সুন্দর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছি।
আসল কথাটা হল, সুন্দর কিন্তু কবিতা লেখা একেবারে ছেড়ে দেয়নি। এখন কিছুদিন কবিতা লিখবে না। তারপর ধীরে-সুস্থে, ভেবে-চিন্তে একটা একটা করে কবিতা লিখবে সে। পঞ্চুলাল জ্যোতিষীর মনগড়া, জোচ্চুরির ভবিষ্যৎবাণী সর্বাঙ্গসুন্দর নিজের ক্ষেত্রে মেলাবেই।
সাক্ষাৎকার
কোনও বৃদ্ধা বাঙালিনী যে এমন সাহেবি কায়দায় চোস্ত হতে পারেন আদিত্যের বাবার রাঙামামিমাকে না দেখলে বিশ্বাস করাই দায়। সধবা অবস্থায় দেখেছিল আদিত্য লালপাড় গরদের শাড়ি, কপালে ফুল-মুন সাইজের সিদুরের ফোঁটা অথচ তার চালচলন যেকোনও মেমসাহেবকে লজ্জা দিতে পারে। তার ছুরি কাঁটা চালানো দেখলে তাকে অনায়াসে মহিলা সব্যসাচী বলা যায়। বাবার রাঙামামা তখন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ইঞ্জিনিয়র, তাঁর সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরতে হত মাধুরীদিদিমা অর্থাৎ বাবার ওই রাঙামামিমাকে। একবার এক ডাকবাংলোয় কী ভীষণ আরশোলা, আর আরশোলা মানেই, সব মেয়েদের যা হয়ে থাকে মাধুরীদিদিমারও তাই; ঝাকে ঝাকে আরশোলা উড়ছে, বসছে। আর ঘরের এককোণায় দরজার হুড়কো হাতে দিদিমা শশব্যস্ত। হুড়কোতে তেমন জুত হল না, রাতে শোবার সময় খাবার টেবিলের ছুরিকাটা নিয়ে শুলেন, তারপর সারারাত চলল নিপুণহাতে ছুরিকাঁটা, পরদিন সকালে আদিত্যের বাবার রাঙামামা মানে মাধুরীদিদিমার স্বামী গুনে দেখেছিলেন রাতে ছুরির আঘাতে খণ্ডিত হয়েছে একশো সাতাশটা আর কাটায় বিদ্ধ হয়েছে তিনশো এগারোটা আরশোলা, খাটের নীচে মরে ছড়িয়ে রয়েছে।
সেই মাধুরীদিদিমার ওখানে গিয়ে উঠল আদিত্য। একেবারে বাক্স-বিছানা নিয়ে। সোনাপিসিমা বলে দিয়েছিল, চাকরি না পেলে বাড়ি ছাড়বি না কিছুতেই, রাঙামামিমা এত লোককে কাজ জুটিয়ে দিলেন আর তোকে দিতে পারবেন না! একেবারে ঘাড়ে চেপে বসবি, কত সাহেবসুবো ওর হাতের মুঠোর মধ্যে, কাজ নিয়ে তবে বাড়ি ছাড়বি।
আদিত্য তাই করল, চলে এলাম দিদিমা, তোমার এখানে।
ভালই করেছিস,কানের কাছের পাকা চুলগুলোয় কী একটা লালরঙের বিলিতি তেল ব্রাশ দিয়ে মাখাতে মাখাতে দিদিমা বললেন, টমিটা মরে যাওয়ার পর থেকে কী যে মনমরা হয়ে আছি। তোর বাবা থাকতে তবু এক-আধটু খোঁজখবর নিত, তোরা ভুলেও এদিকে মাড়াস না।
টমির উল্লেখে আদিত্য একটু আহত হল, টমি কুকুরের নাম। শুধু সেই জন্যে নয়; ছোটবেলায় যখন আদিত্য একবার বাবার সঙ্গে বিজয়ার প্রণাম করতে এসেছিল, এই কুকুরটা তার হাঁটুর ওপর এমন কামড়ে দিয়েছিল যে এখনও দুটো দাঁতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে রয়েছে। হাঁটুর ওপরে সেই জায়গাটায় হাত বোলাতে বোলাতে আদিত্য তেরো বছর আগে মরে যাওয়া লোম উঠে যাওয়া কানে ঘা-ধরা একটা পাজি খ্যাক খ্যাক বিলিতি কুকুরের শোকে মুখে যতটা করুণ ভাব আনা উচিত তার চেয়ে কিছু বেশিই ফুটিয়ে তুলল।
