হরিনাথবাবু সিক্রেট চিহ্নিত ফাইলটি তার বালিশের তলায় রেখে দিয়ে বললেন, আজকের দিনটা একটু ভাবি। কাল অফিসে যাব ভাবছি, তখনই ফাইলটা নিয়ে যাব।
কিন্তু এমনই দুর্দৈব যে পরের দিন অফিসে ওঠার সময় ওই একই লিফটে সেই তিনতলা ও চারতলার মধ্যে হরিনাথবাবু আবার লোডশেডিংয়ে আটকে গেলেন।
সচিবের কাছে নির্দেশ পেয়ে দপ্তরের প্রধান সহায়িকা গোপালী দেবী এবং মন্ত্রীর আর্দালি ভজন সিং তাঁকে নিয়ে যেতে এসেছিল।
লিফট আটকিয়ে যেতে চোখে অন্ধকার দেখলেন হরিনাথবাবু, দম বন্ধ হয়ে তিনি সটান গড়িয়ে পড়ে গোপালী দেবীর বক্ষলগ্ন হলেন। ঘটনাটা ইচ্ছাকৃত হলে শ্লীলতাহানির মামলা হয়ে যেত।
যা হোক, পাঁচ মিনিট পরে লিফট চালু হল। ছয়তলায় পৌঁছতে ভজন সিং দৌড়ে গিয়ে অফিসের লোকজন ডেকে আড়ল। গোপালী দেবীর বক্ষচ্যুত করে সবাই ধরাধরি করে হরিনাথবাবুকে তার ঘরে নিয়ে গেল।
আবার সেই আরামকেদারা, জলের ঝাপটা। বেশ কিছুক্ষণ পরে সংবিৎ ফিরতে আর্দালিকে ডেকে টেবিলে তুলে রাখা সিক্রেট ফাইলটা তুলে যথাস্থানে কঁপা হাতে সই করে গতদিনের প্রস্তাবটি অনুমোদন করে দিলেন।
তারপর ইজিচেয়ার থেকে নতুন কেনা সরকারি তোয়ালেটা তুলে নিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে কাউকে কিছু না বলে, ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। আর লিফট নয়, এবার সিঁড়ির রেলিং ধরে ধরে জিরিয়ে জিরিয়ে নামতে লাগলেন।
প্রায় আধ ঘণ্টা লাগল, ছয়তলা নামতে। ইতিমধ্যে অফিসে টিফিনের সময় হয়ে গেছে। গোপালী দেবী লিফটের নীচে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে টিফিন সারছিলেন, তার বাঁ হাতে শালপাতায় একটা ডিম সেদ্ধ, ডান হাতে একটা আধখাওয়া সিঙ্গাপুরি কলা। তিনি মাথায় তোয়ালে মোড়া মন্ত্রীকে টলতে টলতে নামতে দেখে তাড়াতাড়ি কলাটা ফেলে দিয়ে আর ডিমটা গলাধঃকরণ করে এগিয়ে গেলেন, স্যার?
প্রায় অজ্ঞান হওয়ার মুখে আবার এসে গিয়েছিলেন হরিনাথবাবু, গোপালী দেবীকে দেখে তিনি পরমাত্মীয়ের মতো জড়িয়ে ধরলেন। গোপালীও তাই চান। তিনি একাধিকবার বিবাহবিচ্ছিন্না, তার প্রাক্তন স্বামীরা এবং বর্তমান প্রেমিকেরা দেখুক মন্ত্রী তাকে জড়িয়ে ধরে হাঁটছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে, সরকারি অফিসের চত্বরে।
গোপালী দেবী ড্রাইভারকে ডেকে মন্ত্রীকে নিয়ে নার্সিংহোমে পৌঁছে দিয়ে এলেন।
এর পরেও হরিনাথবাবু আরও দুয়েকবার অফিস করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গাড়ি করে অফিস পর্যন্ত এসেছেন, তারপর লিফটের সামনে গিয়ে যেই দাঁড়িয়েছেন তার বুক ধড়ফড় শুরু হয়েছে। লিফটের দরজা পর্যন্ত যাওয়ার সাহস পাননি, ফিরে এসেছেন।
খেলোয়াড়, অভিনেতা, চিত্রতারকা, রাজনৈতিক নেতা এঁদের অসুস্থ হওয়ার নিয়ম নেই। এঁরা অসুস্থ, এমন কথা চালু হয়ে গেলে এঁদের পেশা বরবাদ হয়ে যায়।
হরিনাথবাবু প্রথম প্রবেশের দিন যে জ্ঞান হারিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে কেউ খুব মাথা ঘামায়নি। মন্ত্রিত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগদানের দিনে কেউ কেউ অজ্ঞান হতেই পারে। কিন্তু এর পরবর্তী ঘটনা অফিস কর্মী, জনসাধারণ মারফত মিডিয়ার কর্ণগোচর হল।
খবরের কাগজে লেখালেখি শুরু হয়ে গেল।
অসুস্থ হরিনাথ কি মন্ত্রীপদের দায়িত্ব পালনে সক্ষম?
