বছর পাঁচেকের মধ্যে কলকাতায় আসা হয়নি। শেষবার যখন এসেছিলেন সেও খুব অল্প সময়ের জন্য। অফিসের একটা কাজ ছিল, শুক্রবার এসেছিলেন, সে দিনটা অফিসের ব্যাপারে গেল, তারপর দুদিন শনিবার রবিবার ছুটি ছিল, সেই দুটো দিন কলকাতায় কাটিয়ে সোমবার ভোরের বিমানে দিল্লি ফিরেছিলেন দিগন্ত।
ওই ছুটির দিন দুটোয় বন্ধুবান্ধব একটু জমায়েত করে আগের মতো হই-হুঁল্লোড় করার ইচ্ছে ছিল তার। দুঃখের কথা সেবার তার সে আশা পূর্ণ হয়নি। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সম্ভব হল না। কারও কারও ঠিকানা বদল হয়েছে। যাদের টেলিফোন আছে তাদেরও টেলিফোন নম্বর বদলিয়ে গেছে কিংবা টেলিফোন বাজেনি। বাজলেও ভুল বেজেছে, কেউ ধরেনি কিংবা যে ধরেছে সে অন্য লোক, ফোন তুলে নম্বর শুনে বিজাতীয় ভাষায় ধমকিয়ে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত তবু কয়েকজনের সঙ্গে সংযোগ করা গিয়েছিল, কিন্তু তাদের মধ্যেও কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব। কলকাতায় যে সরকারি অতিথিশালায় দিগন্তবাবু ওঠেন, লোয়ার সার্কুলার রোডের সেই বাড়িতে বন্ধুদের শনিবার সন্ধ্যাবেলায় নিমন্ত্রণ করেছিলেন তিনি। ইচ্ছে ছিল সবাই এলে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে তারপর কাছাকাছি কোনও একটা জায়গায় গিয়ে কিঞ্চিৎ পানভোজন করবেন।
কিন্তু কেউই প্রায় এল না। শুধু মহিমাময় এসেছিল। সেও সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ উঠি উঠি করতে লাগল। একেবারে জমল না ব্যাপারটা। আটটা নাগাদ বন্ধুকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিগন্তবাবু একটা সিনেমা দেখতে একাই বেরিয়ে গেলেন।
সিনেমা ভাঙার পর অতিথিশালায় এসে দেখেন বেশ হইচই হচ্ছে। তার অন্য এক পুরনো বন্ধু। জয়দেব, তারও সন্ধ্যাবেলা আসার কথা ছিল, তখন আসেনি, এখন সঙ্গে তিনজন সম্পূর্ণ অন্য লোক। নিয়ে, চারজনেরই সম্পূর্ণ টালমাটাল অবস্থা, অতিথিশালার ঘরে ঘরে ধাক্কা দিয়ে মিস্টার দিগন্ত রায়চৌধুরীকে খুঁজছে।
প্রায় মধ্যরাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সবাইকে ঘুম ভাঙিয়ে ওরা চারজন স্থলিতচরণে এবং জড়িত কণ্ঠে রীতিমতো তত্ত্বতালাসি চালাচ্ছে তার জন্য।
লম্বা টানা বারান্দার দুপাশে সারি দেওয়া ঘর। প্রায় প্রতিটি ঘরেই অতিথি রয়েছে, তাঁদের মধ্যে দরজার ফাঁক দিয়ে সদ্যজাগ্রতা বিস্ৰস্তবসনা মহিলাও রয়েছেন, তারা আলো জ্বালিয়ে জেগে উঠে বসেছেন। পর্যায়ক্রমে জয়দেব ও তার বন্ধুরা দিগন্ত, দিগন্তবাবু, মিস্টার রায়চৌধুরী, রায়চৌধুরী। মশায় ইত্যাদি নানা সম্বোধনে ঘরে ঘরে করাঘাত করে তাঁকে খুঁজছে এবং কোনও ঘরেই পাচ্ছে না–আর সব ঘরেই সরি, ভেরি সরি, খুব দুঃখিত, মাফ কিজিয়ে ইত্যাদি নানা ভাষায় মদ্যপজনোচিত ক্ষমাপ্রার্থনা করছে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে এই দৃশ্য দেখে দিগন্ত প্রথমে ভেবেছিলেন আত্মগোপন করবেন। মাতালের গোঁ বড়জোর দশ মিনিট থাকে। সুতরাং কিছুক্ষণ উলটো দিকের ফুটপাতে পায়চারি করলেই বিড়ম্বনার হাত থেকে অনায়াসে রক্ষা পাওয়া যাবে।
