এখানে কারও কারও মনে এমন সন্দেহ হতে পারে যে আমি হরিনাথবাবু কিংবা সুধানাথবাবু, এঁদের পানদোষ সম্পর্কে কোনও গোলমেলে কথা বলতে যাচ্ছি।
না। সেরকম কোনও তথ্য আমার জানা নেই। এই কাহিনির পক্ষে প্রাসঙ্গিকও নয়। তদুপরি এঁরা নীতিবাদী রাজনৈতিক নেতা, এঁরা নিজেদের আদর্শে ঝুঁদ হয়ে আছেন। এঁরা মদ্যপান করতে যাবেন কোন দুঃখে?
মদ-টদ নয়, আমরা যাচ্ছি একটা সুপরিচিত যন্ত্রের প্রসঙ্গে। লিফট নামক যন্ত্রটি সকলেরই পরিচিত। অনেকেই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে লিফট দিয়ে ওঠানামা করেন। লিফট বহুতল বাড়িতে অপরিহার্য। লিফট ব্যবহারে সিঁড়ি দিয়ে নামা-ওঠার ধকল ও সময় দুই-ই বাঁচে। আমাদের এই কাহিনিতে লিফট খলনায়ক।
লিফট ব্যবহারের একটা সমস্যা আছে। মহামতি শরৎচন্দ্রকে অনুসরণ করে বলতে পারি, যে লিফটে করে ওঠানামা করে, সেই কখনও না কখনও লিফটে আটকিয়ে যায়। নয় সে লিফটে না গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করে। বেশি কথা কী, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মহোদয় স্বয়ং তাঁর খাসতালুক খোদ রাইটার্সে বোধহয় একাধিকবার লিফটবন্দি হয়েছেন।
.
এইবার আসল কথায় ফিরে আসি।
হরিনাথবাবু যথাদিবসে মন্ত্রী হওয়ার শপথ নিলেন। শপথের দিন সুধানাথবাবু তাঁর সঙ্গেই ছিলেন। শপথ নেওয়ার পরে মামুলি চা-পান ইত্যাদি এবং সৌজন্যমূলক আচরণ শেষ করে হরিনাথবাবু সুধানাথবাবু এবং আরও কয়েকজন সহকারে নিজের দপ্তরে এলেন।
নতুন মন্ত্রী। নতুন দপ্তর।
কুমির ডিপার্টমেন্টের জায়গা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র রাইটার্স বিল্ডিং নামক বিশাল প্রাসাদে হয়নি। আরও অনেক দপ্তরের মতো হরিনাথবাবুর দপ্তরেরও স্থান হয়েছে লবণহ্রদ উপনগরীতে নবনির্মিত একটি ভবনে।
ভবনের ছয়তলায় অফিস। তবে অসুবিধে নেই। প্রশস্ত সিঁড়ির পাশেই লিফটের বন্দোবস্ত রয়েছে।
নির্দিষ্ট ভবনে এসে সাঙ্গোপাঙ্গ সহ মাননীয় মন্ত্রী লিফটে উঠলেন। লিফটম্যানের মন্ত্রীমহোদয়কে চিনতে অসুবিধে হয়নি। আজ যে নতুন মন্ত্রী কাজে যোগদান করতে আসছেন, কেয়ারটেকার অফিস থেকে সে খবর তাকে আগেই জানানো হয়েছিল।
সে মন্ত্রীমহোদয়কে সসম্ভ্রমে কুর্নিশ করে চেলা-চামুণ্ডা, সুধানাথবাবু সহ তাঁকে লিফটে তুলল। লিফটে লোকসংখ্যা একটু বেশি, প্রায় ডবল হয়ে গেছে। কিন্তু সবাই মন্ত্রীর সঙ্গী কাউকে নেমে যেতে বলার সাহস লিফটম্যানের নেই।
সবাই ঘেঁষাঘেঁষি দাঁড়িয়ে। লিফট উপরে উঠছে।
নতুন যুগের হালফ্যাশনের লিফট। সাবেকি লিফটে কোলাপসিবল গেট। বাইরেটা দেখা যায়, বাইরে থেকে ভেতরটা দেখা যায়। আলো-বাতাস খেলে।
