স্থূলকায়া একজন অবসরপ্রাপ্ত নার্স রিসেপশনে বসেন, তিনি জানালেন, সার্জন সাহেব তো এ বেলা আসবেন না। বিকেলে একটা হার্নিয়া অপারেশন আছে, পাঁচটা নাগাদ আসবেন।
গুডবাই থেকে সুটকেস হাতে আবার রাস্তায় নেমে পড়লেন দিগন্তবাবু। বেলা প্রায় একটা বাজে। চারদিকে গনগনে গরম, কাঠফাটা রোদে চোখ ঝলসে যাচ্ছে। তিনি ঠিক করলেন এসেছেনই যখন অন্তত একবার ডাক্তার লোকনাথ দত্তের বাড়িতে গিয়ে জয়দেবের ব্যাপারটা খোঁজ নিয়ে যাবেন। যদিও বেলা একটায় কারও বাড়িতে যাওয়া সঙ্গত নয়, কী আর করা যাবে–তা ছাড়া লোকনাথ দত্ত একসময়ের চেনা।
কাছাকাছি কোথাও কোনও ট্যাকসি নেই। সুটকেস হাতে রোদে হেঁটে ঘামতে ঘামতে দিগন্ত বড় রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালেন। ট্যাকসি এখানেও নেই। একটা সামান্য খালি মিনিবাস এলে সেটায় উঠলেন। মহিমার চিঠিতে ঠিকানাটা ছিল ডাক্তার দত্তের। এখান থেকে বেশি দূরে না, ভি আই পি রোডে উলটোডাঙার মোড়ের কাছে ডাক্তার দত্ত থাকেন।
মিনিবাস থেকে নেমে একটু খুঁজতেই বাসাটা পাওয়া গেল। বাইরের দরজায় পুরনো ঢঙের পিতলের নেমপ্লেটে ঝকঝকে অক্ষরে নামটা লেখা রয়েছে–ডক্টর এল এন দত্ত এম বি বি এস। আর নীচে চিঠির নীচের পুনশ্চের মতো কাঠের নেমপ্লেটে এম এস এবং আরও দশটি ইংরেজি অক্ষর। বোঝা গেল পিতলের নেমপ্লেট বানানোর পরে এই উপাধিগুলো আয়ত্ত হয়েছে।
কিন্তু দিগন্তবাবুর ভাগ্য আজ ভাল নয়।
সার্জন সাহেব বাড়ি নেই। ডক্টরের ঘরে একটি ফুটফুটে মেয়ে, বয়েস নয়-দশ বছর হবে, সোফার ওপরে উবু হয়ে বসে আপনমনে একটা বড় ড্রয়িংখাতায় একটা লালরঙের বাঘের ছবি আঁকছিল। দিগন্তবাবু দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে সে তাড়াতাড়ি বাঘের মুখে কয়েকটা নীল রঙের গোঁফ এঁকে দিয়ে তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
দিগন্তবাবু প্রশ্ন করলেন, সার্জন সাহেব বাড়ি আছেন?
লাল রিবন বাঁধা চুলের বেণী সমেত পুরো মাথাটা নেড়ে মেয়েটি বলল, না, নেই।
দিগন্তবাবু ভাবললেন একটু বসে গেলে হয়, হয়তো আসতে দেরি হবে না, তাই মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি সার্জন দত্তের মেয়ে?
মেয়েটি বলল, হ্যাঁ। এবং দিগন্তবাবু জিজ্ঞাসা করার আগেই বলল, আমার নাম নীলাম্বরী দত্ত। বাবা বলে নীলা, মা বলে নীলু।
মেয়েটিকে বেশ সাব্যস্ত মনে হল দিগন্তবাবুর। তিনি তাকে বললেন, দ্যাখো নীলাম্বরী, আমি তোমার বাবার একজন পুরনো বন্ধু। এখন দিল্লিতে থাকি, অনেকদিন দেখাশোনা নেই। একটা ব্যাপারে তোমার বাবার কাছে একটু খোঁজ নিতে এসেছিলাম।
নীলাম্বরী বলল, কিন্তু বাবা তো এখন আসবে না। বাবা গেছে ডাক্তার চক্রবর্তীর নার্সিং হোমে। সেখানে একটা অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন আছে।
এইটুকু মেয়ের মুখে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের মতো জটিল শব্দের উচ্চারণ শুনে একটু চমকিত হলেন দিগন্তবাবু। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তা কতক্ষণ লাগবে মনে হয়?
