স্যুট পাব কোথায় দিদিমা, দুটো প্যান্ট আছে। দেখছই তো।
আদিত্যের কথা শুনে মাধুরীদিদিমা যেন চমকে উঠলেন, এই প্যান্ট পরে ইন্টারভিউ হয় নাকি! সাহেবদের কোম্পানি, ঢুকতেই দেবে না খালিগায়ে।
খালিগায়ে কেন, শার্ট গায়ে দেব তো। আদিত্য বলে।
কোট না থাকলে ওই খালিগায়ে হল। তোর তো টাই-ও নেই। মাধুরীদিদিমা উঠে পাশের ঘরে গেলেন, অনেকক্ষণ ধরে খুটখাট কী সব শব্দ হতে লাগল। তারপর একটা কোঁচকানো ইস্তিরি ভাঙা কোট-প্যান্ট হয়তো হবে আর একটা পোকায় খাওয়া লাল পদ্ম আঁকা নেকটাই নিয়ে ফিরলেন। তোর দাদুর জিনিস, র্যাঙ্কেন থেকে তৈরি সব, দ্যাখ তো তোর লাগে নাকি?
এগুলো গরমের নাকি? আদিত্য হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞাসা করে।
তাতে কী? দু ঘণ্টার তো মাত্র ব্যাপার, যাবি আর ফিরে এসে ছেড়ে ফেলবি।
ভাদ্র মাসের দুপুরে গরম স্যুট পরে দেখতে হাঁদা লাগে কি না। ঠিক লাগল না, তবে কী আর করা যাবে, দেখাই যাক না, একবার কাচিয়ে নিতে হবে, হাতে আর তিনদিন সময় আছে, আর টাই, টাই তো কখনওই ব্যবহার করেনি আদিত্য, একবার চেষ্টা করেছিল। কেমন গলা বন্ধ হয়ে আসে। টাই-ও পরতে হবে নাকি?
স্যুট পরবি, টাই পরবি না, কুকুরে কামড়িয়ে দেবে যে। যা তোক মাধুরীদিদিমার কথামতো চলতে হবে, স্যুটটা কাঁচতে দিয়ে এল, আর্জেন্ট, সাত টাকা লাগবে আর সেই সঙ্গে সস্তা একটা তিন। টাকা দামের টাই কিনে নিয়ে এল চৌরঙ্গির ফুটপাথ থেকে।
ঝুলটা একটু কম, পিঠের কাছটা একটু বেশি ভোলা, হাতা দুটো একটু টানাটানা, পুরানো ডবল ব্রেস্ট ছয় বোতামের কোট আর মাজার কাছে একটু আঁটসাঁট প্যান্ট, শেষ বর্ষার গরমে ঘেমে নেয়ে উঠল আদিত্য গরম স্যুট পরে। টাই বাঁধা ব্যাপারটা যে এত জটিল, এত রহস্যকর সেটাও আবিষ্কৃত হতে সময় লাগল না। মাধুরীদিদিমা সামনে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ করে দেখছিলেন, আদিত্যের কাজকারবার দেখে একটু ঠোঁট টিপে হেসে তারপর টাইটা নিজের হাতেই বেঁধে দিলেন। খুব যত্ন নিয়ে বেশ শক্ত করে বেঁধে দিলেন, এবার আয়নায় নিজেকে দ্যাখ। ঘামতে ঘামতে নিজেকে দেখল আদিত্য, তা মোটামুটি ভালই দেখাচ্ছে। আয়নায় নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে একটু সলজ্জ হাসল আদিত্য। মাধুরীদিদিমা চিবুকে একটা আলতো করে চুমু দিয়ে বললেন, দুর্গা, দুর্গা। আদিত্য বেরিয়ে পড়ল।
লিফটে করে ছয়তলার ওপরে একটা ওয়েটিং রুমে আর পাঁচজন বসে। আদিত্যও গিয়ে বসল। বহু ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি না পেয়ে পেয়ে খুব পাকাঁপোক্ত হয়ে গেছে আদিত্য। তবু এখনও বুক। কাঁপে, তারপরে সাহেবি ফার্মে ইন্টারভিউ এই প্রথম। ওঃ যাঃ, আজকের কাগজ তো দেখে আসা হয়নি এত গোলমালের মধ্যে। যদি এরা আজকের খবর-টবর কিছু জিজ্ঞাসা করে, আর তাই তো করবে, তা ছাড়া কী করতে পারে? আদিত্য ভাবতে ভাবতে ঘামতে ঘামতে ভাবতে থাকে।