কিন্তু আধুনিক লিফট। রীতিমতো এয়ারটাইট। কাঠের দরজা বন্ধ হলে বহির্জগৎ থেকে আলাদা হয়ে যায়। প্রাকৃতিক আলো-হাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। ভিতরে অবশ্য বৈদ্যুতিক আলো-পাখা আছে।
সে যা হোক নতুন লিফটে নতুন অফিসে মসৃণভাবেই উঠছিলেন সপারিষদ মন্ত্রীমশায়। কিন্তু তিনতলা অথবা চারতলার কাছাকাছি হঠাৎ কাঁচ করে লিফটটা আটকে গেল। বোধহয় লোডশেডিং, কারণ আলো-পাখাও বন্ধ হয়ে গেল।
হরিনাথবাবু, সুধানাথবাবু এঁরা সব মফসসলি নেতা। খোলা আলোবাতাসের মানুষ। লিফটের স্বল্পপরিসর প্রকোষ্ঠে পনেরো-ষোলোজন লোকের সঙ্গে হরিনাথবাবু দরদর করে ঘামতে লাগলেন। তিনি মোটা মানুষ। হাঁপানির রোগী। গরমে হাঁসফাস করতে লাগলেন।
লিফটম্যান অবশ্য অভয় দিল, ও কিছু নয়। লোডশেডিং। এখনই ডায়নামো চলবে। লিফট চালু হয়ে যাবে।
এই অভয়বাক্যে হরিনাথবাবুর কিন্তু কোনও সুরাহা হল না। তাঁর হাফ শুরু হল। দম বন্ধ হয়ে এল।
সুখের কথা লিফটম্যানের কথার সত্যতা প্রমাণ করে একটু পরেই লিফট আবার চালু হল। আলো জ্বলল, পাখা ঘুরল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লিফট ছয়তলায় নির্দিষ্ট স্থানে এসে থামল। ততক্ষণে হরিনাথবাবুর হয়ে গেছে। তাকে ধরাধরি করে লিফট থেকে বার করে মন্ত্রীর আসনে বসানো হল।
কিন্তু তিনি কেমন এলিয়ে পড়লেন। মন্ত্রীর ঘরের সঙ্গে যুক্ত একটা ছোট বিশ্রামকক্ষ আছে। সেই বিশ্রামকক্ষে একটা আরামকেদারা আছে। একটু পরে তাকে সেখানে নিয়ে অর্ধশায়িত করা হল।
শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের ঠান্ডার মাত্রা বিচক্ষণ আর্দালি নবনিযুক্ত মন্ত্রীর দশা দেখে চরমে তুলে দিল। কিন্তু তবুও হরিনাথবাবু ঘেমে চলেছেন এবং ওফ ওফ করে হাঁফ তুলছেন।
হরিনাথবাবুর শ্যালক সঙ্গেই ছিলেন। তিনি এবার তার নিজের শ্যালককে ফোন করলেন। এই ভদ্রলোক কলকাতায় এক নামী হাসপাতালের প্রথিতযশা চিকিৎসক। সম্প্রতি ডাক্তারবাবুর চিকিৎসাধীন এক এইডসের রোগী তিনতলার জানলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।
এইডসের রোগীরা সাধারণত স্বজনপরিজনহীন একঘরে হয়। এক্ষেত্রেও দীর্ঘ দেড়মাস চিকিৎসা। কালে এই ব্যক্তিকে কেউ দেখতে আসেনি। কিন্তু তার আত্মহত্যার খবর জানার পর তার আত্মীয়পরিজনেরা দলে দলে সমাগত হয়ে হাসপাতালের চত্বর ঘিরে ফেলে। তাদের হাতে হাতে শাবল, লোহার রড, লাঠি হাতবোমা।
তখন আর কোনও উপায় ছিল না। শ্যালকের শ্যালক নিরুপায় ডাক্তারবাবু তার চিকিৎসাধীন। মেটিয়াবুরুজের এক রক্ষণশীলা রমণীর বোরখা চুরি করে সেটা পরে পালিয়ে আসেন। তার আগে অবশ্য মহিলাকে ঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়ে অচেতন করে রেখেছিলেন।
