খবর পেয়ে দিগম্বরবাবু তার মাকে নিয়ে সেই তারাপীঠের শ্মশানে গেলেন। সেখানে তখন নটবরবাবু নেই, তিনি সারা গায়ে ছাইভস্ম মেখে তখন সাকরেদি ছেড়ে পুরো সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন, তিনি নাকি হিমালয়ের দিকে চলে গেছেন।
এরপর আর নটবরবাবুর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে কয়েক বছর আগে একটি দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় কুম্ভমেলার যে আলোকচিত্র ছাপা হয়েছিল, তার মধ্যে জটাজুট এবং ত্রিশূলধারী এক কৌপীন সম্বল সন্ন্যাসীর মুখশ্রীর সঙ্গে রাণাঘাট কোর্টের প্রাক্তন পেশকার নটবরবাবুর বড় বেশি মিল। কিন্তু ততদিনে দিগম্বরবাবুর মা আর বেঁচে নেই এবং দিগম্বরবাবু অন্যান্য বিষয়ে এত ব্যস্ত যে এ ব্যাপারে মাথা ঘামানোর সময় ছিল না।
তা না থাকুক। নটবরবাবু আমাদের এ গল্পে আসছেন না। এলে খারাপ হত না, কিন্তু আমার সাহস নেই। বাংলা সাহিত্যে অনেক বাঘাবাঘা লেখক গল্পের মধ্যে সন্ন্যাসীকে ঢুকিয়ে রীতিমতো নাস্তানাবুদ হয়েছেন।
কারণ এ গল্প ঠিক দিগম্বরবাবুকে নিয়ে নয়, নটবরবাবুকে নিয়েও নয়,–এ গল্প এক মোটা বিষয় নিয়ে যার সঙ্গে দিগম্বর সান্যাল বিশেষ করে তস্য পিতা নটবর সান্যালের কোনও সম্পর্ক নেই।
ভূমিকা কিঞ্চিৎ দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসল বিষয়ে পৌঁছানোর আগে আরও একটু বলার প্রয়োজন আছে। স্বস্তির কথা এই যে আসল বিষয় মোটেই সূক্ষ্ম নয়, সুতরাং ভূমিকা আরেকটু যেতে পারে।
ব্যাপারটা সোজাসুজি যেমন হয়, ঠিক তাই। দিগম্বর সান্যালমশাই পিতৃদেব নিরুদ্দেশ হওয়ার পরে বুঝতে পারলেন লেখাপড়া চালিয়ে, ভালমতো পড়াশুনা করে, অধ্যাপনা করতে গেলে যে ধরনের আর্থিক সঙ্গতি দরকার সেটা তাদের সংসারে আর নেই। দিগম্বরবাবুর মাতুল কলকাতায় পুলিশের সদর অফিসে বড়বাবুর চাকরি করতেন। তাঁর বেশ নামডাক ছিল। অবশ্য নামডাক না বলে উপাধিডাক বলাই উচিত। কারণ সবাই তাকে চক্রবর্তীবাবু বলে ডাকত। তার আসল নামটা কেউই জানত না।
তাতে আমাদের কিছু আসে যাচ্ছে না। চক্রবর্তীবাবু তাঁর ভগিনীপতির আকস্মিক পলায়নের পর ভাগিনেয় দিগম্বরবাবুকে অধিকতর লেখাপড়া থেকে নিবৃত্ত করলেন। কারণ পুরো সংসারের দায়িত্ব পিতৃদেবের অনুপস্থিতিতে তাঁরই উপর এসেছে; সুতরাং দিগম্বরবাবুকে কাজে ঢুকতে হবে।
কাজ মানে একটাই, চক্রবর্তীবাবু তাঁর বড়সাহেবকে ধরাধরি করে দিগম্বরকে ছোট দারোগার কাজে ঢোকালেন।
পুলিশের চাকরিতে দিগম্বর সান্যালের নতুন জীবন শুরু হল। ছোট দারোগার কাজ বড় কঠিন। শুধু ছোটো আর ছোটো। এখানে চুরি, ওখানে রাহাজানি, সেখানে বদমায়েসিসব জায়গায় ছোটাই হল ছোট দারোগার কাজ।
