ডাক্তারবাবু এই বোরখা পরে ভিড়ের পাশ কাটিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসেন। ডাক্তারবাবু বেঁটেখাটো মানুষ ডাকাবুকো বিহারি মহিলার বোরখা তার চমৎকার ফিট করে যায়। সেদিন এইভাবেই তিনি প্রাণে বাঁচেন। তারপর থেকে তিনি এই লবণহ্রদেই একটি গেস্ট হাউসে গোপনে ছদ্মনামে অধিষ্ঠান করছেন।
হরিনাথবাবুর শ্যালকের কাছে তার ফোন নম্বর ছিল। তাকে গেস্ট হাউসে ফোন করলে তিনি সব শুনে দ্বিধাগ্রস্তভাবে বললেন, আমি কিন্তু বোরখা পরে যাব। কোথায় কে চিনে ফেলে, ভয়ে আছি!
উত্তর পেলেন, তাই এসো। তবে তাড়াতাড়ি।
ডাক্তার ভদ্রলোক ডা. শান্তিভূষণ রায় সংক্ষেপে ডা. এস বি রায়, এসে সব দেখে বললেন, তেমন কিছু হয়নি। একটু রেস্ট দরকার।
.
হরিনাথবাবুর রেস্টের বন্দোবস্ত হল একটি মহার্ঘ নার্সিংহোমে। তাতে কী আসে যায়, এখন তো তিনি মন্ত্রী, এখন থেকে তার সমস্ত খরচ বহন করবে সরকার।
তিন সপ্তাহের মধ্যে হরিনাথবাবু মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা দমবন্ধ ভয় ঢুকে গেছে। লিফটে আটকিয়ে যাওয়ার কথা মনে হলেই বুকের মধ্যে কেমন ধড়ফড় করে ওঠে। এক একদিন রাতে ঘামতে ঘামতে গোঙাতে গোঙাতে ঘুম ভেঙে লাফিয়ে উঠে পড়েন। সাংঘাতিক দুঃস্বপ্ন দেখেছেন, কারা যেন গলায় ফাঁস দিয়ে বুকের ওপর পাথর, বিশাল একটা দশমনি কালো পাথর, চাপা দিয়ে দিয়েছে।
শান্তি ডাক্তার এখনও সকাল-সন্ধ্যা দুবেলাই আসেন। তার নিজের ভয় এখনও কাটেনি। ঘুমে-জাগরণে সর্বদা তার আশঙ্কা হয় এই বুঝি দলে দলে লোক লাঠি-সোঁটা শাবলবল্লম নিয়ে ছুটে আসছে, যেরকম ছোটবেলায় তাদের দেশের বাড়িতে দেখেছেন, শুয়োর-মারার দল বেরিয়েছে মুখে তাদের বুনো শুয়োরের মতো চাপা চিৎকার, ঘোঁৎ-ঘোঁৎ, ঘোঁৎ-ঘোঁৎ।
ডাক্তারবাবু হাসপাতালে যাওয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন। কোথায় আছেন, কী করছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানাননি। গেস্ট হাউসে নিরিবিলি থাকেন। আর নার্সিংহোমে হরিনাথবাবুকে দেখতে আসেন। এখনও ট্যাক্সি করে, বোরখা পরে যাতায়াত করেন। তিনি কেজো মানুষ, হাতে কোনও কাজ না থাকায় তিনি দুবেলাই হরিনাথবাবুর কেবিনে বেশ কয়েকটা ঘণ্টা কাটিয়ে যান। কিছুটা চিকিৎসা, বাকি সময় কথাবার্তা-আলোচনা। দুই আতঙ্কী পরস্পর ভয় ও স্বপ্ন বিনিময় করেন।
ধীরে ধীরে হরিনাথবাবুর অফিসের লোকজন নার্সিংহোমে আসতে লাগল। তারা কাগজ-পত্র, ফাইল নথি অল্প অল্প করে আনতে লাগল।
নার্সিংহোমের মনঃসমীক্ষক বলেছেন, আতঙ্কের দিক থেকে মনটাকে সরাতে হবে। ধীরে ধীরে কাজকর্ম আরম্ভ করতে হবে। পারলে, অল্প কিছু সময়ের জন্য অফিসে গেলে শরীর ও মন উভয়ের উপকার হবে।
