এর পরে গঙ্গাস্নান। না, গঙ্গা পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই। সিঁড়ির একপাশে গঙ্গাজলের কলের সঙ্গে মোটা একটা হোসপাইপ লাগানো আছে। জামাকাপড় পরিহিত অবস্থায় আসামিটিকে সেই হোসপাইপে সুস্নাত করা হয়। গ্রীষ্মের কিছুদিন ছাড়া শেষরাতে সব সময়েই কিছু ঠান্ডা, আর এটা সবচেয়ে মারাত্মক শীতকালে।
তা শীত-গ্রীষ্ম যাই হোক, মিনিট পনেরো হোস পাইপের প্রবল ধারাজলে লোকটিকে চোবানো হয়।
ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ভেজা জামাকাপড়ে এবার লোকটাকে নিয়ে যাওয়া হয় তিনতলার ছাদে, সেখানে একটি তুলসীমঞ্চ আছে। সেই তুলসীমঞ্চের সামনে পাশাপাশি দুটি আসন বিছানো রয়েছে।
ছাদের খোলা হাওয়ায় সিক্তবস্ত্রে আসামিটিকে একটি আসনে বসতে হয়। পাশের আসনটি স্বয়ং দিগম্বর সান্যালের।
প্রথমে আধঘণ্টা প্রাণায়াম। জোড়াসনে বসে গোড়ালির সঙ্গে গোড়ালি জুড়ে এক নাক চেপে আরেক নাকে, তারপরে সেই নাক চেপে আগের নাকে বিশুদ্ধ বাতাস টেনে নেওয়া।
ব্যাপার সোজা নয়। বলা উচিত ভয়াবহ। বহু কুখ্যাত ছিনতাইকারী, প্রতিষ্ঠিত পকেটমার, নগরবিদিত মদ্যপ সান্যাল দারোগার এই প্রাণায়ামে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু প্রাণায়ামে ব্যাপারটা শুরু। এর পর আরও দু ঘণ্টা সাধনা। তার মধ্যে পদ্মাসন আছে, বজ্ৰাসন আছে, এক হাজার আটবার স্তোত্রজপ করা আছে।
স্তোত্রটি শ্রীযুক্ত দিগম্বর সান্যালের স্বরচিত। তিনি নিজেও প্রতিদিন সকালে আসামির পাশের আসনে বসে স্তোত্রটি পাঠ করেন। সান্যাল দারোগার স্তোত্রটি খুবই সোজা ভাষায় সরাসরি লেখা, মা কালীকে বলা হয়েছে,
কালী কালী মহাকালী
ডাকি তোকে খালিখালি
এ হল সান্যালমশায়ের মতে, মা মহাকালীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এক হাজার আটবার এই শ্লোকটি জপ করতে করতে অনেক বলশালী গুণ্ডাও গোঁ গোঁ করতে করতে কাটা কলাগাছের মতো ভূপতিত হয়েছে।
এর পরে যথাসময়ে অবশ্যই আসামিকে আদালতে চালান দেওয়া হয়। সেখানে বিচারে যার যা সাজা হয় হোক, কিন্তু দিগম্বরবাবুর শোধনপদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যে একবার গিয়েছে সে পরবর্তীকালে আর যাই করুক, চোরবাজার থানার এলাকার মধ্যে সহজে প্রবেশ করে না।
কিন্তু একদিন এর ব্যতিক্রম ঘটল। সেই ব্যতিক্রমের ঘটনাটা নিয়েই এই গল্প।
অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও শেষরাতে উঠে দিগম্বরবাবু জয় কালী, জয় কালী করেছেন এবং সেটা শুনে নীচের থানার ঘর থেকে সেপাই উঠে আসার কথা।
কিন্তু এদিন তা সহজে ঘটল না। প্রায় দশ পনেরো বার জয় কালী জয় কালী করার পরে থানা থেকে সবচেয়ে সাহসী সেপাই সরযূপ্রসাদ দ্বিধাজড়িত পদে এবং কম্পমান হৃদয়ে দোতলায় উঠে এল। সে এসে দারোগা সাহেবকে একটা লম্বা স্যালুট করে জানাল যে আজ নীচের লকআপ শূন্য। একজন আসামিও কাল বিকেল থেকে সারারাতে ধরা যায়নি, যে তাকে শোধনের জন্যে দারোগা সাহেবের কাছে পেশ করা যাবে।
সরযূপ্রসাদের বক্তব্য শুনে দিগম্বরবাবু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, এত বড় একটা থানায় তোমরা পনেরো-বিশজন লোক সারাদিন সারারাত কি ভেরেন্ডা ভাজছ? একটা বদমাশও ধরা পড়েনি কাল আর আজকের মধ্যে?
