আসলে মন্ত্রী হওয়ার সুধাবাবুর কোনও কথাই ছিল না। তিনি অবশ্য পুরনো এম এল এ তিনবার ভোটে লড়ে দুবার জিতেছেন, এবার সমেত।
এম এল এ অনেকেই হয়। সারা ভারতে অন্তত হাজার পাঁচেক এম এল এ আছে, প্রাক্তন এম এল এর সংখ্যা তা পঁচিশ-পঞ্চাশ হাজার হতে পারে।
কিন্তু সুধানাথ মিত্র সাধারণ রাজনৈতিক নেতা ননয়। এম এল এ থাকাকালীন এবং তার আগে ও পরে, মফসসলে থাকা সত্ত্বেও তিনি বহুবার দূরদর্শন সমেত খবরের কাগজ এমনকী দিশি-বিলিতি ইংরেজি পত্র-পত্রিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর সম্পর্কে এদিক ওদিকে অনেক আলোচনা হয়। ও হয়েছে।
একবার চিনির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে তিনি তার এলাকায় একটি সরকারি মিটিংয়ে মন্ত্রী, সভাধিপতি, জেলাশাসক সমেত সমবেত অতিথিদের না জানিয়ে নুন-চা খাইয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, সবাই সোনামুখ করে সে চা খেয়েছিলেন, কেউ কোনও প্রশ্ন করেননি, চিনির বদলে নুন কেন, জানতে চাননি।
পরদিন সুধানাথবাবুর বক্তব্য কাগজে বেরিয়েছিল, পঞ্চাশ গ্রাম নুনে পাঁচশো গ্রাম চিনির কাজ হয়ে যায়, আমরা এরপর থেকে চিনি না খেয়ে শুধু নুন খাব। নুনের দামও কম।
নুন না চিনি?
এই রকম হেডলাইন দিয়ে বাংলা কাগজগুলিতে পরদিন দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
কোনও কোনও কাগজে বেশি নুন খেলে রক্তচাপ বাড়বে কি না, বেশি চিনি খেলে রক্তে শর্করা বৃদ্ধি হবে কি না, এই নিয়ে প্রথিতযশা চিকিৎসকেরা দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন।
অন্য একবার এক আন্তর্জাতিক ব্যাপারে, দক্ষিণ আফ্রিকায় গণধর্ষণের প্রতিবাদে সুধানাথবাবু নিকটবর্তী হাইওয়ে অবরোধ করেছিলেন। এলাকার যত গবাদি পশু, গোরু-মোষ, ষাঁড়-বলদ এমনকী পাঁঠা-ছাগল পর্যন্ত এনে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেন। প্রচুর খড়-বিচালি এবং ঘাসের বন্দোবস্ত হয়েছিল। ফলে হাইওয়ের প্রায় পাঁচশো মিটার এলাকা গোহাটের চেহারা ধারণ করে। বাস, ট্রাক, গাড়ি দূরের কথা অটো যাতায়াত পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।
সংবাদ পেয়ে সদর থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসেন। তিনি চৌখস লোক। তিনি সর্বসমক্ষে সুধানাথবাবুকে কথা দেন যে ভবিষ্যতে যাতে এরকম না হয় তার জন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।
এহেন সুধানাথবাবু এতটা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এবং পুরনো এম এল এ হলেও মন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল না।
অবশ্য তিনি যে-দলের সদস্য সে-দল শাসক গোষ্ঠীর অন্তর্গত। তা ছাড়া তিনি তার দলের মধ্যেকার দ্বিতীয় উপদলের লোক। দলের কর্তামি মোটামুটি প্রথম উপদলই করে থাকে।
প্রথম উপদলের প্রবীণ নেতা হরিনাথবাবুই দল-প্রধান। তিনিও এম এল এ।
