কিন্তু ভাবার অবসর দিলেন না বড়সাহেব। নিজেই একটা গেলাসে পানীয় ঢেলে তার সঙ্গে নিজের জলের ফ্লাস্ক থেকে জল মিশিয়ে এগিয়ে দিলেন মহিমাময়কে। তারপর জয়দেবের দিকে তাকিয়ে মহিমাময়কে বললেন, আমার বন্ধু জয়দেব পালের সঙ্গে শুনলাম আপনার আলাপ আছে, তা তো থাকবেই, নামকরা লোক, সিনেমা ডিরেক্টর। আমার ছোটবেলার বন্ধু। একসঙ্গে স্কুলে পড়েছি।
পরিচয়ের শেষ অংশ শুনে মহিমাময় একটু বিস্মিত হলেন। অবশ্য এরকম আগেও হয়েছে। বহু ব্যক্তিরই মনে ধারণা যে স্বনামধন্য সিনেমা ডিরেক্টর জয়দেব পালের সঙ্গে তিনি একই স্কুলে পড়েছেন। শুধু কলকাতায় নয়, পশ্চিমবঙ্গে বিহারে এমনকী বাংলাদেশে এই সব স্কুল। যেভাবেই হোক জয়দেব বেশ কিছু লোককে সব সময়েই বোঝাতে পারেন কিংবা ধারণা দেন যে তিনি তাদের সঙ্গে এক স্কুলে এক ক্লাসে পড়তেন। এই ধারণাটা মহিমাময়ের বড়সাহেবের মধ্যেও ঢুকেছে, বিগত বিদ্যালয়-জীবনের মধুর স্মৃতি স্মরণ করে তিনি এখন কাল্পনিক সহপাঠী সুবিখ্যাত জয়দেব পালের দিকে গর্বিত ও আপ্লুত নয়নে তাকিয়ে আছেন।
বহু অভিজ্ঞতা-সূত্রে মহিমাময় জানেন, যদি এই মুহূর্তে বড়সাহেব তার প্রাক্তন স্কুল বিষয়ে কোনও আলোচনা শুরু করেন, অতীতকালের এক সহকারী শিক্ষকের নিষ্ঠুরতা নিয়ে বা ফাঁইনাল খেলায় অবিশ্বাস্যভাবে স্কুলের শূন্য-চার গোলে হেরে যাওয়া বিষয়ে, সেই স্মৃতিচারণে অনায়াস দক্ষতায় জয়দেব যোগ দেবেন। এ ঘটনা বহুবার মহিমাময় প্রত্যক্ষ করেছেন।
এতক্ষণে চিয়ারস বলে গেলাস তুলে বড়সাহেব মহিমাময়কে পানে যোগদান করতে আহ্বান জানিয়েছেন। বহুক্ষণ শুকনো মুখে বিরক্তিকর প্রতীক্ষার পরে মহিমাময়ের এবার দ্বিধা কেটে গেছে। তিনি এক চুমুকে অর্ধেক গেলাস খেয়ে নিলেন। দুপুরের নেশাটা সবে জুড়িয়ে আসছিল, অল্প পান করেই মহিমাময় বেশ চনমনে বোধ করলেন।
চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসে মহিমাময় জয়দেবের দিকে একবার, আরেকবার বড়সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমিও জয়দেবের ক্লাসফ্রেন্ড স্যার, একই স্কুলে ক্লাস ওয়ান থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়েছি।
মহিমাময়ের কথা শুনে বড়সাহেব চমকিত ও চিন্তিত হলেন, মহিমাময়কে জিজ্ঞাসা করলেন, নেবুতলা?