হঠাৎ সামনের ভদ্রলোক তার ব্যাগ খুলে একটা খবরের কাগজ বার করে পড়তে লাগল। চাইব, চাওয়া কি উচিত হবে। সাহেব কোম্পানির ইন্টারভিউতে নাকি সব সময়েইনজর রাখে, এই ওয়েটিং রুমেও রাখছে কিনা, যাকগে ভদ্রলোক যে পাতাটা পড়ছেন তারই উলটোপাতাটা তার সামনে, সেটা খুব মন দিয়ে পড়তে লাগল। কতটুকু বা পড়া গেল, যেটুকু অংশে চোখ ফেলতে পারল সেটুকুই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার পড়ে মুখস্থ হয়ে গেল। ভদ্রলোক পাতাটা ওলটাতে যাচ্ছিলেন, আদিত্য পরের পাতাটার জন্যে বুভুক্ষুর মতো অপেক্ষা করছে, এমন সময় ডাক পড়ল, প্রথমেই আদিত্যকে ডাকল। আমাকেই প্রথমে কেন, বোধ হয় বর্ণানুক্রমিক সাজিয়েছে, ভাবতে ভাবতে আদিত্য উঠল।
এখানে আবার ইংরেজিতে বাক্যালাপ করতে হবে, কতক্ষণ, কে জানে? মনে মনে কয়েকটা ইংরেজি বাক্য রচনা করতে করতে ধীর পদক্ষেপে আদিত্য বেয়ারার পিছু পিছু এগিয়ে গেল। কী প্রশ্ন করবে, ইংরেজি ব্যাপারটা এত খটমটে, তা ছাড়া এই গরম স্যুট, এই ভাদ্রমাস, এই দম বন্ধ হয়ে আসা টাইয়ের নট, আদিত্য জীবনে কোনওদিন, সারাজীবনে একসঙ্গে এত ঘেমেছে কিনা। সন্দেহ।
বিরাট গোলটেবিলের ওপাশে চারজন কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক। একজন খুব অল্প বয়েসি, আদিত্যরই সমবয়েসি হবে, বেশ সুন্দর দেখতে হবে, ওই বোধহয় লালওয়ানি হবে, রুমাল দিয়ে কপাল মোছা ভব্যতা হবে কিনা স্থির করতে না পেরে কোটের হাতা দিয়ে কপাল, গলা মুছতে মুছতে আদিত্য বসল। প্রাথমিক বাক্যালাপ, নাম ঠিকানা, একটু জড়িয়ে জড়িয়ে উত্তরগুলো দিল।
কিন্তু দমটা যেন বন্ধ হয়ে আসছে, টাইয়ের বাঁধনটা মাধুরীদিদিমা বড় শক্ত করে দিয়েছে, নাকি এই রকমই হয়, তারই অনভ্যাস, আর গরম স্যুট আর ইংরেজি বাক্যালাপ, কী কী কারণে গায়ে ফোঁসকা পড়ে, কবে শীতের রাত্রিতে শুধু একটা আদ্দির পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে সে হি হি করে কেঁপেছিল, আবোল তাবোল ভাবনা জুটতে লাগল, ইন্টারভিউ দিতে এসে এত অন্যমনস্ক আদিত্য আগে কখনওই হয়নি।
হঠাৎ আদিত্য শুনতে পেল সেই অমোঘ জিজ্ঞাসা, আজকের খবরের কাগজটা পড়েছেন?
একটু ইতস্তত করে তারপর প্রায় তোতলাতে তোতলাতে আদিত্য জানাল, হ, এই পড়া হয়েছে আর কি!
আজকের ইম্পর্টান্ট নিউজ কী? আদিত্যের দম বন্ধ হয়ে আসছে, বা কনুইয়ে একটা ফোঁসকা বোধহয় এই মাত্র পড়ল, সোজা হয়ে বসে মরিয়ার মতো তাকাল, তারপর একটু থেমে স্থির গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল, পুরুলিয়ার ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পরিত্যক্ত একটা কুয়োর মধ্যে একটা গোরু পড়ে গিয়েছিল। বারো ঘণ্টা পরে দমকলের লোকেরা গোরুটাকে তুলেছে।
