ইন্টারভিউ বোর্ডের একজন আরেকজনের কানে ফিসফিস করে কী বলল। যিনি ভারিক্কি গোছের মুখ করে মাঝামাঝি বসেছিলেন, তিনি বোধহয় চেয়ারম্যন কিংবা ওই রকম কিছু, তিনি হাতের পাইপের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, ইন্টারেস্টিং! শুধু অল্পবয়সি যুবকটি, নিশ্চয়ই লালওয়ানি, গম্ভীর মুখে বলল, দ্যাটস রাইট। এনিথিং মোর?
উত্তর তেহরানে বন্যার জল পাঁচ সেন্টিমিটার নেমে গেছে। এখন আর বিশেষ কোনও আশঙ্কার কারণ নেই। আদিত্য যথেষ্ট গাম্ভীর্যের সঙ্গে জানাল।
আবার দুজন সদস্য কানাকানি করল, চেয়ারম্যান বললেন, ফানি। লালওয়ানি বলল, চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়েই বলল, আমি সকালবেলা উঠে সব কাগজ প্রথম পাতার দিন তারিখ থেকে শেষ পাতার সম্পাদকের নাম পর্যন্ত পড়ি। এসব সংবাদ আজকের কাগজে অবশ্য বেরিয়েছে। তারপর আদিত্যের দিকে তাকিয়ে বলল, এসব খবর আপনি ইম্পর্টান্ট মনে করছেন কেন? অর্থনৈতিক ব্যাপারে আজ কোনও গুরুত্বপূর্ণ খবর নেই?
আদিত্য যেন হাতে চাঁদ পেল, আজ্ঞে হ্যাঁ, তা আছে। বোম্বের শেয়ার বাজারে বরাকর কোলস-এর প্রেফারেন্স শেয়ারের দাম ছাব্বিশ পয়সা পড়ে গেছে। ইউ. পি. সরকার বারো বছর মেয়াদি লগ্নিশেয়ার ছিয়ানব্বই টাকা তেইশ পয়সা করে বাজারে ছাড়বেন সামনের সোমবার। সংবাদটা জানিয়ে আদিত্য একবার নেকটাইয়ের ওখানটায় হাত বোলাল; গলা দিয়ে ভাল স্বর বেরোচ্ছে না, দম বন্ধ হয়ে আসছে, ফাস আটকে মারা পড়বে নাকি শেষে, তা ছাড়া পিঠে বোধহয় ফোঁসকার একটা একজিবিশন বসল, কিন্তু একবার জানানো দরকার ওই সাতের পাতা মানে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাতা আর তারই আশে-পাশের দু-একটা খুচরো খবর, খবরের কাগজের শুধু এইটুকু পড়ে আসবার সুযোগ পেয়েছে সে।
বোর্ডের মেম্বাররা যেন সবাই একটু অবাক হয়ে গেছেন, এমনকী লালওয়ানি পর্যন্ত। লালওয়ানিকে একবার আলাদা পেলে কথাটা বোঝানো যেত, অন্তত টাইয়ের গিটটা খুলিয়ে নেয়া যেত, উঃ, এ যে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, কোটটা খুলে ফেললে কী হয়, নেকটাইয়ের নটটা, নেকটাইয়ের নট কী করে খোলে!
