মহিমাময় কিঞ্চিৎ টলতে টলতে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন, পাশে একটা চেনা পানের দোকান। বহুদিনের পুরনো অভ্যেস, এখান থেকে এক খিলি জর্দাপান খেয়ে তারপরে বাড়ি ফেরা। পানের দোকানটায় এখন বেশ একটু ভিড়। আশেপাশের বার-রেস্তোরাঁগুলো খালি হচ্ছে। রাত দশটা বেজে গেছে। বৃষ্টিটা নেই, হাওয়া কম। ঠান্ডাটাও তেমন নয়। আসলে অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলেই ওরকমটা মনে হচ্ছে মহিমাময়ের।
সে যা হোক, পান কিনতে গিয়ে ভিড়ে বাধা পেয়ে একটু সামনের দিকে একটা বন্ধ ওষুধের দোকানের সিঁড়িতে একটু বসলেন মহিমাময়। তাঁর ঝিমুনি মতো এসেছিল, হঠাৎ একটা রাস্তার কুকুর এসে পাশে শোয়ার চেষ্টা করতেই তার তন্দ্রাটা আচমকা ভাঙল।
তন্দ্রা কেটে যাওয়ামাত্র মহিমাময়ের খেয়াল হল জয়দেবের কথা এবং মনে পড়ল সেই বারের বাথরুমে তিনি ঢুকেছিলেন, বারটা যে পাশেই, মাত্র কয়েক কদম দূরে এটা তার চট করে খেয়াল হল না। বিশেষ করে গাড়িবারান্দার নীচে এই সিঁড়িতে কুকুরের পাশে বসে পরিচিত জায়গাটা নেশার ঘোরে বেশ অচেনা লাগছিল তাঁর।
মাতালের আর যতই দোষ থাক, কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে না। মহিমাময়ও মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, এইভাবে জয়দেবকে ফেলে যাওয়া উচিত হবে না।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফুটপাথে নেমে সামনের রাস্তায় একটা ট্যাকসিকে ডাকলেন। এই সময়ে পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায় ট্যাকসির অভাব নেই, দিগদিগন্তের নেশাতুরদের জন্যে সারি সারি ট্যাকসি অপেক্ষমান রয়েছে।
ডাকতেই সামনের ট্যাকসিটা দাঁড়িয়ে গেল। মহিমাময় সেটায় উঠে বসলেন, পার্ক স্ট্রিট।
বলেই সিটে হেলান দিয়ে আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন। ড্রাইভার একটু অবাক হলেও এরকম সওয়ারি নিয়ে চালানো তার অভ্যেস আছে। সে একটুক্ষণ থেমে থেকে বলল, পার্ক স্ট্রিটে কোথায়? জড়ানো কন্ঠে চোখ বোজা মহিমাময় একটু আগে ছেড়ে আসা বারের নামোল্লেখ করলেন। বারের নাম শুনে ড্রাইভারও আর দ্বিরুক্তি না করে তিন সেকেন্ডে ব্যাক করে ট্যাকসিটাকে ওই বারের দরজার সম্মুখে নিয়ে এসে বসল, এই তো আপনার বার!
মহিমাময় চোখ খুলে দেখেন সত্যি তাই। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গাড়ি থেকে নেমে বখশিশসুদ্ধ একটা দশ টাকার নোট ড্রাইভারকে দিয়ে বললেন, খুব তাড়াতাড়ি চালিও না, অ্যাক্সিডেন্ট করে বসবে। একদিন।
বারের দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে মহিমাময় দেখতে পেলেন জয়দেব দাঁড়িয়ে আছেন। জয়দেব মহিমাময়কে দেখে বললেন, আমি ভাবলাম তুই বোধ হয় কোথায় চলে গেলি!
এই সময় জয়দেবের পরিচিত এক ভদ্রলোক কালুবাবু, বারে ঢুকছিলেন, তিনি জয়দেবকে দেখে বললেন, কী হল, এত তাড়াতাড়ি বেরোচ্ছেন নাকি?
