তা ছাড়া দিগন্তবাবুর একদিন পরে মনে পড়ল, তাদের পুরনো ভবানীপুরের পাড়ায় বলহরি ডাক্তারের কথা। বলহরি নাম হওয়া সত্ত্বেও তার রোগীর কোনও অভাব হত না। বলহরি ডাক্তারের ডিসপেনসারি সর্বদাই লোকের ভিড়ে গমগম করত।
পাটনা থেকে একবেলার জন্যে কলকাতায় এলেন দিগন্তবাবু, একটু জয়দেবের ব্যাপারটা খোঁজ নেবার জন্যে। ঠিক কী হয়েছে, কী চিকিৎসা চলছে।
তবে মহিমার চিঠিতেই দিগন্তবাবু জানতে পেরেছিলেন তাদের এক পুরনো বন্ধু, ডাক্তার লোকনাথ দত্ত, যিনি সার্জন হিসাবে আজ কিছুদিন হল বেশ নাম করেছেন, তাঁরই তত্ত্বাবধানে আছে জয়দেব। গুডবাই নার্সিংহোমের সঙ্গেও ডাক্তার লোকনাথ দত্ত জড়িত রয়েছেন। রোগীরা অনেকে এখানেই ভরতি হয়, এখানেই লোকনাথ তাদের অপারেশন করেন।
পাটনা থেকে রাত্রির ট্রেনে উঠে সকালে এসে কলকাতায় পৌঁছেছেন দিগন্ত। বিকেলের প্লেনে দিল্লি ফিরবেন। হাতে সময় খুব কম। তাও আবার ট্রেনটা হাওড়ায় আসতে তিন ঘণ্টা লেট হয়েছে।
কলকাতায় পৌঁছে হাওড়া স্টেশন থেকে প্রথমেই মহিমাকে একটা ফোন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পেলেন না, হয় হাওড়া স্টেশনের ফোনটা খারাপ, না হয় মহিমার ফোন খারাপ। অথবা দুটোই খারাপ।
সে যা হোক, ফোন করা নিয়ে বেশিক্ষণ সময় নষ্ট না করে একটা ট্যাকসি নিলেন। ফোন করার চেয়ে হাওড়া স্টেশনে ট্যাকসি ধরা কঠিন নয়। প্রায় আধ ঘণ্টা চেষ্টার পর বহুকষ্টে এবং মিটারের ওপর পনেরো টাকা বেশি দেবেন কবুল করে শেয়ালদা পাড়ায় একটা পুরনো হোটেলে এসে উঠলেন। রাত্রিবাস করতে হচ্ছে না, হোটেলের দরকার তেমন নেই, তবু স্নান-খাওয়া করার জন্যে আর যদি ফোন-টোন করা যায় সেই উদ্দেশ্যে একদিনের জন্যে ষাট টাকা ভাড়ায় একটা ঘর নিলেন। তারপর স্নান-টান সেরে মুখে দুটি ভাত দিয়ে দিগন্ত রাস্তায় বেরোলেন। এর মধ্যে হোটেলের ম্যানেজারের ঘর থেকে আরেকবার মহিমাকে এবং সেই সঙ্গে গুডবাই নার্সিংহোমে ফোন করার বৃথা চেষ্টা করেছিলেন। কাউকে অবশ্য পাননি, তবে এর মধ্যে ক্রস কানেকশনে একটি চাঞ্চল্যকর কথোপকথন শুনতে পান। ভেজাল তেল খেয়ে সদ্য পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক রোগীকে অভিজ্ঞ পক্ষাঘাতগ্রস্ত দ্বিতীয় এক রোগী কীভাবে দেয়াল ধরে হাঁটতে হয় নির্দেশ দিচ্ছিলেন, সেটা শুনে দিগন্ত চমকৃত হন এবং ভবিষ্যতে যদি সত্যি কখনও পক্ষাঘাত হয় সেই জন্যে এই নির্দেশাবলি তিনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন। বেশ কিছুক্ষণ লেগেছিল শুনতে, ফলে হোটেল ম্যানেজারের কেমন সন্দেহ হয় যে এটা রং নম্বর নয়, দিগন্তবাবু কথা বলছেন না শুধু শুনছেন, রং নম্বর বলে টেলিফোনের খরচ কাটিয়ে দেবেন বলে। ফলে কিঞ্চিৎ অপমানিত হয়ে দিগন্তবাবুকে ফোনের জন্যে দেড় টাকা দিতে হয়। এরপরে তিনি রাগ করে তখনই তার ছোট সুটকেসটা যেটা হোটেলে রেখেছিলেন সেটা হোটেল থেকে নিয়ে রাস্তায় সরাসরি বেরিয়ে পড়লেন।
