এ ছাড়া এক প্রান্তে অপেক্ষা করছেন নরহরিবাবু। বিপত্নীক, প্রৌঢ় এবং এই অফিসের বড়বাবু। অফিসের মধ্যে নরহরিবাবুর পোষা নিজস্ব একটা হুলো বেড়াল আছে, সাদাকালো শরীর, মোটা মাথা, বেড়ালটার নরহরিবাবুর প্রদত্ত নাম কালাহরি। কালাহরিটা এক নম্বরের শয়তান, পাকা চোর।
এই পরশুদিনই একটা ফিশ কাটলেট টিফিনের সময় প্লেটে টেবিলের উপর রেখে বারান্দায় কলে হাত ধুতে গিয়েছিলেন মহিমাময়, কালাহরি সেটা নিয়ে চম্পট দেয়।
এসব কথা অবশ্য নরহরিবাবুকে বলা চলবে না। কালাহরি অন্ত-প্রাণ তাঁর। বৃষ্টির মধ্যে এই ঠান্ডায় হুলোটা কোথায় বেরিয়েছে, এখনও ফেরেনি। প্রতিদিন অফিস থেকে বেরোনোর সময় নরহরিবাবু কালাহরিকে চারটে মিল্ক বিস্কুট খাইয়ে যান। আজ কালাহরি আসছে না বলে তিনি বেরোতে পারছেন না, এখন ভ্রুকুটিকুটিল মুখে অধীর প্রতীক্ষা করছেন হুলো বেড়ালটার জন্যে।
জয়দেব হুলো বেড়াল নয়, একটা আস্ত মানুষ। মহিমাময় ঘড়িতে দেখলেন, কাটা প্রায় ছটার কাছে পৌঁছেছে। উঠে গিয়ে রাস্তার দিকের জানলায় উঁকি দিয়ে দেখলেন, রীতিমতো অন্ধকার, লোডশেডিং এখনও চলছে, তার মধ্যে বৃষ্টির ঝিরঝির শব্দ আসছে।
এ অফিসটায় একটা জেনারেটর আছে তাই রক্ষা, অন্ধকারে ঘুপচি মেরে জয়দেবের জন্যে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। কিন্তু আর নয়, ছটা বেজে যাওয়ার পরে মহিমাময় আর এক মুহূর্তও জয়দেবের জন্যে অপেক্ষা করবেন না।
দুপুরে আড়াইটা নাগাদ মহিমাময় টিফিন করতে বেরিয়ে এক পাঁইট বাংলা দু নম্বর খেয়ে এসেছিলেন। সবদিন এটা করেন না, কিন্তু আজ জয়দেব আসবেন, দুজনের সারা সন্ধ্যার প্রোগ্রাম, তাই টেম্পোটা একটু তুলে রাখতে চেয়েছিলেন। তা ছাড়া জয়দেবের সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে একটু তৈরি হয়ে থাকতে হয়।
দুপুর আড়াইটার সে নেশা কখন কেটে গেছে। জয়দেব সত্যিই আসছেন না। মিনিট কয়েক আগে কালাহরি এসে নরহরিবাবুর হাত থেকে বিস্কুট খেয়ে নরহরিবাবুকে ভারমুক্ত করে গেছে। এবার টেবিল গুছিয়ে নরহরিবাবুও রওনা হলেন। মহিমাময় ঠিক করলেন তিনিও উঠবেন, আর অপেক্ষা করা যায় না।
যাওয়ার পথে নরহরিবাবু একবার মহিমাময়ের টেবিলের পাশে এলেন। মহিমাময় ভাবলেন, বোধহয় বড়বাবু কোনও দরকারি কাজের কথা বলবেন। কিন্তু বড়বাবু যা বললেন তা শুনে মহিমাময় বিস্মিত হয়ে গেলেন।
জয়দেবকে বিশ্বসংসারে চেনে না এমন লোক নেই। এ অফিসেও মহিমাময়ের বন্ধু হিসেবে তাকে সবাই চেনে, নরহরিবাবুও চেনেন। নরহরিবাবু অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, আপনার বন্ধু জয়দেববাবু বড়সাহেবের ঘরে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
বড়সাহেবকে জয়দেব কী করে চিনল, কবে কোথায় আলাপ হল? তা ছাড়া তাঁর কাছে তার অফিসে এসে, তার ঘরে না গিয়ে, তাকে কিছু না জানিয়ে বড়সাহেবের ঘরে জয়দেবমহিমাময় ব্যাপারটা ঠিক হিসেবে মেলাতে পারলেন না। তবে জয়দেবের কটা ব্যাপারই বা মহিমাময় বা অন্য কেউ কোনওদিন মেলাতে বা বুঝতে পেরেছেন!