তা খুব ছোটাছুটি করলেন দিগম্বর সান্যাল। তিনি আর দশজন সরকারি কর্মচারির মতো নন। আর পুলিশের কাজে ঢুকলে যে দু-চারটে দোষ স্বভাবের মধ্যে অজান্তেই প্রবেশ করে যায়, সেগুলোকে তিনি প্রাণপণে বাধা দিয়ে অত্যন্ত সতোর সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখলেন।
অবশেষে একদিন বছর পনেরো চাকরির পর বড় দারোগা হলেন। বড় দারোগা হওয়ার পর দু-চার থানা ঘুরে অবশেষে আজ কয়েকমাস হল তিনি এই কুখ্যাত চোরবাজার থানায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। দিগম্বরবাবুই এখানকার বড় দারোগা, মানে সর্বেসর্বা।
চোরবাজার থানায় যোগদান করে কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি পুরো এলাকাটাকে প্রায় ঠান্ডা করে দিয়েছেন।
দিগম্বরবাবুর ঠান্ডা করার পদ্ধতি একটু অন্যরকম। তার মধ্যে একটা সাত্ত্বিক, আধ্যাত্মিক ভাব আছে। তিনি সদাসর্বদা সাত্ত্বিক প্রচেষ্টাতেই চোর-বদমাস-গুণ্ডাদের শায়েস্তা করার চেষ্টা করেন।
অতি ভোরবেলায় প্রায় ব্রাহ্মমুহূর্তে জয় কালী জয় কালী বলতে বলতে ঘুম থেকে ওঠেন। থানার দোতলার কোয়ার্টারে তিনি একা থাকেন। পুলিশের চাকরির অসুবিধের কথা ভেবে বিয়ে করবার সাহস পাননি। মা বেশ কিছুদিন হল মারা গিয়েছেন। যে দু-চারজন নিজের লোক আছে, তারা রাণাঘাটের পুরনো বাড়িতেই রয়েছে।
তাঁর জয় কালী জয় কালী শুনলেই নীচতলার থানার ঘর থেকে ডিউটিতে একজন সেপাই উপরে উঠে আসে। তিনি ততক্ষণে এক গেলাস চিরেতার জল খেয়ে স্নান-প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে নেন।
এবার সেপাইটি এসে কাল লকআপে যেসব মহান ব্যক্তিরা পদধূলি দিয়েছেন, তাঁদের নাম ও কৃতিত্ব বর্ণনা করেন। সব মনোযোগ দিয়ে শুনে বিশেষভাবে বিবেচনার পর তিনি একজনকে বেছে নেন। তাকে সেপাই ওপরে নিয়ে আসে।
কাজটা কঠিন, সন্দেহ নেই। লকআপের ভিতরে ঢুকে বাছাই করা ঘুমন্ত আসামিটিকে আলাদা করে তুলে দোতলায় নিয়ে আসা সোজা কাজ নয়। বিশেষ করে সে ব্যক্তি যদি পুরনো পাপী হয় আর দিগম্বর দারোগার আধ্যাত্মিক উন্নয়ন বিষয়ে তার যদি কোনও প্রাক্তন অভিজ্ঞতা থাকে, তবে অনেক সময় রুল দিয়ে গুতিয়ে কিংবা কয়েকজনে মিলে টেনেহিঁচড়ে তাকে দোতলায় আনতে হয়।
দিগম্বরবাবুর শোধনপদ্ধতি অতি সরল এবং সনাতন। প্রথমে এক গেলাস চিরতার জল। রাত দুটো পর্যন্ত যে লোকটা মদ খেয়ে হল্লা করে থানায় চালান হয়েছে, এই ভোর চারটের সময় তার পক্ষে এক গেলাস মহাতেতো চিরতার জল অতি মারাত্মক। এক চুমুকে খেয়ে নিতে হয়। মাথার তালু থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত কনকন করে ওঠে।
এর বিপরীতও আছে। হয়তো কেউ বিকেলে কোনও কুকর্ম করে লকআপে ঢুকেছে, বারো-চোদ্দো ঘণ্টা পেটে কিছু নেই। খালি পেটে এক গেলাস চিরতার জল পড়া মাত্র সমস্ত পেটের ভেতরটা যকৃত, পিলে, নাড়িভুড়ি সব মোচড়াতে থাকে।
