আদিত্য মনে মনে ভাবে, একটা কুকুর কতদিন বাঁচে। তেরো বছর আগে যে কুকুরটা মরে গেছে, সেটাকে যে-সাহেব দিয়েছিলেন, যে-সাহেব তার পার্থকাকাকে চাকরিতে ঢুকিয়েছিলেন, সেই সাহেবের আমলে মাধুরীদিদিমার কাছে থাকতে গেলে তাকে সোজা প্যারাম্বুলেটার চড়ে কাজে আসতে হত।
আমি নিজের পায়ে দাঁড়ানো শেখবার আগেই অ্যাডেন সাহেব কিন্তু বিদায় নিয়েছেন দিদিমা। আদিত্য বিনীতভাবে জানায়।
মাধুরীদিদিমা একটু করুণ হেসে বললেন, সেসব কি আজকের কথা নাকি। সে বছরই, অ্যাডেন সাহেব যেবার শেষবার হোমে চলে গেলেন, টমিটা ডাক-পিওন ভেবে একটা বিটের সেপাইকে কামড়ে দিয়ে আমাদের কী গোলমালে ফেলেছিল! ভাগ্যিস তোর দাদু তখন বেঁচে!
এর মধ্যে মাধুরীদিদিমা একটা পরামর্শ দিলেন আদিত্যকে, আদি, শোন, একটা খাকি হাফপ্যান্ট, জামা আর সাদা ক্যানভাসের সু কিনে আন। আমাদের এই আলিপুর থেকে গড়ের মাঠ কতটুকুই বা দূর, আর্লি মর্নিং-এ উঠে চলে যাবি, তারপর ওই প্যান্ট আর সু পরে ভিকটোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে দৌড়োবি।
কেন দিদিমা, আমার স্বাস্থ্য তো ভালই। আর অত ভোরে ঘুম থেকে ওঠা বাবা আমার কর্ম নয়, এত কষ্ট আমার সইবে না। আদিত্য আপত্তি জানায়।
কষ্ট না করলে তো চাকরি হবে না আদি। জানিস, মরার আগের দিন পর্যন্ত টমি, যত দূরই ছুঁড়ে দিই না কেন, দৌড়ে আমার হাতে বল তুলে এনে দিয়েছে।
আদিত্য এখন আর টমির প্রসঙ্গ তুলনায় আহত হয় না কিন্তু ভিকটোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে দৌড়ালে কি চাকরি হবে?
তা হবে না কেন? কত লোক তো এভাবেই কাজ পেল, সকালে ওখানে কত লাটবেলাট, রাজা, জমিদার মর্নিং ওয়াক করতে যায় তারা দেখবে এডুকেটেড ইয়ং বেঙ্গলি হেলথের ওপর নজর দিচ্ছে, তাদেরও নজর পড়বে তোর ওপর চাই কি তোর কপাল খুলে যেতে পারে। দিদিমা খুব বিশ্বাসের সঙ্গেই কথাগুলো বলেন।
রাজা জমিদার কবে দেশছাড়া হয়ে গেছে, আর লাটবেলাটও নেই, থাকলেও তারা আর গড়ের মাঠে মর্নিং ওয়াক করে না। আজকাল ওখানে যত বাজে লোক যায়, তারা আমাকে বড়জোর ভূষিমালের গোডাউন ক্লার্কের চাকরি দিতে পারে, একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে আদিত্য বলে, তা পেলেও হয়, কিন্তু তাও পাওয়া যাবে না ওদের কাছ থেকে।
