অবশ্য এ প্রশ্নের জবাবও সুধানাথবাবু দিয়েছেন। তিনি ধুতি তুলে হাঁটুর কাছে দুটো কালো ফুটকি দেখিয়ে সবাইকে বলছেন, কুমিরের কামড়ের দাগ। ছোটবেলায় মামার বাড়ি বসিরহাটে ইছামতী নদীতে স্নান করতে গিয়ে কুমির ধরেছিল, কুমিরের ব্যাপারে হাড়ে হাড়ে অভিজ্ঞতা আমার।
দুষ্ট লোকে বলছে, ও দাগ তো কুকুরের দাঁতের। গত বছর ইস্কুলের মাঠে বক্তৃতা করার সময় হঠাৎ একটা পাগলা কুকুর মঞ্চে উঠে সুধানাথবাবুর হাঁটু কামড়ে ধরে। বহু লোক সেটা দেখেছে। আবার কেউ কেউ বলছে ফরেনসিক পরীক্ষা করালেই জানা যাবে কুমিরের কামড়ের না কুকুরের দাঁতের দাগ।
মন্ত্রী হওয়ার প্রার্থীর ফরেনসিক চিকিৎসার কোনও বিধি নেই। আগামী সোমবার সুধানাথ মিত্র মন্ত্রী হচ্ছেন। তাঁর আমলে বাংলার খাল-বিল-নদী কুমিরে কুমিরে ভরে উঠুক ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করছি।
পুনশ্চ:
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেল শ্রীযুক্ত সুধানাথ মিত্র মন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমেই রাজ্যের এবং দেশের স্বার্থবিরোধী কুমিরছানা ক্রয়ের গ্লোবাল টেন্ডারটি বাতিল করবেন। পরিবর্তে তিনি সুন্দরবনের কুমিরাঞ্চলে নদী ও খাড়ি থেকে একশোটি নতুন খাল কাটবেন। খাল কাটলেই কুমির আসবে। প্রতিটি খালে যদি অন্তত কুড়িটি করে কুমির প্রবেশ করে তা হলেই দু হাজারের কোটা পূরণ হয়ে যাবে। বিশ্বসংস্থা যদি এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলে যথাসময়ে সে প্রশ্নের রাজনৈতিক মোকাবিলা করা হবে।
স্বর্গের গল্প
যাঁরা ভাবেন স্বর্গে শুধু পুণ্যবানেরা প্রবেশাধিকার পান, পাপীদের সেখানে কোনও স্থান নেই, তাঁরা স্বর্গ সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানেন না।
প্রত্যেক পাপীকে নরকে যাওয়ার আগে কম-বেশি কিছুদিন স্বর্গে থাকতে হয়, তা না হলে তারা কী করে বুঝবে স্বর্গে কী আরাম আর নরকে কী কষ্ট।
বলা বাহুল্য, পাপীদের পক্ষে এই স্বর্গদর্শন প্রায় কন্ডাক্টেড ট্যুরের মতো, চট করে স্বর্গটা দেখিয়ে তাদের নরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শুধু তারতম্যটা বোঝানোর জন্যে, পাপের পরিণতি হৃদয়ঙ্গম করানোর জন্যে।
স্বর্গ বিষয়ে মানুষের অন্যান্য যা ধারণা, সে অবশ্য খুব অলীক নয়। বহু শত শতাব্দীর পুরনো ধারণা এটা, সেই যে-যুগে স্বর্গ এবং মর্তের মধ্যে একটু একটু যাতায়াত ছিল, সেই সময়কার ধারণা, তাই খুব ভুল নয়। এ কথা সত্যি যে স্বর্গের সীমানায় মলয় পবন ছাড়া আর কোনও বাতাস বয় না। নন্দন কাননের। পারিজাত ফুল কোনওদিন মলিন হয় না, ঝরে পড়ে না। স্বর্গের অপ্সরীরা কখনও ক্লান্ত হয় না, তাদের বয়স বাড়ে না, তাদের চঞ্চল চরণে নূপুরধ্বনি কখনও থেমে যায় না বা স্তিমিত হয় না। স্বর্গীয় দ্রাক্ষারসে যে আসব প্রস্তুত হয় তার মাদকতা স্কচ-হুঁইস্কির চেয়ে বহুগুণ বেশি, তার ফেনিল মধুরতার তুলনায় মরপৃথিবীর শ্যাম্পেনের স্বাদ নিতান্ত জোলো ও পানসে।