মাধুরীদিদিমা বোধহয় খুশিই হলেন, বেয়ারাকে ডেকে বললেন, আদিত্যর জিনিসপত্র পশ্চিমমুখো ঘরটাতে রাখবি, অ্যাডেন সাহেব এলে তো ওই ঘরের জানলা দুটোর মুখোমুখি থাকতেন। তারপরে এতকাল টমি থাকল, সেবার বর্ষাকালে কী একটা পোকার অত্যাচারে জামগাছ তিনটেই শুকিয়ে মরে গেল আর টমিটাও বাঁচল না।
এবার আদিত্যের মুখে তিনটে জামগাছের শাক যোগ করতে হল টমিকুকুরের শোকের সঙ্গে। তারপর যেন কোনও শোকযাত্রায় যোগদান করেছে এই রকম ভঙ্গিতে বেয়ারার পিছু পিছু উঠে গেল দোতলায় তার জন্যে নির্দিষ্ট ঘরের দিকে।
রাতে খাওয়ার টেবিলে মাধুরীদিদিমাকে কথাটা বলল আদিত্য, একটু আমতা আমতা করেই বললে, দিদিমা, আজ পাকা দেড় বছর পাশ করার পর বসে আছি, তোমার তো এত সাহেবসুবোর সঙ্গে ভাবসাব, একটা কিছু কাজ-টাজ জুটবে না আমার?
আমার কি আর সেদিন আছে রে? আদিত্যর দাদু যখন বেঁচেছিল, অ্যাডেন সাহেব প্রত্যেক ইয়ারে এ বাড়িতে আসত, আমাকে দেখলেই বলত সুইটি, আর টমিকে বলত লেজি চ্যাপ। টমিকে তো ও-ই দেশ থেকে এনে দিয়েছিল। নটিংহামে ওর দেশের বাড়ির বারান্দায় তোলা টমির মাকে কোলে নিয়ে ওর মায়ের ছবি এখনও আমার গরম কাপড়ের বাক্সে রয়েছে। পোকায় কেটে দিচ্ছে বলে ন্যাপথলিন দিয়ে রেখে দিয়েছি। ভাদ্রমাসে একবার করে রৌদ্রে দিই। তুই দেখবি? মাধুরীদিদিমা উঠে ভিতরের ঘরে চলে গেলেন, মিনিট পনেরো পরে একটা কাঁচখোলা ফ্রেমে ফটোটা নিয়ে এলেন। এখন আর ফটো বলা উচিত নয়, পুরোটাই উঠে গেছে। দিদিমা আঙুল দিয়ে বোঝালেন, এইখানে টমির মায়ের ফটো ছিল, এই যে অল্প একটু বাঁকানো মতো দেখছ এইটা ওর লেজ আর এই অ্যাডেনের মায়ের কাঁধের বাঁ দিকটা দেখা যাচ্ছে।
ও। তাই তো?উৎসাহের ভাব নিয়ে আদিত্য খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখল। কিন্তু চাকরির কথাটা?
দিন সাতেক এইভাবে চলল। যখনই কাজের কথা ওঠে, টমি কুকুর আর অ্যাডেন সাহেব এসে পড়ে। নিঃসন্তান বিধবার আর কীই বা বলবার থাকতে পারে। আদিত্য যেন অর্ধেক হয়ে পড়ল। বাবার মামাবাড়িতে কতদিন বেকার বসে থাকা যায়?
একদিন দিদিমা বললেন, কাজ পাওয়া কি সোজা? এলি না অ্যাডেন সাহেবের আমলে, তোকে খাঁটি বিলিতি কোম্পানিতে ঢুকিয়ে দিতাম। পার্থ, তোর বাবার মাসতুতো ভাই, জেনারেল ম্যানেজার হয়ে রিটায়ার করল গতবার। অ্যাডেন সাহেবকে বলে আমিই তো ঢুকিয়েছিলাম।