মাধুরীদিদিমা অবুঝ নন, কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থেকে বললেন, ঠিকই বলেছিস সেদিন কি আর আছে রে আদিত্য, অ্যাডেন সাহেবও চলে গেলেন, আর দেশটা বাজে লোকে ভরে গেল, টমিটা পর্যন্ত মরে গেল। আদিত্যের ভাগ্য আজ প্রসন্ন বলতে হবে, মাধুরীদিদিমা কী ভেবে একটু পরে উঠলেন, তারপর ময়লা, মলাট ছেঁড়া একটা পুরনো ডায়েরি এনে আদিত্যকে দিলেন। আদিত্য দেখল সেটা চুয়াল্লিশ সালের একটা ডায়েরি, অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া কালিতে কিছু কিছু ঠিকানা আর ফোন নম্বর লেখা। অর্ধেক রাস্তার নাম এখন পালটে গেছে, আর বি বি, পি কে, এসব ফোন নম্বরই বা কোথায়? মাধুরীদিদিমা বলেন, ঠিকানাগুলো পড়ে যা তো আদি।
কষ্ট করে, অনুমান করে কয়েকটা ঠিকানা পড়ল আদিত্য। মাধুরীদিদিমা শোনেন আর বলেন, ফুলটন সাহেবও তো মরে গেছে, বাপু! কী বললি, এম কে বসু, ওরা তো বাড়ি পালটেছে, এখন। আর ভবানীপুরের বাড়িতেই নেই, নতুন ঠিকানা নেই? না? ফ্রেমজিসাহেব, সে তো কানপুর চলে গেছে শুনেছি। কী নাম পড়লি, গোপাল গাঙ্গুলি, চিনতে তো পারছি না, ওটা কী, ও ভরদ্বাজ দাস, সোমসাহেবের ভাগ্নে বোধহয়। কী ঠিকানা? আচ্ছা দাগ দিয়ে রাখ তো।
এইরকম ভাবে ছয়টা ঠিকানায় দাগ পড়ল, আর সঙ্গে সঙ্গে পোস্টকার্ড আনিয়ে প্রত্যেককে চিঠি দিলেন দিদিমা। কী লিখলেন কী জানি। একটা চিঠিরও উত্তর এল না, ঠিকানাই কি ঠিক আছে, আদিত্য আশা প্রায় ছেড়ে দিল। সেই সময়ে একদিন এক উর্দিপরা বেয়ারা এসে চিঠি দিয়ে গেল, কে এক ডাবলু. লালওয়ানি চিঠি দিয়েছে, তার বাবাকে লেখা চিঠি সে পেয়েছে, তার বাবা আজ প্রায় পনেরো বছর গত হয়েছেন, কিন্তু মাধুরীদিদিমাকে সে চেনে, ছোটবেলায় তার কথা অনেক শুনেছে, দেখেওছে দু-একবার। এ বাড়িতে একবার এসেওছিল মায়ের সঙ্গে। মাধুরীদিদিমার যদি কোনও কাজ তাকে দিয়ে হয় সে খুব খুশি হয়েই করবে।
মাধুরীদিদিমা চিঠিটা পড়ে একটু আনমনা হয়ে বসে রইলেন। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন, তাহলে ও হল ঝুমেলার ছেলে। ঝুমেলার তো এই সেদিন বিয়ে হল, কী সুন্দরী ছিল ঝুমেলা, সব হিরের গয়না বেনারসি ছাড়া পরত না, তার ছেলে এত বড় হয়েছে! আদিত্যের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তুই ওর সঙ্গে গিয়ে একদিন আমার নাম করে দেখা করে আয়।
আদিত্য বলল, তার চেয়ে তুমি ব্যাপারটা লিখে জানাও, তারপরে আমি যাই, প্রথমেই হুট করে যাওয়াটা ঠিক হবে না।
আবার চিঠি গেল, এবার খুব তাড়াতাড়ি উত্তর এল। আশাতীত উত্তর, আমাদের এখানে দু-একদিনের মধ্যেই কিছু নতুন লোক নেওয়া হবে, তোমার নাতিকে দরখাস্ত পাঠাতে বল। সঙ্গে সঙ্গে দরখাস্ত; আর প্রিপেড টেলিগ্রামের মতো ইন্টারভিউ লেটার এসে গেল আদিত্যের।
বেশ বড় সাহেবি ফার্মের ঝকঝকে বন্ড কাগজে সুন্দর করে ছাপানো প্যাডে সাক্ষাৎকারের জন্য বিনীত অনুরোধ। আদিত্য যাকে বলে আহ্লাদিত হয়ে উঠল।
কিন্তু বাদ সাধলেন মাধুরীদিদিমা, তোর স্যুট আছে তো আদি?