এসব তবু ঠিক আছে। অনেকেই এসব বিষয়ে অল্পবিস্তর জানেন।
কিন্তু স্বর্গের অন্য একটা ব্যাপার আছে যে সম্পর্কে পৃথিবীর লোকেরা কেউই বিশেষ কিছু জানে। চিন্ময়বাবুও জানতেন না। চিন্ময়বাবু মানে বালিগঞ্জের চিন্ময় রায়। ব্যাপারটা হল স্বর্গের যানবাহন-সংক্রান্ত। পৃথিবীর মতো স্বর্গে ট্রামবাস, ট্যাকসি, রেল, পাতাল রেল, স্টিমার, ফেরিনৌকো, উড়োজাহাজ ইত্যাদি জনসাধারণের এক্তিয়ারভুক্ত কোনও যান চলাচলের ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনও নেই।
তবে জগৎ-সংসারের পোড়খাওয়া, মারখাওয়া মানুষেরা যাই বলুন, ভগবান মোটেই অবিবেচক নন। তিনি স্বর্গে প্রত্যেকের জন্যে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবস্থা রেখেছেন। স্বর্গে পৌঁছানোমাত্র প্রত্যেককে যানবাহন বরাদ্দ করা হয়।
.
আমাদের চিন্ময়বাবু মোটামুটি সচ্চরিত্র লোক। স্বর্গে আসা তার অবধারিত ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পরে তিনি স্বর্গের দরজায় পৌঁছে স্বর্গের দ্বাররক্ষীদের যে সমস্ত প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন সেগুলি খুব রুচিসম্মত বা সম্মানজনক নয়।
ব্যাপারটা অনেকটা ইন্টারভিউয়ের মতো। সুসজ্জিত দ্বাররক্ষীবৃন্দ, আসলে তারাও বড় বড় দেবতা, মণিমুক্তাখচিত ঝলমলে পোশাক ও উষ্ণীষ তাদের, কোমরে সোনার খাপে রুপোর তলোয়ার, পায়ে জরির নাগরা, তাদের দেখলে মনে সমবোধ জাগে।
স্বয়ং ভগবানও এঁদের সঙ্গে রয়েছেন। বলতে গেলে তিনিই ইন্টারভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান। তার সাজপোশাক প্রায় একইরকম, তবে অনেক বেশি উজ্জ্বল, অনেক বেশি মহার্ঘ।
অন্য কোনও বিষয়ে প্রশ্ন তুলে আলোচনায় না গিয়ে চিন্ময় রায়ের নামধাম ইত্যাদি প্রথমে চেক করা হল।
কলকাতার বালিগঞ্জের লোক। চিন্ময় রায় একটা বেসরকারি অফিসে বেশ ভাল চাকরি করতেন। তবে খাওয়া-দাওয়া, পান-ভোজনে সতর্ক ছিলেন না। কাল ছিল শনিবার, কাল রাতে গুরুভোজন করেছিলেন অখাদ্য-কুখাদ্য সব জিনিস, খাসির মাংসের বড়া, গোমাংসের কাবাব, শুয়োরের মাংসের সসেজ, সেই সঙ্গে অপরিমিত মদ্যপান-রাত দুটো হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুর বাড়ি থেকে কোনওরকমে টলতে টলতে রাত আড়াইটে নাগাদ বাড়ি ফিরে ধড়াচূড়ো এমনকি পায়ের জুতো-মোজা সমেত গভীর নিদ্রামগ্ন স্ত্রীর পাশে শুয়ে পড়েন।
ঘুম ভাঙে সকাল সাড়ে চারটের সময়। গলগল করে ঘামছেন, বুকে অসহ্য ব্যথা। পাশে স্ত্রী সর্বজয়া তখন কী এক মধুর স্বপ্ন দেখছেন, তার ঠোঁটে মৃদু হাসি। চিন্ময় সর্বজয়াকে ধাক্কা দিয়ে বললেন, ওগো বুকে বড় ব্যথা।
