পচা চাল, পচা গম
ওজনেও কম কম…
মাত্র এই দু লাইন শুনেই সর্বাঙ্গসুন্দরের বাবা চমকিয়ে উঠলেন, আরে সর্বনাশ! থাম, থাম৷ এসব কী লিখেছিস? তারপর সর্বাঙ্গসুন্দর থেমে যেতে তিনি বললেন, কবিতার কি আর বিষয় নেই? আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি, নদী, পাখি, ফুল–সেই সব নিয়ে কবিতা না লিখে রেশনের পচা চাল আর দারোগার ঘুষ খাওয়া নিয়ে কবিতা?
বাবার কথা শুনে সর্বাঙ্গসুন্দর নতুন করে ভাবা শুরু করল।
তাদের বাড়ির কাছে নদী নেই বটে, তবে ফুল আছে, পাখি আছে। তাদের নিজেদেরই কোয়ার্টারের উঠোনে একচিলতে ফুলের বাগান আছে। সে প্রথমেই ফুলের বিষয়ে একটা নীতিমূলক কবিতা লিখল:
জবা ফুল, গাঁদা ও গোলাপ,
গাছ থেকে ফুল তোলা পাপ।
গাছে গাছে ডালিয়া-জিনিয়া,
খেলিতেছে হাসিয়া হাসিয়া।
আরও কত ফুলটুল ফোটে,
সব আমি চিনি নাই মোটে।
এর দু-চার দিন পরেই একটা খুব বড় নদীর কথা কল্পনা করে সে লিখল:
একবার যদি
সাঁতরাই নদী
ওই পারাবার
হয়ে যাই পার।
রাশি রাশি ঢেউ
ভেসে যায় কেউ,
ডুবে যায় কেউ,
কাঁদে ভেউ ভেউ,
ডুবে ডুবে জল খায়।
নদী চলে যায়,
নিজের বাসায়,
থামে না তো কভু হায়!!
এইভাবে ভালই এগোচ্ছিল সুন্দর। তার ইচ্ছে ছিল নদীর পরে পাহাড়ের ওপর কবিতা লিখবে সে। কিন্তু সে কোনওদিন পাহাড় দেখেনি। এ কথা বাবাকে বলতে নিমাইবাবু বললেন, আমাদের। বীরভূম জেলাতেই তো মামা-ভাগ্নে পাহাড় আছে। ছোটবেলায় দেখেছিস, তোর মনে নেই। ঠিক। আছে পুজোর ছুটিতে তোকে মামা-ভাগ্নে পাহাড় দেখিয়ে আনব।
কিন্তু এর মধ্যে একটা ভীষণ গোলমাল হয়ে গেল।
নিমাইবাবুদের রেল কলোনির পাড়ায় নিমাইবাবুদের কোয়ার্টারের পাশেই একটি নতুন পরিবার বদলি হয়ে এল খঙ্গাপুর থেকে। সে বাড়ির বড় ছেলেটি সর্বাঙ্গের দাদা গোরার সমবয়সি, কিন্তু পড়ে সর্বাঙ্গসুন্দরের সঙ্গে এক ক্লাশে। ছেলেটির নামও চমৎকার, মিলটন চক্রবর্তী।
মিলটন চক্রবর্তী তার বয়েসের তুলনায় একটু বেশি পাকা, এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হল, সে একজন ডাকসাইটে কবি, নিজের কবিক্ষমতা সম্পর্কে তার খুব উঁচু ধারণা।
পাশাপাশি বাড়িতে দুজন কবি হলে নানা রকম ঝামেলা দেখা দেয়। এক্ষেত্রেও তাই হল। তা ছাড়া মিলটন আর সুন্দর শুধু পাড়াতেই প্রতিবেশী নয়, স্কুলেও সহপাঠী। সুন্দর যখন জানতে পারল, মিলটনও কবি, সে কেমন গুটিয়ে গেল। মিলটন নিজে থেকেই একদিন সুন্দরকে নিজের কবিতা শুনিয়ে দিল:
মহা চিন, মহা রাশিয়া
সবাই গিয়াছে ফাঁসিয়া
যদু-মধু, রাম ও রহিম
সবাই শুধায়,
অতঃ কিম, অতঃ কিম্।