নীলাম্বরী বলল, যদি ফেটে-টেটে গিয়ে না থাকে তা হলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাবার কাজ সারা হয়ে যাবে।
এই শুনে দিগন্তবাবু বললেন, তা হলে আসতে দেরি হওয়ার কথা নয়।
নীলাম্বরী বলল, পাগল নাকি! বাবার কি একটা অপারেশন? সকালে একটা করেছে, তারপর বাড়ি এসে জলখাবার খেয়ে এই অপারেশনটা করতে গেছে। অপারেশনের পরে ডাক্তার চক্রবর্তীর বাড়িতে দুপুরের ভাত খাবে। তারপর সেখান থেকে যাবে দমদম।
অন্যমনস্কভাবে দিগন্তবাবু বললেন, দমদম!
নীলাম্বরী বলল, দমদম সেবায়তনে একটা আলসারের অপারেশন আছে। রোগী বুড়ো, তার আবার হার্ট ভাল নয়।
নীলাম্বরীর মুখে এরকম সব কঠিন কথা শুনে এতক্ষণ দিগন্তবাবু বেশ কৌতুকবোধ করছিলেন, জিজ্ঞাসা করলেন, তার পরে?
নীলাম্বরী বলল, তারপরে ওই গুডবাই নার্সিংহোম, বেলেঘাটায়। সেটায় হয়তো তেমন সময় লাগবে না হার্নিয়া অপারেশন।
এসব শুনে দিগন্তবাবু বুঝতে পারলেন এখানে এখন আর অপেক্ষা করার মানে হয় না। তার চেয়ে মহিমার একটা খোঁজ করলে হয়। তার কাছে যদি কিছু জানা যায়।
সুটকেস নিয়ে রাস্তায় বেরোতে বেরোতে তিনি দেখলেন নীলাম্বরী তাঁর পিছনে পিছনে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে। একটু থেমে দাঁড়িয়ে তিনি নীলাম্বরীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি যে এত সব কঠিন অসুখের নাম করলে, যেগুলো তোমার বাবা অপারেশন করছে, সেগুলো কী ব্যাপার তুমি জানো কি?
নির্বিকার মুখে নীলাম্বরী বলল, হা জানি। অ্যাপেন্ডিসাইটিস সাধারণ হলে এক হাজার টাকা, আলসার দেড় হাজার টাকা, হার্নিয়া সাড়ে সাতশো টাকা।
উত্তর শুনে হতভম্ব হয়ে দিগন্তবাবু রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। বাইরে রোদের তাপ আরও চড়া। রাস্তায় ধোঁয়া উঠছে। এই রোদে জয়দেব কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে। আর খোঁজ করে লাভ নেই। একটা ট্যাকসি হাতের কাছে পেয়ে গেলেন, সেটা ধরে সোজা এয়ারপোর্টে।
সুধানাথবাবু মন্ত্রী হলেন
সুধানাথবাবু কখনও আশা করেননি যে তিনি মন্ত্রী হবেন। এমনকী তার পরিচিতজনেরা যারা কখনও কখনও তাঁকে স্নেহচ্ছলে বোকা-সুধা বলে, অবশ্য তার অগোচরে, তাঁরাও ভাবেননি যে তিনি মন্ত্রী হবেন।
সুধাবাবু, আমাদের সুধানাথ মিত্র একটা স্কুলে মাস্টারি করতেন, মন্ত্রী হওয়ার পরেও স্কুলের হাজিরা খাতায় তার নাম রেখে দিচ্ছেন, অর্থাৎ মন্ত্রিত্ব ছেড়ে যেকোনও সময় মাস্টারিতে ফিরে যেতে পারেন। তাকে যারা বোকা-সুধা বলে তারাই বোকা।