এদিকে যে বিশ্ব প্রতিষ্ঠান কুমির প্রকল্পের জন্য অর্থ সাহায্য করছে, তারা তো বটেই সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এমনকী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রাণিমঙ্গল কমিটি, নিখিল বিশ্ব জলজন্তু বান্ধব সমিতি এই রকম নানা দিক থেকে প্রচণ্ড চাপ আসছে কুমির প্রকল্পের কাজ আরম্ভ করতে।
স্বয়ং মানেকা গান্ধী মন্ত্রী থাকাকালীন দৈনিক একবার করে ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন কুমির প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে। মন্ত্রী অসুস্থ জেনে আমলাদের ধমকেছেন, আপনারা কী করতে আছেন? এখন তো অবস্থা আরও ভয়াবহ, মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পর থেকে মানেকা দৈনিক দুবার-তিনবার ফোন করছেন, কখনও ব্যক্তিগতভাবে, কখনও জীবে প্রেম প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।
কাজ মোটেই কম নয়।
এখন বর্ষাকাল। আগামী শীতের শেষাশেষি বিশ্ব কুমির প্রেমিক ফাউন্ডেশনের (World Crocodile Lovers Foundation) কর্মকর্তারা প্রকল্পের কাজ দেখতে আসবেন। তার আগে বড়দিনের সময় রাজ্যপাল কিংবা অনুরূপ কেউকেটা প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন।
তার আগে সুন্দরবনের গভীরে অন্তত তিনটি কুমিরের হাসপাতাল করতে হবে অসুস্থ এবং বৃদ্ধ কুমিরদের পরিচর্যার জন্যে, গোটা দশেক কুমির প্রসূতিসদন স্থাপন করা হবে বনের মধ্যে খাঁড়ির মুখে।
ইতিমধ্যেই কোথায় কোন ব্লকে, কোন মৌজায় প্রসূতিসদন হবে, হাসপাতাল হবে তাই নিয়ে বাদা এলাকায় রীতিমতো গোলমাল শুরু হয়ে গেছে।
এদিকে মূল কুমির প্রকল্প কোথায় হবে, কোথায় বসবেন এই প্রকল্পের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি, ডিরেক্টর, উপ ডিরেক্টর, সহ ডিরেক্টর, রিসার্চ অফিসার, ইনস্পেক্টর, কেরানি, পিয়ন–এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সর্বসমেত একশো বাহান্নটি পদ মঞ্জুর হয়েছে। সেগুলির নীচের দিকের পদগুলি স্থানীয় ভূমিপুত্রদের দিয়ে পূরণ করতে হবে।
অনেক বাছাবাছির পর শেষ পর্যন্ত কুমিরখালি এবং কুমিরালয় নামে দুটো মোটামুটি গঞ্জ শহর মনোনীত হয়েছে। এর মধ্যে যেকোনও একটিতে প্রকল্পের হেড অফিস হবে।
কোথায় প্রকল্প হবে তা নিয়ে কুমিরখালি এবং কুমিরালয়ের একই দলের দুই এম এল এর মধ্যে জেলা পরিষদের বারান্দায় ছাতাছাতি হয়েছিল। সেই ছাতার লড়াইয়ে একজনের ছাতা ভেঙে যায়, আরও একজনের মাথা ফেটে যায়। এম এল এ বলে পুলিশ এঁদের চালান দেয়নি। কিন্তু সেই ছত্রযুদ্ধের চার কলমব্যাপী ছবি এবং বিশদ বিবরণ খবরের কাগজে বেরিয়েছিল।
হরিনাথবাবু নার্সিংহোমে থাকতে থাকতেই এসব ঘটনা ঘটে। তিনি অবশ্য ধুরন্ধর রাজনীতিক, তিনি জানেন, এসব ক্ষণকালের ব্যাপার। একদা বাংলায় এম এ পড়েছিলেন, তিনি জানেন,