দিগন্ত রায়চৌধুরী তাই করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মনে হল এই দেড় দশকে কলকাতা শহর অনেক বদলিয়ে গিয়েছে, অনেক পরিবর্তন হয়েছে এই শহরের তার চেনাজানা। লোকেদের মধ্যে। এই তো সন্ধ্যাবেলা মহিমাময় এসেছিল, আগে কী আড্ডাবাজ ছিল, জয়দেবের এককাঠি ওপরে, এখন কেমন হয়ে গেছে। শুধু জয়দেব, একমাত্র জয়দেব আগের মতো আছে। একমাত্র সেই এখনও পুরনো বন্ধুদের খোঁজে মধ্যরাতে তোলপাড় করে। কুড়ি বছর আগের জয়দেবের নানা গল্প দিগন্তের মনে পড়ল। একবার তার জন্ডিস হয়েছিল। পি জি হাসপাতালের দোতলায় একটা ওয়ার্ডে ছিলেন, সেখানে রাত আড়াইটার সময় আজকের মতোই সেদিন। জয়দেবের সদল অনুপ্রবেশ। আরেকবার জয়দেবের সঙ্গে শান্তিনিকেতন যাওয়ার কথা। ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত জয়দেব এল না। তারপর ট্রেন যখন বেশ জোরগতিতে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ অন্ধকার থেকে ভূতের মতো এক লাফ দিয়ে জীবন বিপন্ন করে জয়দেব কামরায় উঠল।
অনেক দূরে একটা নতুন হোটেলের কার্নিশ থেকে একটা সাবানের রঙিন বিজ্ঞাপন একবার নীল হচ্ছে, একবার লাল হচ্ছে, একবার পুরো অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। যে কোনও শহরে যে কোনও রাতে এরকম হয়ে থাকে। এখন রঙিন আলোর ওই নেবা-জ্বলার দিকে তাকিয়ে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ল দিগন্ত রায়চৌধুরীর। তিনি আর দেরি করলেন না, দ্রুতপদে সিঁড়ি দিয়ে উঠে মাতাল-ত্রয়ীর বেষ্টনী ভেদ করে জয়দেবকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন।
এ অবশ্য পাঁচ বছরের পুরনো ঘটনা। গত পাঁচ বছরে দিগন্তবাবুর আর কলকাতা আসা হয়নি। এবারও আসার কথা ছিল না। একটা কাজে পাটনা এসেছিলেন। আসার কয়েকদিন আগে বন্ধু মহিমাময় অর্থাৎ মহিমার কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছিলেন দিল্লিতে। পুরনোদের মধ্যে ওই মহিমাই এখনও সময়ে অসময়ে যোগাযোগ রাখে। মহিমা লিখেছে, জয়দেবের শরীর খারাপ। খুব সম্ভব পেটে আলসার। গুডবাই নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছে, সেখানেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এখনও সব জানা যায়নি।
এ চিঠি পেয়ে একটু দ্বিধায় পড়েছিলেন দিগন্তবাবু। তাঁর প্রথম খটকা লেগেছিল এই চিন্তা করে যে, কোনও নার্সিংহোমের নাম গুডবাই নার্সিংহোম হওয়া উচিত কিনা। এবং যদি এরকম নামই। হয়, তা হলে সেখানে কারও ভর্তি হওয়া উচিত কিনা। তবে জয়দেবের ব্যাপারই আলাদা।