তবে প্রথম প্রথম হরিনাথবাবু অর্থাৎ হরিনাথ চাকলাদারও অবশ্য মন্ত্রী ছিলেন না।
হরিনাথবাবু বা সুধানাথবাবু যে রাজনৈতিক মতে বিশ্বাস করেন, সেই মতবাদে ঈশ্বর বা ভাগ্যের কোনও ঠাই নেই। কিন্তু হরিনাথবাবু সেবার জনগণের আগ্রহের আতিশয্যে একটি শ্রীশ্রীসন্তোষী মায়ের পুজোর উদ্বোধন করেছিলেন।
এর অব্যবহিত পরে শ্রীশ্রীসন্তোষী মায়ের দয়াতেই হোক বা ভাগ্যবলেই হোক, একটা ব্যাপার ঘটে।
একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন দেশে কুমির প্রকল্প খাতে বহু লাখ ডলার মানে বহু কোটি টাকা অনুদান আসে। কুমির প্রকল্পের কাজ মোটামুটি কুমির নিধন বন্ধ করা, জীবিত কুমিরদের সুস্থ দেহে বাঁচিয়ে রাখা, কুমিরদের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করা।
কিন্তু কুমির প্রকল্পের বিশাল টাকার কথা জানার পরে বিভিন্ন মন্ত্রীর মধ্যে নানা রকম বাদবিতণ্ডা এবং মনোমালিন্য দেখা দিল। বনদপ্তর বললেন, কুমির প্রকল্প আমাদের। মৎস্য দপ্তর দাবি জানালেন, কুমির হল জলজন্তু, মাছের মধ্যেই পড়বে। প্রাণিকল্যাণ বিভাগের বক্তব্য খুব জোরালো, কুমিরের দেখভাল করার অধিকার একমাত্র তাদেরই। অবশেষে পঞ্চায়েত বিভাগ এবং জলসেচ বিভাগও একই রকম দাবি পেশ করলেন।
গোলমালের ভয় দেখে স্থিতধী রাজনৈতিক নেতারা বহু আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিলেন নতুন কোনও মন্ত্রীর অধীনে নতুন শাখা খোলা হবে, কুমির দপ্তর। ডিপার্টমেন্ট অফ ক্রোকোডাইলস।
এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হল। কুমির প্রকল্প প্রার্থী বিভিন্ন মন্ত্রীর মধ্যে কাজিয়া থামল। আবার হরিনাথবাবুদের দল থেকে একজনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া গেল। উচ্চতম পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে খবর ছিল যে মন্ত্রিসভায় স্থান না পেয়ে হরিনাথবাবুদের দল চাপা রাগে ধুকছে। যেকোনও সময়ে বিদ্রোহী হতে পারে।
হঠাৎ রাতারাতি নতুন দপ্তর সৃষ্টি হয়ে গেল। হরিনাথবাবু মন্ত্রী হয়ে গেলেন। সুধানাথবাবু মন্ত্রী হওয়ার আশা করেননি। সুতরাং তাঁর ক্ষুব্ধ হওয়ার কোনও কারণ ছিল না। বরং এই খবর জানার পর তিনি একটি দামি ফাউন্টেন পেন উপহার দিয়ে হরিনাথবাবুকে অভিনন্দন জানালেন। হরিনাথবাবুও হৃষ্টচিত্তে সেই উপহার গ্রহণ করলেন।
কিন্তু হরিনাথবাবুর কপালে এই সৌভাগ্য দীর্ঘস্থায়ী হল না। যে কারণে এরকম হল সেটা কারও কারও কাছে হাস্যকর মনে হলেও হরিনাথবাবুর পক্ষে ভয়াবহ।
.
ঘটনাটা পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন।
শরৎচন্দ্র তার এক বিখ্যাত উপন্যাসে এরকম লিখেছিলেন যে, যে মদ খায় সেই কখনও না কখনও মাতাল হয়, না হলে সে মদের বদলে জল খায়।
হয়তো আমার উপস্থাপনে একটু এদিক ওদিক হয়ে গেল। কিন্তু বক্তব্য এই রকমই। বহু পরিচিত এই বাক্যটি শরৎচন্দ্রের পাঠকেরা ভালই জানেন।