দিগম্বরবাবুর হাঁকডাক শুনে ছোট দারোগা নিখিলচন্দ্র দোতলায় উঠে এলেন। এসে দিগম্বরবাবুকে বুঝিয়ে বললেন, স্যার, আপনার শোধন-প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ এলাকা পাজিমুক্ত হয়েছে। তাই চোর গুণ্ডা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আপনার রাগ না করে আনন্দিত হওয়াই উচিত।
সব শুনে চিরতার জল খেয়ে প্রাতঃকৃত্যাদি সারতে সারতে দিগম্বর সান্যালমশায় ভাল করে তলিয়ে ভেবে দেখলেন যে সত্যিই লকআপে যে আজ আসামির অভাব হচ্ছে, সেটা তারই শোধন প্রক্রিয়ার ফল। আজ কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্রমশই বদমাশ কম ধরা পড়ছিল, লকআপে কম লোক আসছিল। তবে আজকেই প্রথম লকআপ সম্পূর্ণ শূন্য।
কিন্তু এই কয়েকমাসে দিগম্বরবাবুর অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে, শেষরাতে তার অধ্যাত্মসাধনা এবং কালীজপের একজন সঙ্গী না হলে চলবে না। তিনি নিখিলবাবুকেই ও ব্যাপারে নির্বাচিত করলেন, মুখে আদেশ দিলেন, নিখিল, তুমি এক গেলাস চিরতার জল খেয়ে গঙ্গাজলের হোসপাইপে ভাল করে স্নান সেরে নাও। তারপর আমার সঙ্গে প্রাণায়াম আর জপে বসবে। আজ যখন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না, তুমি ছোট দারোগা, তুমিই আমার অধ্যাত্মসাধনার সঙ্গী হও। তা ছাড়া তুমি তো ঘুষ-টুষ, মদ-টদ খাও শুনি, তোমার শোধন হওয়া দরকার।
ছোট দারোগা নিখিলবাবু শ্লেষ্মর ধাতের লোক, চিরকাল তাঁর সর্দিকাশির ভয়। এই বর্ষার ভোরবেলা, হু হু করে জোলো হাওয়া বইছে, এর মধ্যে ঠান্ডাজলে স্নান করে দু ঘণ্টা আড়াই ঘণ্টা খোলা ছাদে প্রাণায়াম, আসন এবং এক হাজার আটবার ওই বিদঘুঁটে জপ করা তাঁর মতো লোকের কর্ম নয়।
চতুর নিখিলবাবু আসছি বলে নীচে নেমে সরাসরি থানার বাইরে পালিয়ে গিয়ে এক জমাদারকে দিয়ে বড় দারোগাকে লিখে পাঠালেন, স্যার, ওপাশের বস্তিতে কী একটা বড় গোলমাল হচ্ছে, আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হচ্ছে। আজ অধ্যাত্মসাধনায় আপনার সঙ্গী হতে পারছি না, পরে। একদিন চেষ্টা করব। ইতি সেবক নিখিল।
রামদিন নামক যে প্রাচীন জমাদারটি দোতলায় এই চিরকুটটি নিয়ে সরল চিত্তে বড় দারোগার কাছে এসেছিল, তাকেই সঙ্গে সঙ্গে পাকড়িয়ে ধরলেন দিগম্বরবাবু। রামদিনের বহুদিনের অভ্যেস সাতসকালে উঠে থানার ভিতরে বাঁধানো টিউবওয়েলের পাশে বসে লোটা লোটা জল ঢেলে জয় সিয়ারাম, জয় সিয়ারাম বলে স্নান করা।