এই সঙ্গে আর একটা খারাপ ব্যাপার যুক্ত হল। হরিনাথবাবুর নার্সিংহোমে কোনও কোনও অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিক তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে যান। তারা দেখেন একজন বোরখা পরা ব্যক্তিকে সকাল-সন্ধ্যা হরিনাথবাবুর ঘরে ঢুকতে ও বেরোতে।
এই ব্যক্তিটি হলেন শান্তি ডাক্তার। কিন্তু বোরখার মধ্যবর্তী সাধারণ উচ্চতার শান্তি ডাক্তারকে রিপোর্টাররা মহিলা বলে ধরে নেন। এবার সংবাদ বেরোয় হরিনাথ মন্ত্রীর ঘরে গোপনে বোরখা পরিহিতা স্বাস্থ্যবতী মহিলাটি কে?
অবশেষে গোপালী দেবীর সঙ্গে জড়াজড়ি করে গাড়িতে চড়ে অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গল্প পল্লবিত হয়ে খবরের কাগজ রসালো সংবাদের সৃষ্টি করল।
এর পরে বিদেশ থেকে কুমিরছানা ক্রয়ের সিদ্ধান্তটি কী করে ফাঁস হয়ে যায়।
অনেকে বলেন, এ সমস্ত ব্যাপারেই সুধানাথবাবুর হাত ছিল। তা থাকুক বা না থাকুক, বিদেশ থেকে মহার্ঘ বিদেশি মুদ্রায় কুমিরছানা কেনার বিষয়টি খবরের কাগজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং জনসাধারণ ভালভাবে নিল না। সুন্দরবনের খালে-বিলে, খাড়িতে যেখান অগুনতি কুমিরছানা কিলবিল করছে, ভুবন বিখ্যাত কুম্ভির বংশের দেশজ কুমিরছানা না কিনে আফ্রিকা থেকে কুমিরছানা কেনার প্রস্তাবের প্রতিবাদে সকলে মুখর হয়ে উঠল।
এর পরে হরিনাথবাবুর আর গত্যন্তর ছিল না। তা ছাড়া লিফটে ওঠার ভয় তার বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়েছিল। দলের ভিতর এবং বাইরে থেকে চাপ আসছিল। হরিনাথবাবু পদত্যাগ করলেন।
হরিনাথবাবুদের দলে মাত্র দুজন এম এল এ, দ্বিতীয়জন হলেন সুধানাথবাবু। স্বাভাবিকভাবেই তার এবার মন্ত্রী হওয়ার কথা। তাদের দলের প্রথম উপদল থেকে হরিনাথবাবু মন্ত্রী হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয় উপদল থেকে সুধানাথবাবুর মন্ত্রী হওয়ার পালা।
তদুপরি রাজনৈতিক দলে চিরাচরিত প্রথা হল যে দল থেকে মন্ত্রী বা এম এল এ অবসর গ্রহণ করেন, পদত্যাগ করেন বা মারা যান, সেই দল থেকেই শূন্যপদ পূরণ করতে হয়।
সুতরাং সুধানাথবাবুই মন্ত্রী হচ্ছেন। দুষ্ট লোকে জিজ্ঞাসা করছে, সুধানাথ মিত্রের তো কুমির বিষয়ে কোনও অভিজ্ঞতা নেই! হরিনাথবাবুরও ছিল না, কিন্তু প্রবীণ হরিনাথবাবুর ক্ষেত্রে এ প্রশ্ন ওঠেনি।
