স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল
ক্ষণকালের ছন্দ
উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল
সেই তারি আনন্দ।
তিনি জানেন এসব গোলমাল বেশিদিন থাকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত যা হবে তাই সবাই গুটিগুটি মেনে নেবে।
এসবের থেকে অনেক বড় সমস্যা আজ কয়েকদিন হল হরিনাথবাবুকে তাড়া করছে। বিশ্ব সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী বছরে অন্তত দুহাজার নবীন কুমির চাই, এক্ষেত্রে নবীন মানে সদ্য জন্মানো।
কুমির প্রকল্পের প্রধান গবেষক, ইতিপূর্বে তিনি সাইবেরিয়ার হাস কেন দশ হাজার কিলোমিটারের বেশি উড়তে পারে না এবং জলহস্তী ও গণ্ডারের ক্রমবিবর্তন, দশ লক্ষ বছরের মধ্যে সব জলহস্তীই গণ্ডার হবে, অন্যথায় সব গণ্ডারই জলহস্তী হয়ে যাবে, এই জাতীয় গবেষণাপত্র সম্পাদনা করেছেন।
গবেষক মহোদয়কে সঙ্গে নিয়ে কুমির প্রকল্পের নবনিযুক্ত সচিব এলেন নার্সিংহোমে মন্ত্রীমহোদয়ের সঙ্গে দেখা করতে। সচিব মানে সেক্রেটারি সাহেব একদা বিখ্যাত ছাত্র, তুখোড় ব্যক্তিত্ব কিন্তু তার একটাই দোষ, তিনি কখনও কিছু না করে শুধু পাতার পর পাতা প্রেমের কবিতা লিখেছেন, ছাত্রজীবনে এক হাজার, চাকরিজীবনে তিন হাজার।
আজ নতুন মন্ত্রীকে শোনানোর জন্যে কবি-সচিব একটি পদ্য লিখে এনেছেন,
কুমিরের সুখদুঃখ
কুমিরের ভালবাসাবাসি।
কুমিরের চোখে অশ্রু
কুমিরের মুখ ভরা হাসি ॥…
বেশ দীর্ঘ কবিতা। কবিতাটি ভালই লাগল হরিনাথবাবুর, তার চেয়ে ভাল লাগল কবি-সচিবকে। শুধু আপত্তি জানালেন কুমিরের চোখে অশ্রু কথাটায়। কুম্ভিরাশ্রু বলে একটা কথা আছে, কথাটা কুমির-বিরোধী, কুমিরের খল চরিত্র প্রকাশ পায়।
সচিব সঙ্গে সঙ্গে সানন্দে কুমিরের চোখে অশ্রু কেটে কুমিরের চোখে মায়া করে দিলেন। হরিনাথবাবু সেটা গ্রহণ করে বললেন, কুমির প্রকল্প নিয়ে পুস্তিকা প্রকাশিত হবে, তার প্রথমেই এই কবিতাটা দিয়ে দেবেন।
এমন তারিফ কবিদের ভাগ্যে সচরাচর জোটে না। কবি-সচিব যেন হাতে চাঁদ পেলেন।
এবার হরিনাথবাবু বললেন, আচ্ছা, ওই কুমির প্রকল্প নামটা কেমন হালকা, ইংরেজিতে ক্রোকোডাইল শব্দটা কেমন জবরদস্ত।
সচিব অভিমত দিলেন, কুম্ভির প্রকল্প করা যায়। কিন্তু কুমির প্রকল্প সহজবোধ্য, আজকাল হালকার যুগ, এই তো ক্যালকাটা, কলিকাতা সব কলকাতা হয়েছে।
হরিনাথবাবুর মাথার মধ্যে অনেক কিছু খেলছিল। তিনি বললেন, আচ্ছা, কুম্ভিলক বলে একটা কথা আছে না।
সচিব হেসে বললেন, তা আছে কিন্তু তার সঙ্গে কুমিরের কোনও সম্পর্ক নেই৷ কুম্ভিলক মানে চোর, লেখা-চোর। লেখা চুরিকে বলে কুম্ভিলকবৃত্তি, মানে অন্যের লেখা চুরি করে লেখা।তারপর হরিনাথবাবুর টেবিলের ওপর একটা বই ছিল, সেই বইটির দিকে তাকিয়ে সচিব বললেন, আপনার ওই তারাপদবাবু, কুম্ভিলক বৃত্তির জন্যে তিনি বিখ্যাত, যত সব অন্যের লেখা টুকে লেখেন।
