্লিসমবায় উন্নয়ন সমিতির সেই পরিচালক ছিলেন প্রশ্নকর্তার শ্বশুর এবং তৎকালীন সমবায় সচিবের ভায়রাভাই। কিন্তু চিন্ময়বাবু সে কথা কী করে জানবেন। সেই সরকারি চাকরি তিনি পাননি, কিন্তু তার জন্যে তাঁর কোনও আফসোসও নেই। তবে আজ এই স্বর্গীয় ইন্টারভিউয়ে তত জটিলতা নেই। শ্রীল শ্রীযুক্ত শ্রীভগবানের একটাই মাত্র জিজ্ঞাসা, একটাই প্রশ্ন। তাঁর পাপপুণ্যের নিরিখ একটাই, সেটা হল নরনারীর নৈতিক জীবনের পবিত্রতা। তার চেয়েও বড় কথা অন্য কোনও নৈতিকতা নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না, এই বুড়ো বয়সে তার একমাত্র ভাবনা নরনারীর শারীরিক সম্পর্কের নৈতিকতা নিয়ে।
সবাইকে যেমন জিজ্ঞাসা করা হয়, চিন্ময়বাবুকেও জিজ্ঞাসা করা হল সেই একটিই প্রশ্ন।
প্রশ্নটি হল, তুমি কখনও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছ কিনা?
চিন্ময়বাবু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বাংলা খবরের কাগজ, বইপত্র কিছু কিছু পড়েন বটে কিন্তু ব্যভিচারের মতো কঠিন শব্দের প্রকৃত অর্থ তিনি জানেন না। প্রশ্ন শুনে চিন্ময়বাবু আমতা আমতা করতে লাগলেন।
প্রশ্নকর্তা অন্য কেউ হলে ধরে নিত লোকটির দোষ আছে তাই এই আমতা আমতা ভাব। কিন্তু এখানে প্রশ্নকর্তা স্বয়ং ভগবান। তিনি সর্বজ্ঞ, তিনি সব বোঝেন, সব জানেন।
ব্যভিচার শব্দে চিন্ময়বাবুর অসুবিধা দেখে ঈশ্বর ইংরেজিতে অ্যাডাল্টারির কথা বললেন, সেই সঙ্গে ব্যাখ্যা করে প্রশ্ন করলেন, বিবাহিতা স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে জীবনে কখনও ফস্টিনস্টি করেছ কিনা? ফস্টিনস্টির চেয়ে বেশি কিছু করেছ কিনা?
অন্তত এই একটি ব্যাপারে চিন্ময়বাবুর কখনও কোনও দোষ ছিল না। প্রশ্ন বোঝামাত্র তিনি চট করে উত্তর দিলেন,নো স্যার। নেভার স্যার। কখনও না স্যার।
যমরাজার বিশ্বস্ত সহকারী চিত্রগুপ্ত ভগবানের সামনে ছিলেন, তিনি পাশের ব্লকে যমপুরীর অফিসে তখনই দূরভাষে যোগাযোগ করে খোঁজ নিয়ে জানলেন চিন্ময়বাবু সত্যি কথাই বলেছেন।
আর কোনও প্রশ্ন চিন্ময়বাবুকে করা হল না। এই প্রশ্নোত্তরের ভিত্তিতেই তাকে একটি শীততাপনিয়ন্ত্রিত স্বর্গীয় মোটরগাড়ি বরাদ্দ করা হল।
গতকাল রাতে কিংবা আজ সকালে আরও যারা মারা গিয়েছেন তাঁদেরও প্রশ্নোত্তর চিন্ময়বাবুর সঙ্গেই চলছিল।
তবে সব ক্ষেত্রে প্রশ্নোত্তর মোটেই জরুরি নয়। দু-চারজনের রেকর্ড এত খারাপ যে তাদের ক্ষেত্রে রেকর্ড বা জবানবন্দি কিছুই প্রয়োজন নেই।
এই তো সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন শ্রীযুক্ত রামভজন চৌরাসিয়া, ক্রোড়পতি ও স্বনামধন্য লম্পট। চিন্ময়বাবু রামভজনকে আলগা আলগা চিনতেন। রামভজনবাবুর দুর্বলতা ছিল অনতি-সাবালিকা, স্বভাবত অথবা জন্মজ গরঠিকানা-অভিনেত্রীদের প্রতি। একবার চিন্ময়বাবু দেখেছিলেন পুরীর সমুদ্রসৈকতে দুই সদ্যোখিতা উপনায়িকাকে দুই বগলে নিয়ে চিরগোলমেলে নুলিয়াদের হাত এড়িয়ে রামবাবু মাত্র তিনটে রবারের টিউব নিয়ে তরঙ্গসংকুল সাগরে হাসতে হাসতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
কুখ্যাত হোটেলের বারান্দায়, খারাপ পার্টিতে এবং এই জাতীয় নানা জায়গায় সময়ে-অসময়ে খারাপ-ভাল নানারকম মহিলার সঙ্গে রাম চৌরাসিয়াকে দেখেছেন চিন্ময় রায়।
চৌরাসিয়ার কাগজপত্র দেখে চিত্রগুপ্তের সঙ্গে অল্পবিস্তর আলোচনা করে ভগবান রামভজন চৌরাসিয়াকে বরাদ্দ করলেন একটি রিকশা।
ভগবানের নির্দেশ শুনে রামভজন একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন, করজোড়ে বললেন, হুজুর, পৃথিবীতে কোনওদিন আমি এয়ারকন্ডিশন গাড়ি ছাড়া চড়িনি আর আমাকে এখানে রিকশায় চড়তে হবে।
ভগবান বললেন, না, না। তোমাকে রিকশায় চড়তে হবে না।
শুনে রামভজন যেন একটু আশ্বস্ত হলেন এয়ারকন্ডিশন না হোক, স্বর্গে এয়ারকন্ডিশন দরকারও নেই। অন্তত একটা গাড়ি পেলেই হল। তিনি একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
কিন্তু ওই পর্যন্তই। ভগবানের অঙ্গুলি নির্দেশে চিত্রগুপ্ত রামভজনকে জানালেন তোমাকে রিকশা চড়তে হবে এ কথা তো বলা হয়নি। তোমাকে তো রিকশা চড়ার জন্যে দেওয়া হচ্ছে না। তুমি রিকশা টানবে তোমার যা রেকর্ড তাতে এটাই তোমার প্রাপ্য।
