আজও রামদিনের এর মধ্যেই স্নান সারা হয়ে গেছে। সুতরাং দিগম্বরবাবুর সুবিধেই হল। সোজা রামদিনকে নিয়ে তেতলার ছাদে তুলসীমঞ্চের পাশে সাধনা করতে বসে গেলেন। আর রামদিনকে বললেন, এতে তোমার সুবিধেই হবে। তুমি যে অত লোটাভর্তি ভাঙ খাও আর গুণ্ডাদের কাছ থেকে তোলা আদায় করো, তোমার শোধন হওয়া ভাল।
বিশাল বপু এবং বিশালতর উদর নিয়ে রামদিনের পক্ষে শোয়া-বসাই কঠিন, আজ বড় দারোগার আদেশে সে যখন প্রাণায়াম করার জন্যে জোড়াসনে বসতে গেল একদম উলটিয়ে মুখ থুবড়ে তুলসীমঞ্চের উপরে পড়ে গেল। তার বিরাট শরীরের পতনের ধাক্কায় পুরো থানাবাড়িটা থরথর করে কেঁপে উঠল।
সবাই কী হয়েছে দেখতে ছুটে তিনতলার ছাদে চলে এল এবং ধরাধরি করে রামদিনকে সোজা করে দাঁড় করাল। রামদিনের পতন হয়েছিল, কিন্তু মূৰ্ছা হয়নি। বড় দারোগা তাকে ছাড়লেন না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তাকে আধ ঘণ্টা প্রাণায়াম, তারপর এক হাজার আটবার মহাকালী মন্ত্র জপ করান।
একবেলায় রামদিনের ভুড়ি চুপসিয়ে গেল। ওজনও বোধহয় বেশ কয়েক কেজি কমল।
এরপর থেকে লকআপে তোক না থাকলেই থানারই কোনও সেপাই বা জমাদার ধরে বড়বাবু শোধন করতে লাগলেন।
চোরবাজার থানার বিখ্যাত স্থূলোদর সেপাই জমাদাররা বড় দারোগার শোধন প্রক্রিয়ায় ক্রমশ চুপসে যেতে লাগল। তাদের মেদ-চর্বি অন্তর্হিত হল, ভুড়ি চুপসিয়ে গেল। ওজনও বোধহয় বেশ কয়েক কেজি কমল।
এই পরিবর্তন জনসাধারণের দৃষ্টি এড়াল না। প্রথমে আশেপাশের লোকজন, তারপরে পুরো থানা এলাকায়, এমনকী থানার এলাকার বাইরেও দিগম্বর সান্যালের এই আধ্যাত্মিক শোধন প্রক্রিয়ার কথা ছড়িয়ে পড়ল।
আজকাল চারদিকে রোগা হওয়ার ফ্যাশন চালু হয়েছে। মোটা লোকেরা স্লিম হওয়ার জন্যে নানা উলটোপালটা স্লিমিং সেন্টারে যোগদান করে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করছে। তবু সব সময়ে রোগা হতে পারছে না। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে, কঠিন ব্যায়াম করে রোগা হতে হতে হঠাৎ সামান্য অসতর্ক বা অসাবধান হয়ে আবার মোটা হয়ে যাচ্ছে।
ক্রমশ এই ধরনের লোকেদের কানে পৌঁছল দিগম্বর সান্যালের শোধন প্রক্রিয়ার তাজ্জব কাহিনি। ধূর্ত মোটারা রাতের দিকে চোরবাজার থানার সামনে অহেতুক গোলমাল বাধিয়ে লকআপে ঢুকে পড়তে লাগল। তারপর পরদিন সকালে আধ্যাত্মিক শোধনের দ্বারা শরীর হালকা করে, নিখরচায় চর্বি ঝরিয়ে ফেলল।
দিগম্বর সান্যাল হাজার হলেও পুলিশের লোক। যখন একই ব্যক্তিরা বার বার লকআপ থেকে শোধনের জন্যে তার কাছে আসতে লাগল, তিনি খোঁজখবর লাগালেন।
খোঁজখবর যা পাওয়া গেল, তারপরে আর পুলিশের চাকরি করার কোনও মানে হয় না।
তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। চৌরঙ্গিতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে সান্যাল স্লিমিং নাম দিয়ে মেদ ঝরানোর ব্যবসা শুরু করেছেন। সান্যাল শোধন প্রক্রিয়ায় একমাসে ভুঁড়ি দশ ইঞ্চি এবং ওজন দশ কেজি কমবেই, এ ব্যাপারে গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে। মাসে মাত্র দেড় হাজার টাকা, এ টাকা দিলেই যেকোনও স্থূলোদর-স্থূলোদরা সুপুরুষ-সুপুরুষী হতে পারে।
শেষ খবর, দিগম্বর সান্যালের ব্যবসা রমরমা চলছে। তবে সান্যাল স্লিমিংয়ের মোটা টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে চেম্বারের সোফা বদলাতে। প্রতি সপ্তাহে সোফা বদলাতে হচ্ছে, অতিরিক্ত মোটা লোকের ভার সোফাগুলি বহন করতে পারছে না। কিন্তু দিগম্বরবাবু উপায় বার করেছেন। থানার
অফিসঘরে যেরকম সেগুন কাঠের হেলান দেওয়া বেঞ্চিতে সেপাই এবং জমাদাররা সারাদিন বসে ঝিমোয়, সেই রকম এক সেট সেগুন কাঠের বেঞ্চির স্পেশ্যাল অর্ডার দিয়েছেন বউবাজারের এক ফার্নিচারের দোকানে। আশা করা যাচ্ছে সান্যাল স্লিমিংয়ের অতঃপর আর কোনও অসুবিধাই থাকবে না। আর সেগুন কাঠের বেঞ্চিও যদি মাসে মাসে ভাঙে, ভালই তো, খদ্দের লক্ষ্মীর দেহভার যত বেশি হবে ততই মঙ্গল।
সার্জন সাহেবের বাড়িতে
বছর কুড়ি আগে একটা সরকারি চাকরি নিয়ে দিল্লি চলে গিয়েছিলেন দিগন্ত রায়চৌধুরী। কলকাতার আচ্ছা ছেড়ে, সংসার গুটিয়ে প্রথম যখন দিগন্তবাবুকে দিল্লি যেতে হল নিতান্তই জীবিকার প্রয়োজনে, তাঁর মনে হয়েছিল খুব বেশিদিন হয়তো কলকাতা ছেড়ে টিকতে পারবেন না।
কিন্তু তারপরে যেরকম হয় যথাসময়ে দিল্লির সঙ্গে দিগন্তবাবু নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। এখন সেখানেই পাকাপাকি বসবাস। এমনকী অবসর গ্রহণের পরে দিল্লিতেই থেকে যাবেন বলে দক্ষিণ দিল্লির শেষপ্রান্তে একটা ছোটখাটো ফ্ল্যাটও বায়না করেছেন।
আগে তবু কালেভদ্রে দু-চার বছরে এক-আধবার কোনও না কোনও কারণে কলকাতায় আসা হত। একবার ভাইপোর পইতে, একবার বিশেষ ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিয়ে, আরও দুবার অফিসের টুকটাক কাজ নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন দিগন্তবাবু। আত্মীয়স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব, পুরনো অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল।
সেসবও অনেক দিন, অনেক বছর হয়ে গেল। কলকাতার প্রতি আকর্ষণ ক্রমশ কমে এসেছে। প্রধান আত্মীয়দের এখন অনেকেই কলকাতা এবং জগৎসংসারের মায়া কাটিয়ে পরলোকে প্রস্থান করেছেন। দু-একজন বন্ধুও সে পথ অনুসরণ করেছে। আর বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা জায়গায়, তাদের নিজেদের মধ্যেও কদাচিৎ দেখা হয়। আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন দিগন্তবাবুর মতোই প্রবাসী, দু-একজন বিদেশেও স্থায়ী আস্তানা গেড়েছে।