রাস্তায় নেমে আবার বহুকষ্টে ট্যাকসি। মহিমার চিঠিতে দুটো ঠিকানা আর ফোন নম্বর দেওয়া আছে, একটা গুডবাই নার্সিংহোমের অন্যটা ডাক্তার লোকনাথ দত্তের। মহিমার ইনল্যান্ড লেটারটা খুলে ডাক্তার লোকনাথ দত্তের ঠিকানা আর ফোন নম্বর চোখে পড়তে দিগন্তের মনে হল একবার ডাক্তার দত্তকে ফোনে ধরতে পারলে হত। কিন্তু কোথায় ফোন করতে যাবেন, আর ফোন পাবেন কি না এই সব ভেবে নিরস্ত হলেন।
একটু খুঁজে বেলেঘাটায় সি আই টি রোডের ধারে গুডবাই নার্সিংহোম পাওয়া গেল। সাইনবোর্ডটা দেখে একটু বিস্মিত হলেন দিগন্ত, একটু কৌতুকও বোধ করলেন। গুডবাই নার্সিংহোম নয়, গুডবাই ম্যাটারনিটি হোম, ঠিকানা মিলিয়ে দেখলেন ঠিকই আছে। মানে জয়দেব এখানেই ভরতি হয়েছে। কিন্তু ম্যাটারনিটি হোমে আলসারের কী চিকিৎসা হবে! শুধু জয়দেবের পক্ষেই এ কাজ করা সম্ভব।
অবশ্য ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দিগন্ত জানতে পারলেন যে ম্যাটারনিটি হোম হলেও যখন প্রসূতির সংখ্যা কম থাকে ছোটবড় চিকিৎসা বা অপারেশনের জন্যে অন্য রোগীও নেওয়া হয়।
সে ঠিক আছে, কিন্তু ম্যাটারনিটি হোমে জয়দেবের পাত্তা পাওয়া গেল না। জানা গেল, জয়দেব বাবু এখানেই চিকিৎসার জন্যে এসেছে বটে কিন্তু তিনি প্রতিদিন সকালবেলা বেরিয়ে যান আর ফেরেন অনেক রাতে। এর মধ্যে আবার দুদিন রাতেই আসেননি।
জয়দেবের স্বভাব দিগন্তবাবুর জানা আছে। তিনি এ খবরে মোটেই বিস্মিত হলেন না, বরং এই ভেবে আশ্বস্ত বোধ করলেন যে জয়দেবের শরীরের অবস্থা খুব খারাপ নয়–তা হলে এত চলাফেরা করতে পারত না।
গুডবাইয়ের লোকেদের কাছে দিগন্ত জানার চেষ্টা করলেন, জয়দেবের শারীরিক অবস্থা এখন সত্যি কীরকম। তারা বললেন, সে বলা অসম্ভব। ভাল করে পরীক্ষাই করা যাচ্ছে না, জয়দেবকে ধরাই কঠিন। তবে ডাক্তার এল এন দত্ত দেখেছেন, তিনি সম্ভবত অপারেশন করবেন। তার কাছে জানা যেতে পারে।
দিগন্ত বুঝতে পারলেন এল এন দত্ত মানে লোকনাথ দত্ত, তাদের পূর্বপরিচিত বন্ধুস্থানীয় ডাক্তার। এখন সার্জন হিসেবে বেশ নাম হয়েছে। মহিমার চিঠিতে সে কথা আগেই জেনেছেন।
দিগন্তবাবু গুডবাইয়ের রিসেপশনে বললেন, আমি জয়দেববাবুর পুরনো বন্ধু, দিল্লি থেকে এসেছি, সার্জন দত্তও হয়তো আমাকে চিনবেন। সার্জন সাহেবের সঙ্গে আমি একটু দেখা করতে চাই।