আদিত্য বোর্ডের মেম্বারদের মুখের দিকে চেয়ে বুঝতে পারল তার আর কোনও আশা নেই। কিন্তু টাইয়ের নটটা খুলতে পারলে, দম আটকে না গেলে, সে হয়তো এদের ব্যাপার বোঝাতে পারত। নটটার নীচের দিকে হাত দিয়ে আদিত্য একটা টান দিল। আরও একটু বসে গেল যেন, তাহলে কি চাকরি জোটাতে এসে দমবন্ধ হয়ে মারা যাব? জোরে টাইটা ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিল আদিত্য, আর এবার সত্যিই ফাস আটকাল, একেবারে মরণফাস, চোখ দুটো বেরিয়ে আসছে লাল টকটকে, ঘাড়ের পিছনটা টনটন করে উঠল, আদিত্য লাফিয়ে উঠে পড়ল চেয়ার থেকে। কোটটা খুলে ফেলল একটানে কিন্তু টাই, যত টানে আরও আটকে যায়। এতে বিহ্বল ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্যেরা ঘাবড়ে গিয়ে ক্রিং ক্রিং করে কলিংবেল বাজালেন। দুজন বেয়ারা ছুটে এল।
আদিত্য গোঙাতে গোঙাতে বলল, এবার আর ইংরেজি নয়, সোজা বাংলায় মাতৃভাষায়, পাগল-টাগল কিছুনই স্যার, নেকটাই স্যার, গরম স্যুট স্যার, ভাদ্রমাস স্যার, বেয়ারাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, কেয়া দেখতা হায়, গলামে ফঁস লাগ গিয়া, টাই খুলনে জানতা? বেয়ারারা হতবাক, আদিত্য এবার বোর্ডের মেম্বারদের বলল, আপনাদের নিশ্চয়ই মাধুরীদিদিমা টাই বেঁধে দেয়নি, এর মধ্যে কেউ যদি বাঙালি থাকেন, কেউ যদি আমার কথা এক বর্ণও বুঝে থাকেন দয়া করে প্রাণ রক্ষা করুন।
কেউ বাঙালি ছিল কি না বলা কঠিন তবে একজন ব্যাপারটা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি উঠে এসে প্রায় জাদুকরের মতো টাইটা সামান্য চেষ্টায় খুলে ফেললেন, আদিত্য প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিয়ে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার–এইবার ইংরেজিটা অল্প অল্প ফিরে এসেছে, লাইফ আগে, এ গ্লাস অফ ওয়াটার প্লিজ।
এক গ্লাস জল এল, কিন্তু তার আগেই পাশের দরজা দিয়ে বাথরুমে ঢুকে আঁজলাভরে প্রাণের। সাধে দুই মগ জল খেয়ে নিয়েছে আদিত্য। এইবার ফিরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, আমাকে কি আর কোনও প্রশ্ন করবেন?
না, আর কোনও প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন করলেও উত্তর নয়, টাই পরে চাকরি করা হবে না। অসম্ভব।
এক সপ্তাহ পরে মাধুরীদিদিমা পার্শেলে একটা গরম স্যুট ফেরত পেলেন আর আদিত্যের জামাকাপড় সব রয়ে গেল তার ওখানে। তা থাকুক, অ্যাডেন সাহেব চলে গেল, তিনটে জাপানি পাম গাছ মরে গেল, টমি কুকুর মরে গেল আর দু-চারটে পাজামা পাঞ্জাবি, জীবনে কত কীই তো জুটল না।
কিন্তু দোতলার পশ্চিমমুখে ওই ঘরটা বড় ভাল ছিল, বড় খোলামেলা। আর চিবুকে আলতো চুমো, মাধুরীদিদিমা।
সান্যাল স্লিমিং
চোরবাজার থানার বড় দারোগা শ্ৰীযুক্ত দিগম্বর সান্যালমশায় একজন অতি সজ্জন ব্যক্তি। ছাত্রজীবনে তার ইচ্ছা ছিল ভাল করে লেখাপড়া শিখে অধ্যাপক হবেন। কিন্তু কলেজে পড়তে পড়তেই তার বাবা নটবর সান্যালমশায়, যিনি রাণাঘাট আদালতে পেশকার ছিলেন, তিনি হঠাৎ সেই রমরমা চাকরি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পরে খবর পাওয়া যায় তিনি সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন।
প্রথমে জানা যায় যে নটবরবাবু তারাপীঠে আছেন। তারাপীঠ মন্দিরের পিছনে যে বিখ্যাত শ্মশান আছে, সেখানেই তিনি এক সিদ্ধবাবার সাকরেদ হয়েছেন।