সেদিনের মতো আলোচনা শেষ হল।
দুদিন পরে সচিব এলেন কুমির প্রকল্পের মূল সমস্যা নিয়ে।
সমস্যাটি গুরুতর। দু হাজার কুমির ছানা পেতে গেলে অন্তত দশ হাজার কুমিরের ডিম লাগবে। কিছু ডিম ফুটবে না, কিছু ডিম পচে যাবে, কিছু ডিম সাপে-শেয়ালে খেয়ে নেবে, কিছু বাচ্চা মরে যাবে। গবেষক জানিয়েছেন পাঁচ: এক অনুপাতে দু হাজার ছানার জন্যে দশ হাজার ডিম লাগবে।
দপ্তরের আশা ছিল সব ডিম সুন্দরবনের খাঁড়িতে যেখানে কুমির কিলবিল করছে সেখানেই পাওয়া যাবে। কিন্তু জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, একটি ডিমও পাওয়া সম্ভব নয়। সব ডিম কলকাতার বড় বড় হোটেল, রেস্তোরাঁয় চালান যায়, সেগুলো সেখানে সুস্বাদু ওমলেট, মোগলাই পরোটা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পুডিং ইত্যাদি খাদ্যে পরিণত হয়।
সব শুনে হরিনাথবাবু মাথায় হাত দিয়ে বললেন, সর্বনাশ! কুমিরের ডিম না পেলে একেবারে বেইজ্জত হয়ে যাব যে!
সচিব বললেন, এর পরে আরও বড় সমস্যা রয়েছে স্যার। দশ হাজার ডিম তা দিয়ে ছানা বার করতে অন্তত একশো মা কুমির লাগবে। সুন্দরবন থেকে কিছু কুমির হয়তো ধরে আনা যাবে, কিন্তু কোনটা মা কুমির, কোনটা বাবা-কুমির…
সচিবকে কথা শেষ করতে দিলেন না মন্ত্রী, তিনি অধীর হয়ে বললেন, তাহলে করবেন কী? সমাধান কিছু ভেবেছেন?
সচিব বললেন, সেই সমাধান নিয়েই আপনার কাছে এসেছি অনুমোদনের জন্যে।
নার্সিংহোমের বারান্দায় প্রকল্পের ডিরেক্টর, ফাইল হাতে বসেছিলেন। সচিব গিয়ে তাঁকে ডাকতে তিনি ফাইল নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
ফাইলে বলা হয়েছে, কুমিরের ডিম অথবা মা কুমির সংগ্রহ করা যখন প্রায় অসম্ভব, সরাসরি হাজার তিনেক কুমিরছানা কিনলেই হবে। এ জন্যে গ্লোবাল টেন্ডার দিতে হবে। মোটামুটি আফ্রিকার এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কুমির-অধ্যুষিত দেশগুলির প্রধান দৈনিকপত্রে কুমিরছানার বিক্রয় প্রস্তাব আহ্বান করা হবে।
প্রস্তাবটি শুনে অনেক রকম ভাবলেন হরিনাথবাবু, যদি বিশ্বসংস্থাটি জানতে পারে যে কুমিরছানার প্রজনন না করে সরাসরি কুমিরছানা কেনা হয়েছে, তার পরিণাম মারাত্মক হতে পারে। কুমির প্রকল্প উঠে যেতে পারে।
মন্ত্রীর সংশয় জানতে পেরে সচিব ও ডিরেক্টর উভয়েই আশ্বস্ত করলেন, সে ভয় নেই। এজেন্সি মারফত লন্ডন কিংবা নিউ ইয়র্ক অফিস থেকে এজেন্সির নাম ঠিকানায় বিজ্ঞাপন হবে। কেউ বুঝতেও পারবে না, কারা কুমিরছানা কিনছে, কেন কিনছে।
