এই আকস্মিক প্রশ্নে জয়দেব একটু পিছিয়ে এলেন, একটু আমতা আমতা করে অপ্রস্তুতভাবে একবার মহিমাময়ের দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, হ্যাঁ, আমি জয়দেব পাল, সিনেমা করি। তাই কী হয়েছে?
ট্যাকসিওয়ালা উত্তেজিত হয়ে বলল, কী হয়নি! আজ আপনার নাম হয়েছে। সিনেমা তুলছেন, হিল্লি-দিল্লি যাচ্ছেন। খবরের কাগজে আপনার নাম বেরোচ্ছে ছবি বেরোচ্ছে। আপনি মোটা হয়েছেন, লম্বা জুলফি রেখেছেন, মোটা গোঁফ রেখেছেন। আপনি এখন পকেট থেকে নোটবুক বার করে ট্যাকসির নম্বর নিচ্ছেন। পুলিশকে দিয়ে আমাদের জেল ফাঁসি করাবেন। ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ! ঘৃণাভরে বার বার ধিক্কার দিল ট্যাকসি-ড্রাইভার।
জয়দেব তখন একেবারে বেকুব বনে গেছেন, কাচুমাচু মুখে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে আছেন, কী যে করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না এবং কেনই বা ট্যাকসিওয়ালা এসব বলছে তাও ধরতে পারছেন না।
ট্যাকসিওয়ালা কিন্তু তখনও নিরস্ত হয়নি, সমানে ধিক্কার বর্ষণ করে চলেছে, ছিঃ ছিঃ জয়দেববাবু, আপনার কোনও লজ্জা নেই! আপনি এত নেমকহারাম! আপনি আজ ট্যাকসি ড্রাইভারদের পিছনে লাগছেন? কিন্তু এই কলকাতার ট্যাকসিওয়ালারা না থাকলে আজ আপনি কোথায় থাকতেন, কোন ভাগাড়ে? জোড়াবাগান থেকে, খালাসিটোলা থেকে, খিদিরপুর থেকে, ফুটপাথ থেকে, গুণ্ডাদের হাত থেকে, পুলিশের হাত থেকে রাত বারোটা, একটা, দুটো, ট্যাকসিওয়ালারা আপনাকে কোলে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। আপনি তাদের গাড়ির সিটে, তাদের গায়ের জামায় বমি করে দিয়েছেন। আজ এই তার প্রতিদান!
এই ভয়াবহ অভিযোগমালার সামনে জয়দেব অসহায় হয়ে পড়লেন, করুণ কণ্ঠে বললেন, ঠিক আছে, যাও যাও। তোমার নম্বর নিচ্ছি না।
ট্যাকসিওয়ালার রাগ তখনও যায়নি, কীসের জন্যে নম্বর নেবেন, দাদা? বৃষ্টির রাতে একটু শেয়ারে ট্যাকসি খাটাচ্ছি, মাতাল-বাদমাইশদের তুলছি না, এটা কি অন্যায় হল?