এই রকম কয়েকটি গোলমেলে ছন্দভুল কবিতা মিলটন পড়ে শোনায়। বলা বাহুল্য, ঠিক এরকম কবিতা সুন্দর কখনও শোনেনি। মিলটনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে পদ্য সম্পর্কে ধারণাই তার পালটে গেল।
সুন্দর মিলটনের কাছে প্রকাশ করল যে, সে নিজেও কবিতা লেখে। মিলটন ব্যাপারটাকে কোনও পাত্তা দিল না।
সুন্দর তখন মিলটনকে প্রায় জোর করে তার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা সোনার মোহর শোনাল। কিন্তু মিলটন রাত হল ভোর সোনার মোহর আকাশের গায়ে গড়ায়… এইটুকু শুনেই সুন্দরকে থামিয়ে দিল, বলল, ব্রাদার, এসব কবিতা চলবে না। খবরের কাগজের সংবাদ নিয়ে পদ্য লেখো, দুঃখ-বেদনা নিয়ে কবিতা লেখো। তবে তো পাবলিক পড়বে।
মিলটনের অনুপ্রেরণায় সুন্দর তার পদ্যগুলোকে একটু একটু করে বদলাতে লাগল। পাখিদের নিয়ে একটা কবিতা লিখল, রীতিমতো মর্মস্পর্শী:
চড়ুই, কাক, ও টুনটুনি,
সারাদিন তাহাদের ভীষণ খাটুনি।
কারণ শালিক,
সেই কি না তাহাদের মালিক
কথায় কথায়
সারাদিন তাহাদের ভীষণ খাটায়।
সর্বাঙ্গসুন্দরের এই কবিতাও মিলটনকে সন্তুষ্ট করতে পারল না। মিলটন গম্ভীরভাবে ঘাড় নেড়ে বলল, কিছু মনে কোরো না ভাই, কবিতার লাইনে তোমার সুবিধে হবে না।
একটু দুঃখিত হয়ে সুন্দর পালটা প্রশ্ন করল, কবিতার লাইনে তোমার সুবিধে হবে?
মিলটন বলল, না হয়ে উপায় নেই। কাশীর জ্যোতিষী পঞ্চুলাল দেবশর্মা নিজে আমার ঠিকুজি দেখে বলেছে, আমি মহাকবি হব, আমি নোবেল প্রাইজ পাব।
মিলটনের কথা শুনে তাজ্জব হয়ে গেল সুন্দর। সেদিন রাতেই সে তার বাবাকে বলল, পাশের বাড়িতে নতুন যে ছেলেটা এসেছে, সে খুব কবিতা লেখে।
বাবা অন্যমনস্কভাবে বললেন, হ্যাঁ, আজকাল অনেক লোকে কবিতা লিখছে।
সুন্দর বলল, তা শুধু নয়, কাশীর সেই আমাদের পণ্ডুলাল জ্যোতিষী, তিনি ওঁর ঠিকুজি দেখেও বলেছেন, ও মহাকবি হবে, নোবেল প্রাইজ পাবে।
হো হো করে হেসে উঠলেন সুন্দরের বাবা নিমাইবাবু। তারপর বললেন, এই পঞ্চুলাল তো এক নম্বরের জোচ্চোর। ও জ্যোতিষের কী জানে? গত বছর জুয়াচুরির মামলায় জেলে গেছে। ওর ভবিষ্যৎবাণীর কী দাম? বছরের পর বছর লোকটা বাবাকে নানা কায়দায় ঠকাত।
পঞ্চলের ঠিকুজি মিথ্যে, তার ভবিষ্যৎ গণনা জোচ্চুরি, এ কথা বাবার কাছ থেকে শোনার পর সর্বাঙ্গসুন্দরের মনের ওপর থেকে একটা পাষাণভার নেমে গেল। তার আর কবিতা লেখার দায়িত্ব নেই। সে ঠিক করল, অত কবিতা কবিতা করে আর পাগলামি করবে না।
এর পরে দু-চার দিন মিলটনের সঙ্গে স্কুলে এবং পাড়ার মধ্যে দেখা হলেও সে কবিতা বিষয়ে আগের মতো কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। অবশেষে নাক-উঁচু মিলটনই নিজে থেকে জিজ্ঞাসা করল, কী হে কবিতা-টবিতা কিছু লিখলে?