জয়দেব মহিমাময়কে দেখিয়ে বললেন, না, এই আমাদের দুজনের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, ডিনার। তাই একটু তাড়াতাড়ি।
কালুবাবু আটকালেন, এক রাউণ্ড, বসে যান।
মহিমাময় কোনও আপত্তি করার সুযোগ পেলেন না, জয়দেবের সঙ্গে তাকেও বসতে হল। মাতালের শেষ রাউন্ড কিছুতেই শেষ হতে চায় না, ওয়ান ফর দা রোড, ওয়ান ফর দা ডিনার, এই রকম ধারাবাহিক চলতে থাকে। তা ছাড়া কালুবাবুর নিজস্ব একটা ভয়াবহ সমস্যা আছে, তিনি বারে এসে সদাসন্ত্রস্ত থাকেন। নিজেই দুঃখ করে ভাঙলেন ব্যাপারটা, জানেন জয়দেববাবু, আমার স্ত্রীর জন্যে মুখ দেখাতে পারছি না। প্রত্যেকদিন বারে আসে।
মহিমাময়ের নেশাটা জমজমাট হয়ে উঠেছে, কিন্তু কথাটা তার কানে গেল, তিনি বললেন, ছিঃ ছিঃ, তিনি বারে আসেন কেন?
কালুবাবু সদ্য আলাপিত মহিমাময়ের হাত ধরে বললেন, আর বলবেন না দাদা, প্রত্যেকদিন রাতে এসে আমাকে জামার কলার ধরে এখান থেকে টেনে বার করে বাড়ি নিয়ে যায়। আজ আপনারা আছেন দাদা, আমাকে একটু রক্ষা করবেন।
জয়দেব ঝিমাচ্ছিলেন, সন্ধ্যা থেকে পেটে কম তরল পদার্থ পড়েনি! কিন্তু তিনি মাতাল হলেও সেয়ানা মাতাল, কালুবাবুর দজ্জাল স্ত্রীর কথা তার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল। মহিমাময়ের ব্যাপারটা ভাল জানা নেই, কারণ তিনি সাধারণত রাত করেন না। কিন্তু জয়দেব জানেন কালুবউদি মধ্যরজনীর বারে এক মূর্তিমতী বিভীষিকা। জয়দেব চট করে গেলাসের অবশিষ্ট পানীয়টুকু গলাধঃকরণ করে মহিমাময়কে বললেন, এই ওঠ। ডিনারের নেমন্তন্নে দেরি হয়ে যাচ্ছে। তারপর মহিমাময়ের হাত ধরে প্রায় হিঁচড়ে বার করে রাস্তায় নেমে এলেন, অসহায় কালুবাবুর ঘাড়ে বিল মেটানোর পুরো দায় ঢেলে দিয়ে।
রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। এখন আবার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। নিঝুম, শীতল পার্ক স্ট্রিট। তবে ভাগ্য ভাল, এখনও দু-একটা ট্যাকসি রয়েছে শেষ সওয়ারির আশায়।
মহিমাময়ের স্ত্রী পিত্রালয়ে গেছেন দুদিনের জন্যে। তবু এত রাত হবে তিনি ভাবেননি। এখন বাড়ি ফিরলে সিঁড়ির নীচে থেকে ঘুমন্ত বুড়ি ঝিটাকে ডেকে তুলে দরজা খোলাতে পুরো পাড়া জেগে যাবে। সুতরাং জয়দেবের সঙ্গে থাকাই মহিমাময় শ্রেয় মনে করলেন। তা ছাড়া অতিরিক্ত মদ্যপান করে তার মনে একটা সাহস এসেছে, চাকরি তুচ্ছ করে আজ তিনি এখন বড়সাহেবের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
সুতরাং জয়দেব এবং মহিমাময় দুজনে এবার ট্যাকসিতে রওনা হলেন বড়সাহেবের বাড়ির ডিনারে। বড়সাহেবের বাড়ি সেই সল্টলেকে। ট্যাকসিওয়ালা কুড়ি টাকা একস্ট্রা চাইল। জয়দেব তাতেই রাজি হলেন। পার্ক স্ট্রিটে আলো ছিল কিন্তু সল্টলেকে এখন গভীর অন্ধকার। লোডশেডিংয়ে ধুকছে উপনগরী।