নিস্তব্ধ হয়ে মহিমাময় এতক্ষণ ধরে এই নাটক দেখছিলেন, এবার যথেষ্ট হয়েছে এই ধরে নিয়ে এগিয়ে এসে ট্যাকসিকে বললেন, ঠিক আছে, এবার আপনি যান। শেয়ারে খাটুন।
মহিমাময়কেও মনে হল ট্যাকসিওলা চেনে, সে বলল, ও আপনিও আছেন! নিশ্চয়ই কোথাও বসবেন। কাছাকাছি কোথাও হলে বলুন আমি আপনাদের নামিয়ে দিয়ে আসছি।
বহুরকম গালাগাল খেয়ে জয়দেব নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন, এই ট্যাকসিতে উঠতে তার ভরসা হচ্ছে না। কিন্তু মহিমাময় বুঝলেন এ সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না। জয়দেবকে ঠেলে তুলে দিলেন ট্যাকসিতে, তারপর নিজেও উঠলেন, উঠে ট্যাকসি-ড্রাইভারকে বললেন, পার্ক স্ট্রিট।
পার্ক স্ট্রিটে একটা পুরনো বারে ওঁদের দুজনেরই একটা চেনা আজ্ঞা আছে। আজ কিন্তু নিয়মিত আড্ডাধারীদের কেউই আসেনি। এই ঠান্ডায় আর বৃষ্টিতে কেউ বাড়ি থেকে বেরোয়নি মনে হচ্ছে। দুজনে গুটিগুটি বারে ঢুকে এক প্রান্তে এসে একটা টেবিলে বসলেন।
ট্যাকসির মধ্যে জয়দেব গুম মেরে বসেছিলেন, মহিমাময়ও কোনও কথা বলেননি। এখন বারে চুকে দুটো পানীয়ের অর্ডার দিয়ে জয়দেব বললেন, এই ট্যাকসিগুলো যা হয়েছে না।
মহিমাময় এই দুঃখজনক আলোচনায় গেলেন না। এক প্লেট সসেজ নিয়ে নিঃশব্দে পানীয় খেতে লাগলেন। দুজনের মধ্যে একটা ভারী ভাব, কেউ কোনও কথা বলছেন না। মহিমাময় একটা সসেজ তুলে জয়দেবকে অফার করলেন, জয়দেব প্রত্যাখ্যান করলেন।
আরও কিছুক্ষণ পরে আরও দু-তিন গেলাস পানীয় প্রায় নিঃশব্দে শেষ হওয়ার পরে মহিমাময় আপনমনে বললেন, আবার বোধ হয় বৃষ্টি আসছে। যাই বাড়ি ফিরি।
জয়দেব এবার হাত তুলে বাধা দিলেন। বললেন, কোথায় যাচ্ছিস? আজ রাতে যে তোর বড়সাহেবের বাড়িতে আমাদের ডিনারে নিমন্ত্রণ, তোকেও নিয়ে যাব বলেছি।
মহিমাময় আতঙ্কিত হয়ে বললেন, সন্ধ্যায় অফিসে বড়সাহেবের সঙ্গে মদ খেয়েছি, তারপরে রাতে তার বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে ডিনার খাব। এবার নির্ঘাৎ চাকরিটা খোয়াব।
জয়দেব শুনে বললেন, আরে এত ভয় কীসের? আমার যে বইটায় উনি টাকা দেবেন সেটা নিয়ে আলোচনা আছে। আরও দু-একজন আসবে, তুইও যাবি। নিশ্চয়ই যাবি, আমার জন্যে এটুকু করবি না।
মহিমাময় বললেন, কিন্তু তোর স্কুল নিয়ে যদি আবার কথা ওঠে!
জয়দেব বললেন, ধুর, ওসব এড়িয়ে যাব। কত লোক যে ভাবে আমি তার সঙ্গে পড়েছি, সবাইকে কি আর সব ব্যাখ্যা দিতে হয়!
কী জানি কী ভেবে উঠতে গিয়েও মহিমাময় বসে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন, বড়সাহেবের ব্যাপারটা একবার শেষ পর্যন্ত দেখা যাক।
সুতরাং বারের এক প্রান্তে জয়দেব এবং মহিমাময়ের সময় ধীরেসুস্থে কাটতে লাগল। আরও কিছুক্ষণ পরে আরও বেশ কয়েক গেলাস পানীয়ের অবসানে, যখন জয়দেবের মুখটা মহিমাময়ের কাছে এবং মহিমাময়ের মুখটা জয়দেবের কাছে ঝাঁপসা দেখাতে লাগল দুজনে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন।
দুজনেরই প্রচুর মদ্যপান হয়েছে। দুজনেরই এখন টইটম্বুর অবস্থা। জয়দেব বললেন, দাঁড়া একটু বাথরুম থেকে আসি। মহিমাময় একটা দেয়াল ধরে বাইরের দরজার ধারে দাঁড়িয়ে রইলেন কিন্তু জয়দেব সেই যে গেলেন আর আসেন না। ঝিম মেরে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একসময় মহিমাময়ের মনে হল জয়দেব বহুক্ষণ গেছেন, দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার আর কোনও মানে হয় না।