মহিমাময় বললেন, হ্যাঁ স্যার। নেবুতলা করোনেশন বয়েস হাই ইংলিশ স্কুল। আমরা লাস্ট স্কুল ফাঁইন্যাল ব্যাচ।
বিস্মিত বড়সাহেব বললেন, কিন্তু আমি তো জয়দেবের সঙ্গে পুর্নিয়া জুবিলি স্কুলে একসঙ্গে পড়েছি। সিক্সটির হায়ার সেকেণ্ডারি।
মহিমাময় বলতে যাচ্ছিলেন যে জয়দেবের চোদ্দোপুরুষে কেউ পুর্নিয়া যায়নি কিন্তু তার আগেই জয়দেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, সরি, এখনই আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, রাত্রে দেখা হবে বলে তিনি দ্রুতপদে নিষ্ক্রান্ত হলেন। মহিমাময় কী করবেন স্থির করতে না পেরে হাতের গেলাসের বাকি অংশটুকু মুহূর্তের মধ্যে গলাধঃকরণ করে জয়দেবের অনুগামী হলেন। বড়সাহেবের সামনে এই রকম আচরণ সমীচীন কিনা, বেরিয়ে যাওয়ার আগে অনুমতি গ্রহণ করা উচিত কিনা এসব প্রশ্ন এই মুহূর্তে চাপা পড়ে গেল।
বাইরে লোডশেডিং এখনও আছে। তবে বৃষ্টিটা ধরেছে। ঠান্ডা আরও জোরদার।
মহিমাময় মোড়ের মাথায় পৌঁছেই দেখতে পেলেন, জয়দেব প্রাণপণ চেষ্টা করছেন যে কোনও একটা ট্যাকসি দাঁড় করাতে। কিন্তু এই দুর্দিনের সন্ধ্যায় কোনও ট্যাকসিই দাঁড়াচ্ছে না। মহিমাময় জয়দেবকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, এই সময় দুম করে বিদ্যুৎ ফিরে এল। আলো ফিরে আসায় মনটা একটু প্রসন্ন হয়েছে, তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলেন জয়দেব তাকে দেখতে পেয়েছেন এবং হাত তুলে ডাকছেন।
মহিমাময় জয়দেবের কাছে গিয়ে বুঝতে পারলেন যে জয়দেব এখনও পুরো মাতাল হননি, তবে তাঁর বেশ নেশা হয়েছে। জয়দেব মহিমাময়কে দেখে বললেন, তুই পুরো ব্যাপারটা কঁচিয়ে দিচ্ছিলি। জানিস তোর বড়সাহেব আমার একটা বইয়ের প্রডিউসার হতে চলেছে।
এ তথ্যটা মহিমাময়ের জানা ছিল না। নিজের অফিসের বড়কর্তা অফিসে বসে মদ্যপান করছেন, তার ওপর সিনেমা প্রযোজনা করতে যাচ্ছেন সম্ভবত অফিসেরই টাকায় ব্যাপারটা ভাল ঠেকল না মহিমাময়ের কাছে। কোম্পানিটা এবার লাটে না ওঠে।
কিন্তু আশার বাণী শোনালেন জয়দেব, তোর বড়সাহেবের কাছে তোর খুব প্রশংসা করেছি। এবার তুই অফিসার হয়ে যাবি। নির্ঘাত প্রমোশন হবে। খুব যে আশ্বস্ত হলেন মহিমাময় তা নয়, তিনি মনে মনে ভাবলেন, আগে কোম্পানি টিকুক, তারপরে প্রমোশন।
ইতিমধ্যে জয়দেবের অনুরোধ উপেক্ষা করে আরও দু-তিনটি ট্যাকসি তাকে অতিক্রম করে চলে গেছে। কয়েকদিন আগে লালবাজার থেকে কাগজে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, ট্যাকসি যাত্রী নিতে না চাইলে সেই গাড়ির নম্বর পুলিশে জানিয়ে দিতে।
বেশ কয়েকটি ট্যাকসি পাত্তা না দেওয়ার পর উত্তেজিত জয়দেবের সেই পুলিশি বিজ্ঞপ্তির কথা হঠাৎ মনে পড়ল, তিনি হিপপকেট থেকে একটা নোটবুক বার করলেন আর একটা ডট পেন। এইমাত্র মিটার নামানো যে ট্যাকসিটা তাকে পার হয়ে গেছে তিনি সেটার নম্বর টুকতে গেলেন।
সঙ্গে সঙ্গে একটা বিসদৃশ কান্ড ঘটল। যে ট্যাকসিটি চলে গিয়েছিল তার ড্রাইভার পিছন ফিরে তাকিয়ে জয়দেবকে গাড়ির নম্বর টুকতে দেখে ঘ্যাচ করে গাড়িটা ব্যাক করে একদম জয়দেবের পাশে দাঁড়িয়ে গেল, তারপর ট্যাকসির বাঁদিকের জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে বলল, আপনি এখন সিনেমা করেন, তাই না?