সে যা হোক, এখন সমস্যা দুটো। জয়দেব ঠিক কী অবস্থায় আছে এবং বড়সাহেবের ঘরে গিয়ে ডেকে বার করে আনা কতটা সঠিক হবে। এই প্রশ্ন দুটো মনে মনে বিবেচনা করতে করতে মহিমাময় বড়সাহেবের ঘরের দিকে এগোলেন। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে বাধা পেলেন বড়সাহেবের খাস আর্দালির কাছে। আর্দালি জানাল, এখন কামরায় ঢোকা যাবে না। সাহেব দোস্তের সঙ্গে বাত করছেন।
এরই মধ্যে মহিমাময়ের সুশিক্ষিত কানে একটু গেলাসের টুংটাং, খুব পরিচিত একটা শব্দ ধরা পড়েছে। সর্বনাশ! জয়দেব এখানে অফিসের মধ্যে খোদ বড়সাহেবের সঙ্গে জমিয়ে মদ খাচ্ছে?
নিঃশব্দে কেটে পড়তে যাচ্ছিলেন মহিমাময় বড়সাহেবের দরজার ওপাশ থেকে, কিন্তু ভারী পর্দার অন্তরাল থেকেও সামান্য ফঁক দিয়ে মহিমাময়কে দেখে ফেলেছেন বড়সাহেব, তিনি বেল বাজিয়ে আর্দালিকে ডাকলেন, এই দ্যাখো তো ওখানে কে দাঁড়িয়ে?
আর্দালি এগিয়ে আসার আগেই মহিমাময় পর্দা উঁচু করে বড়সাহেবের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ভিতরে আসব, স্যার?
বড়সাহেব যথেষ্টই মুডে আছেন, অস্বাভাবিক সৌজন্যে বিগলিত হয়ে সাদর আহ্বান জানালেন, আরে আসুন আসুন, মহিমাবাবু, বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
মহিমাময় ঠিক এতটা আশা করেননি। তা ছাড়া এই মুহূর্তে তার চোখ জুড়িয়ে গেল অন্য একটা দৃশ্য দেখে। একটা মদের বোতল এবং দুটো গ্লাস। খুব মহার্ঘ্য বা দুর্লভ পানীয় বলা যাবে না, স্কচ বা শ্যাম্পেন নয়, তবে মোটামুটি উচ্চমানের দিশি প্রিমিয়াম হুইস্কি।
মহিমাময়ের নজরে এটাও এড়াল না যে বোতল প্রায় অর্ধেক ফাঁকা। তাকে চেয়ারে বসতে বলে বড়সাহেব ভেতরের টিফিনঘরে গেলেন। মহিমাময় বসার পরে জয়দেব তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বোতলের দিকে তাকিয়ে কী দেখছিস?
নিজের অফিসের বড়কর্তার ঘর, মহিমাময় নিচু গলায় বললেন, অর্ধেক ফাঁকা।
জয়দেব ভুরু কুঁচকিয়ে বললেন, তুই ভাল কিছু দেখতে পাস না। অর্ধেক ফঁকা দেখলি, অর্ধেক ভরা সেটা দেখলি না?
ইতিমধ্যে বড়সাহেব পিছনের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন হাতে একটা কাঁচের গেলাস নিয়ে। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, মহিমাময়কেও পানীয় দেবেন। একটু চিন্তান্বিত হলেন মহিমাময়, অফিসের বড়সাহেবের সঙ্গে বড়সাহেবের ঘরে বসে মদ্যপান কতটা নিরাপদ সে বিষয়ে তিনি ভাবতে লাগলেন।
